
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের আদলে বানানো ভুয়া ফটোকার্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই গ্রাফিক কার্ডগুলোতে পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর লোগো, ফন্ট, রং এবং লেআউট হুবহু নকল করা হচ্ছে, যাতে বানোয়াট তথ্যগুলো সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই জালিয়াতি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। জনমতকে প্রভাবিত করতে মূল সংবাদমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব ভুয়া ফটোকার্ডে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর হার বাড়তে থাকে, যা বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আরও বেড়ে যায়। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে সংবাদমাধ্যমের আদলে বানানো ভুয়া ফটোকার্ড। ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রচারিত মোট রাজনৈতিক অপতথ্যের প্রায় অর্ধেকই ছড়িয়েছে এসব ভু্য়া ফটোকার্ডে। রাজনৈতিক কোনো ঘটনা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ভুয়া ভাষ্য ছড়াতে এগুলো প্রায়ই ব্যবহার করা হয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশের ইস্যুতে তথ্য যাচাই করে, এমন নয়টি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ৫৩৮টি রাজনৈতিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে ফ্যাক্টচেকাররা ৬৯০টি আলাদা ভুয়া ফটোকার্ড শনাক্ত করেছেন। যার অনেকগুলোই সংবাদমাধ্যম আমার দেশ, কালের কণ্ঠ ও যমুনা টেলিভিশনের মতো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক পক্ষগুলো প্রতিপক্ষকে হেয় করতে এবং নিজেদের জনপ্রিয়তা নিয়ে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা দাবি প্রচার করতে এসব ফটোকার্ড ব্যবহার করেছে।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও এসব ফটোকার্ডের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি ভুয়া ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই অপতথ্য যৌন হয়রানিমূলক রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে রাজনীতি ও জনসেবায় নিয়োজিত নারীদের বিরুদ্ধে। এর বাইরেও সাম্প্রদায়িক ভীতি ও বিদ্বেষ ছড়াতে ভুয়া ফটোকার্ডের ব্যবহার দেখা গেছে; যা এই কৌশলের সামাজিক ঝুঁকিকেও নির্দেশ করে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভুয়া ফটোকার্ডের এই ক্রমবর্ধমান প্রচার মূলধারার সাংবাদিকতার জন্য বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করছে। যখন পাঠকরা পরিচিত কোনো সংবাদমাধ্যমের লোগো দেখে একটি তথ্য বিশ্বাস করেন এবং পরে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তখন সেই দায় বা ক্ষতি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের ওপরই বর্তায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ফটোকার্ডের উদ্দেশ্য সংবাদমাধ্যমের অর্জিত বিশ্বাসকে পুঁজি করে সম্পৃক্ততা (এনগেজমেন্ট) বাড়ানো। প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়েই এই অপতথ্য দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ভুয়া রাজনৈতিক ফটোকার্ডগুলোর বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, এগুলো মূলত দুইভাবে বানানো হয়। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি (৫১.৭ শতাংশ) তৈরি করা হয়েছে সংবাদের আদলে। এগুলোতে রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ, গ্রেপ্তার, অভিযান বা কোনো এক পক্ষের পক্ষে জনমত রয়েছে— এমন ভুয়া জরিপের ফলাফল প্রচার করা হয়েছে। বাকি ৪৮.৩ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে বানোয়াট উদ্ধৃতি বা বিবৃতি। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী বা সরকারি কর্মকর্তাদের নামে এসব মিথ্যা বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে ছড়ানো এসব ভুয়া ফটোকার্ডের বিস্তার সাধারণত রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে দেখা যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এর ব্যবহার বাড়তে শুরু করলেও ডিসেম্বরের পর তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে জানুয়ারিতে নির্বাচনী প্রচারণা যখন তুঙ্গে, তখন এই প্রবণতা ছিল সর্বোচ্চ। দিনভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে: যখনই কোনো বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভুয়া ফটোকার্ডের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।
এমন একটি প্রবণতা দেখা যায়, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর হামলার পর। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর তার ওপর গুলি চালানো হয় এবং ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যাপক অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ডগুলোতে দাবি করা হয়, এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১২৭ কোটি টাকার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্যের এক আত্মীয়র অ্যাকাউন্টে পাচার করা হয়েছে। আমার দেশ পত্রিকার সংবাদের আদলে তৈরি আরেকটি ভুয়া ফটোকার্ডে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের ছবি ব্যবহার করে তার নামে একটি মিথ্যা উদ্ধৃতি প্রচার করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন— আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না।
একই ধরনের অপতথ্য ছড়ানোর ঘটনা ঘটে ২৫ ডিসেম্বর, যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৭ বছর পর লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে ভুয়া ফটোকার্ডের একাধিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো কার্ডে মিথ্যা দাবি করা হয়, তাকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কারণে সৃষ্ট যানজটে অ্যাম্বুলেন্সেই রোগী মারা যাচ্ছেন। আবার কোনোটিতে তারেক রহমানের নামে বানোয়াট বিবৃতি প্রচার করে দাবি করা হয়, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে কিছু উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীর সেনাবাহিনীর ১৬টি মোবাইল চুরির মতো ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে ভুয়া ফটোকার্ডের বিস্তার আবারও বেড়ে যায়। আসন ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে ১৬ জানুয়ারি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যখন প্রস্তাবিত ১১-দলীয় নির্বাচনী জোট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়, তখন সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি বেশ কিছু বানোয়াট দাবি সামনে আসে। কোনোটিতে নামহীন বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে মিথ্যা দাবি করা হয় যে, ইসলামী আন্দোলনের সরে দাঁড়ানোর কারণে জামায়াত ১৭৫টি আসন হারাতে পারে। আবার অন্য কিছু ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ওই জোটে ইসলামী আন্দোলনের অন্তর্ভুক্তিতে ভারতের আপত্তি ছিল।
নির্বাচনের আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়াতে দেখা যায়। ওই দিন বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে ফটোকার্ডের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়। কোনো কার্ডে দাবি করা হয়, ভোট কেনার জন্য টাকা বিতরণের সময় দলীয় নেতা-কর্মীদের আটক করা হয়েছে অথবা প্রার্থীর বাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাদ যাননি শীর্ষস্থানীয় নেতারাও। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর নামে একটি ভুয়া ফটোকার্ডে মিথ্যা দাবি করা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপির “জানাজা” অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। একইভাবে জামায়াত আমিরের নামে একটি বানোয়াট উদ্ধৃতি প্রচার করা হয়, যেখানে দাবি করা হয় দলটি ভোট চুরির মাধ্যমে হলেও ক্ষমতায় যেতে চায়।
সব কটি ঘটনার ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। অধিকাংশ ভুয়া ফটোকার্ডই রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতাদের রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৬২ শতাংশ ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছিল রাজনৈতিক আক্রমণের উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে, প্রায় ১৬ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত অভিযোগ তোলা হয়েছে। আর ১২.৫ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে ইতিবাচক প্রচারের কাজে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার জনপ্রিয়তা কিংবা নির্বাচনী শক্তির বিষয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্লেষণ করা ভুয়া ফটোকার্ডগুলোর মধ্যে দৈনিক আমার দেশের আদলে তৈরি কার্ডগুলোই রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়াতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। মোট ১৪৮টি ভুয়া ফটোকার্ডে এই সংবাদমাধ্যমের দৃশ্যমান পরিচয় বা “ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি” নকল করা হয়েছে। এছাড়া কালের কণ্ঠ, যমুনা টেলিভিশন, আরটিভি এবং কালবেলার ফটোকার্ডও বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। বানোয়াট দাবিগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেই মূলত এই সংবাদমাধ্যমগুলোর নকল করা হয়।
কোন দলের সমর্থকরা কোন সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড বেশি ব্যবহার করেছে তা খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপির সমর্থক পেজ-প্রোফাইল থেকে আমার দেশ, যমুনা টেলিভিশন, নাগরিক টিভি ও বিবিসি বাংলার ফটোকার্ড বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। আওয়ামী-সমর্থকরা বেশি ব্যবহার করেছে কালের কণ্ঠ, আরটিভি, ডিবিসি, প্রথম আলো ও জনকণ্ঠের। জামায়াত-সমর্থকরা ব্যবহার করেছে একাত্তর, যুগান্তর, সমকাল, চ্যানেল টুয়েন্টিফোর ও বাংলা ভিশনের ফটোকার্ড।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা কীভাবে এসব ব্যবহার করেছে, তা পর্যালোচনায় নির্দিষ্ট কিছু ধরন পরিলক্ষিত হয়। যেমন, বিএনপি সমর্থিত পেজ এবং প্রোফাইলগুলো থেকে প্রায়ই আমার দেশ, যমুনা টেলিভিশন, নাগরিক টিভি এবং বিবিসি বাংলার আদলে তৈরি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা প্রধানত কালের কণ্ঠ, আরটিভি, ডিবিসি নিউজ, প্রথম আলো এবং জনকণ্ঠের নকশা নকল করে তৈরি করা ফটোকার্ড ব্যবহার করেছে। আর জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে একাত্তর টিভি, যুগান্তর, সমকাল, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর এবং বাংলাভিশনের আদলে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড শেয়ার করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

অপতথ্য বা ভুয়া খবরের প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ছিল সবচেয়ে প্রিয় লক্ষ্যবস্তু। দলটিকে কেন্দ্র করে শনাক্ত হওয়া ২৮১টি অপতথ্যের মধ্যে ২৪৬টি ছিল জামায়াত বা এর নেতাদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যে। বিপরীতে, মাত্র ৩৪টি ক্ষেত্রে দলটিকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নেতিবাচক ফটোকার্ডগুলোতে সাধারণত দলের নেতাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে জামায়াত নেতার সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল বা প্রচারণার সময় চুরির অভিযোগে জনতা কর্তৃক জামায়াতের এক নারী নেত্রীকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো বানোয়াট দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ইতিবাচক অপতথ্যগুলোর বেশিরভাগই ছিল তাদের জনপ্রিয়তা নিয়ে অতিরঞ্জিত সব দাবি। জনমত জরিপে দলটি ১৮০টিরও বেশি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করছে দাবিতে ভুয়া ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া নির্বাচনের দিনও বানোয়াট বুথফেরত জরিপের ফলাফল ব্যবহার করে দাবি করা হয়েছিল যে, অসংখ্য নির্বাচনী এলাকায় জামায়াত প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
বিএনপিকে নিয়েও নেতিবাচক অপতথ্য বেশি ছড়ানো হয়েছে। মোট ২১২টি অপতথ্যের মধ্যে নেতিবাচক ছিল ১৯৭টি আর ইতিবাচক ছিল ১৩টি। বাকি ২টি ছিল নিরপেক্ষ। নেতিবাচক ভুল তথ্যে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, দেশের শান্তি নষ্ট করছে বিএনপি, জামায়াতের থেকে তাদের রাজনীতি শেখা উচিত। অন্য একটি দাবিতে বলা হয়, চাহিদা মোতাবেক চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় “বিকাশ পরিবহন” বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।
আর বিএনপিকে জড়িয়ে ইতিবাচক অপতথ্যে অন্য দল থেকে নেতাকর্মীরা বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন এমন দাবি ছড়িয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, গাইবান্ধায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দুইশত নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন কিংবা কুমিল্লায় ছাত্রশিবিরের ২৮ জন কর্মী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগদান করেছেন।
নতুন দল এনসিপি ও এর নেতাদের নিয়ে ছড়ানো প্রায় সবগুলো ভুল তথ্যই ছড়ানো হয়েছে নেতিবাচক ভাষ্যে। যেমন, সংবাদের মতো করে বানানো ভুয়া কার্ডে বলা হয়, ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে মারা গেছেন এক এনসিপি কর্মী কিংবা এক এনসিপি নেত্রী ইয়াবায় আসক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে ব্যতিক্রম ছিল দুটি দল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই দুটি দলকে নিয়ে ছড়ানো অপতথ্যে ইতিবাচকভাবে দেখানোর প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, আওয়ামী লীগকে নিয়ে ছড়ানো ৩১টি ভুল তথ্যের মধ্যে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে ২৬টিতে, আর নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে মাত্র ৫টিতে। দলটিকে ইতিবাচকভাবে দেখিয়ে ভুয়া ফটোকার্ডে কোথাও বলা হয় অমুক তারিখে দেশে আসবেন শেখ হাসিনা কিংবা তাকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে আন্দোলন করছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চান কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিতে বলেছেন এমন দাবি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিয়ে ছড়ানো ২৪টি ভুল তথ্যের ১৮টি ছিল ইতিবাচক আর মাত্র ছয়টি ছিল নেতিবাচক। যেমন, ইতিবাচকভাবে ছড়ানো অপতথ্যে কোথাও বলা হয় অন্যান্য প্রতীককে পেছনে ফেলে জনমত জরিপে সবার শীর্ষে “হাতপাখা,” কিংবা দলটিতে যোগ দিয়েছে জামায়াত ইসলামীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন। তাকে লক্ষ্য করে সর্বোচ্চ ৭৮টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। ভুয়া ভাষ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, তিনি ভারতের কাছে মুচলেকা দিয়ে দেশে ফিরছেন এবং পর্দার আড়ালে বিভিন্ন বিদেশি শক্তি বা “ডিপ স্টেট” এর সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এছাড়া তাকে দুর্নীতিবাজ, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড এবং পলাতক আসামি হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।

জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে ৬১টি ভুল তথ্য। এসবের ভাষ্যে কোথাও বলা হয়েছে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বিজয় দিবস বাতিল হবে কিংবা দেশের সব মাজার ভেঙে ফেলা হবে। নির্বাচনে সশস্ত্র ক্যাডার মোতায়েন, ‘রগ-কাটা’ কর্মসূচির হুমকি কিংবা নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার মতো তথ্য প্রচার করে তাকে এবং তার দলকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টাও করা হয়েছে।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ভুল তথ্যের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে ২১টি ভুল তথ্য। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের দূরত্ব তৈরি হওয়া, একে অপরকে বিশ্বাস না করা এবং নাহিদ ইসলামের পক্ষ থেকে ড. ইউনূসকে “প্রতারক” বা “আখের গোছানো” ব্যক্তি হিসেবে চিত্রায়িত করার ভাষ্য ছড়ানো হয়েছে ভুয়া ফটোকার্ডে। এছাড়া, সেনাবাহিনী নিরাপত্তা না দিলে পদত্যাগের হুমকি, অ্যারেস্ট হওয়া, জরুরি অবস্থা জারি কিংবা সহযোগীদের ফেলে “পিছনের দরজা দিয়ে পালানোর” মতো ভুয়া তথ্যও ছড়ানো হয়েছে ড. ইউনূসকে নিয়ে।
দলের প্রধানদের পাশাপাশি ছাত্রনেতা এবং রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাও এই অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমকে লক্ষ্য করে ২০টি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে লক্ষ্য করে ১৯টি মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয় যে, অপতথ্য ছড়ানোর এই প্রচারণা রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত ছিল।
অন্তত ৩৪টি এমন ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নিয়ে যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ ভুল তথ্য ছড়ানো হয়। যেমন, ডা. তাসনিম জারা, সাবিকুন্নাহার তামান্না, ফাতেমা জুমা, মাহমুদা মিতুদের মতো নারী নেত্রীদের লক্ষ্য করে নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য— বিয়ের আগেই মা হওয়া, হোটেলে আটক হওয়া বা যৌন রোগের ভুয়া তথ্য ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া, তাদের লক্ষ্য করে “সংঘবদ্ধ ধর্ষণ” বা “বাসায় ঢুকে মেরে ফেলার” হুমকি প্রচার করা হয়েছে।

যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অপতথ্য কেবল নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব অপতথ্যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, গোপন ভিডিও রেকর্ড বা অনৈতিক সম্পর্কের বানোয়াট অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম এবং ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের বিরুদ্ধে এ ধরনের দাবি করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যমের আদলে বানানো ফটোকার্ড ব্যবহার করা হয়েছে যাতে এসব মিথ্যা তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
বিশ্লেষণে আরও ৫টি এমন ঘটনা পাওয়া গেছে যেখানে ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উস্কে দেওয়ার বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু ফটোকার্ডে মিথ্যা দাবি করা হয়, ছাত্রদলের এক নেতা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়েছেন যারা “ধানের শীষ” প্রতীকে ভোট দেবে না, তাদের ঘরের ভেতর মেরে ফেলা হবে। অন্য কিছু কার্ডে অভিযোগ করা হয়, বিএনপি নেতারা সংখ্যালঘু পরিবারগুলোকে জোরপূর্বক ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। একইভাবে জামায়াতের নামেও বানোয়াট বিবৃতি প্রচার করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়, দলের আমির বলেছেন, হিন্দুরা “দাঁড়িপাল্লা” প্রতীকে ভোট না দিলে তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি এসব ভুয়া ফটোকার্ডের প্রভাব কেবল অপতথ্য ছড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পরিণাম আরও সুদূরপ্রসারী। প্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের দৃশ্যমান পরিচয় বা ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি নকল করার মাধ্যমে এই কার্ডগুলো শুধু পাঠকদেরই বিভ্রান্ত করছে না, বরং যেসব প্রতিষ্ঠানকে তারা অনুকরণ করছে, তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
দৈনিক আমার দেশ-এর সহযোগী সম্পাদক আলফাজ আনাম বলেন, এই প্রবণতা মূলধারার সাংবাদিকতার ওপর জনআস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা স্ক্রল করার সময় সাধারণত তথ্যের সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেন না। প্রায়ই তারা পরিচিত লোগো বা রঙের বিন্যাস দেখেই তথ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন। কিন্তু পরে যখন তারা বুঝতে পারেন যে তথ্যটি মিথ্যা ছিল, তখন তা সংবাদপত্রের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে; মানুষ ভাবতে শুরু করে যে আমরাই হয়তো ভুয়া খবর বা অপতথ্য প্রকাশ করছি।”
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এ ধরনের ভুয়া ফটোকার্ড বিশ্বাস করছেন এবং শেয়ার দিচ্ছেন, যা অজান্তেই এগুলোর প্রচারের পরিধি বাড়িয়ে দিচ্ছে। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি আস্থার সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে এবং প্রকৃত সাংবাদিকতা ও ভুয়া দাবিতে তৈরি মিথ্যা বা অপতথ্যের মধ্যকার পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে তুলছে।
সংবাদমাধ্যমগুলো এখন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করেছে। প্রথম আলোর অনলাইন প্রধান শওকত হোসেন জানান, তাদের সংবাদপত্রের নামে যখনই কোনো ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে, তখন তারা নিয়মিতভাবে সেটির স্পষ্টীকরণ বা সতর্কতা পোস্ট জারি করেন। তিনি বলেন, “যখনই আমাদের নজরে এ ধরনের ফটোকার্ড আসে, আমরা তখনই আমাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করি। সেখানে জানানো হয় যে সংশ্লিষ্ট কনটেন্টটি আমাদের নয় এবং পাঠকদের অনুরোধ করা হয় যেন তারা তথ্যের জন্য আমাদের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্ভর করেন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর আদল নকল করা একটি সুপরিকল্পিত এবং কৌশলগত পদক্ষেপ। যারা এসব ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে, তারা ভালো করেই জানে যে কোনো অখ্যাত বা সাধারণ উৎসের দাবি সহজে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না। কিন্তু যখন কোনো মিথ্যা তথ্য একটি স্বীকৃত সংবাদসংস্থার ব্র্যান্ডিং বা লোগো নকল করে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেটি ওই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের অর্জিত বিশ্বাসযোগ্যতাকে আঘাত করে। এর ফলে সাধারণ পাঠকদের কাছে সেই তথ্যটি গ্রহণ করার এবং অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সের ডিন এবং মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগের প্রধান ড. সুমন রহমান বলেন, “মূলত দুইটা জায়গা থেকে এমন নকল ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। প্রথমত এটা বানানো সহজ আর দ্বিতীয়ত সংবাদমাধ্যমের এন্ডোরসমেন্ট (সমর্থন)। যখন কোনো একটা সংবাদমাধ্যমের নামে এমন তথ্য আসে তখন সেটা মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে এবং তখন তারা সেটি শেয়ারও করে। এটা শেয়ার করা অনেক সহজ আর সেই কারণে সস্তায় কোনো ভুল তথ্য ভাইরাল করাই হচ্ছে বেসিক মোটিভেশন।”
ভুয়া ফটোকার্ড থেকে বিভ্রান্তি রোধে ব্যবহ্যারকারীদের মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানোর উপরে গুরুত্ব দেন ড. রহমান। তার মতে নাগরিকদের মিডিয়া লিটারেসি একটি নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলে এই সমস্যা থেকে সমাধান পাওয়া সম্ভব। তবে এটি সময়সাপেক্ষ ও ধারাবাহিক একটি প্রক্রিয়া বলেও জানান তিনি।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এই ছয় মাসে বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক ৯টি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান মোট ৫৩৮টি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অপতথ্য শনাক্ত করেছে, যার সব কটিই ছিল সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড সংশ্লিষ্ট। কিছু প্রতিবেদনে একাধিক ফটোকার্ড যাচাই করা হয়েছিল। সেগুলো আলাদাভাবে গণনা করলে, এই ৫৩৮টি প্রতিবেদনে মোট ৬৯০টি ভিন্ন ভিন্ন ভুয়া ফটোকার্ড যাচাই করা হয়েছে, যা বিভিন্ন মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে নকল করে তৈরি। এই ৬৯০টি ফটোকার্ডই পরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে কাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট পেজ এবং প্রোফাইলগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় তাদের সাম্প্রতিক পোস্ট, প্রচার করা ভাষ্য, প্রোফাইল পিকচার এবং কভার ফটো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ফেসবুক গ্রুপে ব্যবহারকারীদের শেয়ার করা কনটেন্টের ধরন দেখে তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত করা হয়েছে। তবে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব পেজ বা প্রোফাইলের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি; কেবল বর্তমানে সক্রিয় থাকা অ্যাকাউন্টগুলো থেকেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।