পার্থ প্রতীম দাস

এনগেজমেন্ট এডিটর, ডিসমিসল্যাব
নীতিমালা লঙ্ঘন করে ইউটিউবে ব্যবসা করছে নকল সংবাদ চ্যানেল
This article is more than 2 months old

নীতিমালা লঙ্ঘন করে ইউটিউবে ব্যবসা করছে নকল সংবাদ চ্যানেল

পার্থ প্রতীম দাস

এনগেজমেন্ট এডিটর, ডিসমিসল্যাব

“আসসালামু আলাইকুম। স্বাগত জানাচ্ছি বিবিসি আন্তর্জাতিক সংবাদে। সংবাদের শুরুতেই থাকছে সংবাদ শিরোনাম” – শুনে এবং দেখে মনে হবে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা বিবিসির খবর। খবর পড়ছেন তারকা সাংবাদিক হিউ এডওয়ার্ডস (যিনি গত বছর জুনে বিবিসি ছেড়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত সেখানে রাত ১০টার খবর সঞ্চালনা করতেন)। মজার ব্যাপার হলো, তিনি কথা বলছেন বাংলায়।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। এভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে নকল করে কয়েক ডজন চ্যানেল চলছে অনলাইন ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্ম, ইউটিউবে। লোগো, আবহ সঙ্গীত, এমনকি সংবাদ উপস্থাপককে প্রায় হুবহু নকল করে, তারা কনটেন্ট তৈরি করছে এবং তাতে বিজ্ঞাপনও চলছে। 

সংবাদমাধ্যমকে নকল করে চ্যানেল ও কনটেন্ট তৈরি ইউটিউবের নীতিমালার পরিপন্থী। তবু বছরের পর বছর ধরে ইউটিউবে টিকে আছে এ ধরনের নকল সংবাদমাধ্যমের চ্যানেল এবং একাধিক চ্যানেলকে তারা ‘ভেরিফায়েড’ ব্যাজও (ধূসর টিক চিহ্ন, যার অর্থ চ্যানেলটি যাচাইকৃত) দিয়েছে। এসব চ্যানেলের ভিডিওতে বিজ্ঞাপনও চলতে দেখা গেছে, যার অর্থ এগুলো থেকে নকল করা চ্যানেলগুলো এবং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইউটিউবও মুনাফা করছে।

ডিসমিসল্যাব এমন ৫৮টি ইউটিউব চ্যানেলের সন্ধান পেয়েছে যারা বিবিসি, আল জাজিরা, এবিসি, রয়টার্সসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের লোগো-ব্র্যান্ডিং নকল করে বাংলা ভাষায় ভিডিও আপলোড করছে। এসব চ্যানেলের কোনোটির সাবস্ক্রাইবার বা গ্রাহক সংখ্যা ১০ লাখও ছাড়িয়ে গেছে।

এদের মধ্যে, এক হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার আছে এবং নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করে– এমন ১৪টি চ্যানেলের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে থাম্বনেইলে বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য দেওয়া হচ্ছে যার সঙ্গে ভেতরের বক্তব্যের কোনো মিল নেই। এটি একই সঙ্গে দর্শকদের বিভ্রান্ত করছে এবং ইউটিউবের নীতিমালাও লঙ্ঘন করছে। 

সংবাদমাধ্যমের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, এসব নকল চ্যানেলের কারণে একদিকে সঠিক সংবাদ প্রদানকারী গণমাধ্যমগুলো দর্শক হারাচ্ছে এবং অনেক দর্শক আসল-নকল ধরতে পারছেন না বলে ভুল তথ্যে বিশ্বাস করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাবে, যে সব চ্যানেলকে নকল করা হচ্ছে, তারা দর্শকদের আস্থা হারাচ্ছেন।

ইউটিউবে নকল বিবিসি

এই গবেষণায় সবচেয়ে বেশি নকল চ্যানেল পাওয়া গেছে বিবিসির নামে। এমন অন্তত ৩৭টি চ্যানেল আছে, যারা ভিডিও আপলোড করছে বিবিসির ব্র্যান্ডিং নকল করে এবং এদের গড় সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৫৪ হাজারের বেশি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যানেলটি হলো আন্তর্জাতিক সংবাদ। চ্যানেলটি ভেরিফায়েড এবং এর সাবস্ক্রাইবার ১০ লাখের বেশি। অন্য আরও ছয়টি চ্যানেল পাওয়া যায়, যারা বিবিসির স্টুডিও, গ্রাফিক্স নকল করেছে এবং সেখানে ভিডিওর শুরুতে বাংলায় কথা বলতে দেখা যায় সংবাদ উপস্থাপক হিউ এডওয়ার্ডকে।

বিবিসিকে নকল করা উল্লেখযোগ্য চ্যানেলের মধ্যে রয়েছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড লাইভ (BBC WORLD LIVE), বিবিসি নিউজ ২৪ (BBC News 24), বিবিসি ওয়ার্ল্ড টিভি (BBC WORLD TV), বিবিসি বিশ্বসংবাদ (BBC বিশ্বসংবাদ), বিবিসি ওয়ার্ল্ড ডেস্ক (BBC World Desk), বিবিসি নিউজ বাংলা (BBC News বাংলা)। নামে তো বটেই, এদের প্রতিটিরই প্রোফাইল পিকচার ও কাভার ফটোতে কোনো না কোনোভোবে বিবিসির লোগোও ব্যবহার করা হয়েছে। 

বিবিসির ব্যবহারের শর্তাবলীতে বলা হয়েছে যে বিবিসির অনুকরণ করা যাবে না এবং অনুমতি ছাড়া তাদের ট্রেডমার্ক ও লোগো ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু ইউটিউব চ্যানেলগুলো এসব কিছুই মানেনি। 

কয়েকটি চ্যানেলের ক্ষেত্রে দেখা যায়: নামের কোনো একটি হরফ এদিক-সেদিক করে বাকি সব কিছু নকল করা হয়েছে। যেমন, বিএসি ওয়ার্ল্ড নিউজ, ডিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজ, বিডিসি ওয়ার্ল্ড নিউজ, এবিসি বাংলা নিউজ, এবিসি আন্তর্জাতিক খবর, এবং এবিসি বিশ্ব সংবাদ। কিন্তু লোগো ও ব্র্যান্ডিংয়ের ধরন ঠিক বিবিসির মতোই। এদের মধ্যে সাতটি চ্যানেলের ব্র্যান্ডিংয়ে প্রোফাইল ছবিতে লোগোর সঙ্গে একটি টিক চিহ্ন জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেন দেখে মনে হয় চ্যানেলগুলো “ভেরিফায়েড”।

এ ধরনের নকল চ্যানেলগুলোর বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে বিবিসি প্রেস অফিস থেকে ইমেইলের মাধ্যমে জানানো হয়, বিবিসি বা বিবিসি নিউজ বাংলাকে নকল করে তৈরি করা ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে অতীতেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং তারা এ ধরনের নজির পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেন। তারপরও এমন চ্যানেল এখনো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

নকল সিএনএন ও অন্যান্য

ইউটিউবে এমন আরও কয়েকটি চ্যানেল পাওয়া যায়, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক বা সিএনএন-এর লোগো ও ব্র্যান্ডিং নকল করে ভিডিও আপলোড করছে। এমন দুইটি চ্যানেল হলো সিএনএন বাংলা ২৪ (CNN BANGLA 24) এবং সিএনএন বাংলাদেশ (CNN BANGLADESH)। ২০২২ সালে “সিএনএন বাংলা টিভি নিউজ” নামের একটি আইপি টিভির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল সিএনএন কর্তৃপক্ষ, যেখানে প্রায় একই রকমের লোগো ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। প্রাথমিক শুনানি শেষে এ ধরনের লোগো ব্যবহারের ওপর অন্তর্বতীকালীন নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। কিন্তু সিএনএন বাংলা টিভির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। তাদের ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেল এখনো সক্রিয়।

কাতার-ভিত্তিক আল জাজিরা, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক এবিসি এবং যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক রয়টার্সের লোগোর সঙ্গে “বাংলা” বা “বিশ্ব সংবাদ” শব্দগুলো যুক্ত করে তৈরি করা একাধিক চ্যানেলও পাওয়া যায় ইউটিউবে। যদিও বিবিসির নকল করে তৈরি করা চ্যানেলগুলোর তুলনায় সেগুলোতে সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা কম।

বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে নকল করা চ্যানেলও পাওয়া যায় ইউটিউবে। সময় টেলিভিশনকে নকল করে তৈরি হয়েছে “সময় বিডি ২৪ নিউজ”। এর সাবস্ক্রাইবার ৯০ হাজারেরও বেশি এবং প্রোফাইল ও প্রচ্ছদ ছবিতে আসল সময় টিভির লোগো দেখা যায়। চ্যানেলটি থেকে নিয়মিত ভিডিও আপলোড করা হয় এবং শিরোনাম ও থাম্বনেইলের মাধ্যমে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। ইউটিউবে আছে একাত্তর টিভিযমুনা টিভি-কে নকল করে তৈরি দুইটি চ্যানেলও।

এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন জানিয়েছেন যে, তিনিও ইউটিউবে তাদের লোগো ব্যবহার করে তৈরি করা কনটেন্ট দেখতে পেয়েছেন। প্রথমে বিভ্রান্তিতে পড়লেও পরে বুঝতে পেরেছেন যে সেটি আসলে ছিল ভুয়া কনটেন্ট। তিনি বলেছেন, “অনেক স্পর্শকাতর সময়েও আমাদের লোগো দিয়ে খবর প্রচারিত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এটি খুবই ভয়াবহ একটি ব্যাপার।”

নীতিমালা আছে প্রয়োগ নেই

কোনো ব্যক্তি বা চ্যানেলকে অনুকরণ করে তৈরি করা কনটেন্ট ইউটিউবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্ল্যাটফর্মটির অনুকরণ সংক্রান্ত নীতিমালায়। এই নীতিমালা অনুযায়ী, “কোনো চ্যানেল বা চ্যানেলের কনটেন্ট বিদ্যমান পণ্য বা সেবা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।” এর আওতায় এমন চ্যানেলও পড়বে যারা বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে অন্য কোনো চ্যানেলের প্রোফাইল, ব্যাকগ্রাউন্ড বা সামগ্রিক উপস্থিতি নকল করে।

ইউটিউবের নীতিমালায়, সুনির্দিষ্টভাবে সংবাদ বিষয়ক চ্যানেল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বিদ্যমান কোনো সংবাদ-ভিত্তিক চ্যানেলের অনুকরণ করে চ্যানেল তৈরি করা যাবে না এবং এই নীতি ভঙ্গ করা হলে চ্যানেল বা অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। উল্লিখিত সবগুলো চ্যানেলই এই অনুকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা ভঙ্গ করছে।

যেসব চ্যানেল হুবহু বিবিসির নাম বা লোগো ব্যবহার করছে— সেগুলো সরাসরি একটি সংবাদমাধ্যমকে অনুকরণ করছে। যেগুলো মাত্র একটি অক্ষর পরিবর্তন করেছে— সেগুলোর ক্ষেত্রেও বিবিসিকে অনুকরণ করার স্পষ্ট উদ্দেশ্য লক্ষ্য করা যায়। নকল যমুনা টেলিভিশন বা নকল সিএনএন ও আল জাজিরাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও চ্যানেলগুলো একইভাবে নীতিমালা ভঙ্গ করেছে, কিন্তু ইউটিউব তা ধরতে পারেনি অথবা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ডিসমিসল্যাব বিবিসিকে নকল করে তৈরি করা চ্যানেলগুলোর লিংক পাঠিয়েছিল বিবিসি বাংলার সাবেক সাংবাদিক কামাল আহমেদের কাছে। তাঁর মতে, এই চ্যানেলগুলো “বিবিসির ব্র্যান্ড ভ্যালুকে ব্যবহারের অনৈতিক ও লজ্জাজনক চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই করছে না।” তিনি বলেন, “এটি খুবই উদ্বেগজনক যে ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম একটি স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যমের পরিচয় নকল করে বানানো চ্যানেলগুলোকে চলতে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে শুধু ভুল তথ্য প্রচারই হচ্ছে না, একইসঙ্গে সেগুলো থেকে অর্থ উপার্জনও করা যাচ্ছে।”

“আপনার ব্যবসার একটি পণ্য নকল হলে আপনি যে ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন, [নকল চ্যানেলের কারণে] আমি একই ক্ষতির সম্মুখীন হই,” বলেন তালাত মামুন। “এসব নিয়ন্ত্রণে যেসব কর্তৃপক্ষের কাজ করার কথা, তারা সে অর্থে কার্যকর না। এসব ধরার জন্যে ইউটিউবের নিজস্ব মেকানিজমও তাহলে কাজ করছেনা।”

নকল চ্যানেলের থাম্বনেইলে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য 

শুধু অনুকরণের মাধ্যমেই নয়, নকল চ্যানেলগুলোর ইউটিউবের থাম্বনেইল সংক্রান্ত নীতিমালাও ভঙ্গ করছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, এমন থাম্বনেইল ব্যবহার করা যাবে না যেটি দর্শকদের বিভ্রান্ত করে, যেটি দেখে দর্শকেরা ভাবতে পারেন তারা কিছু একটা দেখতে যাচ্ছেন যা আসলে ভিডিওতে নেই।

এই গবেষণায় বিবিসিকে নকল করা ১৪টি চ্যানেলের (এক হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবারসহ) ১২টি করে সাম্প্রতিকতম ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই ১৬৮টি ভিডিওর প্রত্যেকটিতে থাম্বনেইলে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মূল ভিডিওর ছবি ও ভয়েসওভারে দেওয়া তথ্যের কোনো মিল নেই।

নকল চ্যানেলগুলোর বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে আধেয় তৈরি করে, যার বিষয়বস্তু মূলত ধর্মীয় আবেগ ও যুদ্ধ, কিন্তু থাম্বনেইলের দেওয়া তথ্য মিথ্যা এবং কখনো কখনো আজগুবিও বটে। 

১০ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইবারের চ্যানেল, আন্তর্জাতিক সংবাদে, গত ৮ মার্চ পোস্ট করা একটি ভিডিওর থাম্বনেইলে বলা হচ্ছে: ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামছে ফিনল্যান্ড। ভিডিওটি চালিয়ে দেখা যায়, ভেতরে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। এছাড়াও “ভারত-চীন পুরোদমে যুদ্ধের সূচনা”, “ইসরায়েলের রাজধানী ধ্বংস”, “রাতেই ৯০ টন পরমাণু হামলা”, “রাশিয়ার পরমাণু হামলা শুরু” – এমন অসংখ্য ভুল তথ্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে থাম্বনেইলের শিরোনামে। কখনো যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা বিস্ফোরণ, কখনোবা জো বাইডেন, নেতানিয়াহু, নরেন্দ্র মোদি ও ভ্লাদিমির পুতিনের মতো বিশ্বনেতাদের ছবিও তাতে যুক্ত করা হয়। 

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি হামলার শুরুর পর গত পাঁচ মাসে আপলোড করা বেশিরভাগ ভিডিওর থাম্বনেইলে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেখা যায় এবং প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে। “৪৮ ঘন্টায় ইসরায়েল ধ্বংস”, “ভয়ে পালাচ্ছে ইহুদি সেনা”, “নেতানিয়াহু খতম”, বা “ইসরায়েলি সৈন্য ধরে ধরে জবাই, ৬০ লাখ ইহুদিকে জবাই– এ ধরনের বিদ্বেষসূচক কনটেন্টও লক্ষ্য করা যায় বেশ কিছু থাম্বনেইলে। 

অনলাইনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রসঙ্গটি কতটা জনপ্রিয় তার একটি নজির হলো “বিবিসি ওয়ার্ল্ড টিভি” নামের চ্যানেলটি। এই চ্যানেল এরইমধ্যে ১৬৫টি ভিডিও আপলোড করেছে যার প্রতিটির শিরোনামে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ শব্দটি রয়েছে। থাম্বনেইলে রয়েছে ইসরায়েলের পরাজয়ের বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা বার্তা। যাত্রা শুরুর মাত্র দুই মাসে চ্যানেলটিতে ১০ হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার যুক্ত হয়েছে।

যে দুইটি চ্যানেল (বিবিসি-নিউজ-বিডি, বিবিসি নিউজ ২৪) বাংলাদেশ বিষয়ক ভিডিও আপলোড করে—সেগুলোর থাম্বনেইলেও ভুল তথ্য থাকে। যেমন ভিডিওর থাম্বনেইলে বলা হচ্ছে লন্ডনে তারেক জিয়ার ওপর হামলা বা বাঁচার আশা নেই ওবায়দুল কাদেরের। দুইটি ভিডিওতেই পুরোনো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ প্রচার করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক কোনো বিষয়াবলী বা থাম্বনেইলে দেওয়া তথ্যের সম্পর্ক ছিল না। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আপলোড করা আরেকটি ভিডিওর থাম্বনেইলে বলা হয়েছে পুনরায় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী, যদিও এমন কোনো ঘোষণা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আদৌ দেওয়া হয়নি।

“এই ধরনের ভুয়া চ্যানেল, ডিজিটাল জগতে তথ্যের বিকৃতি, অপতথ্য, ভুল তথ্য, মিথ্যা তথ্য এসবের [প্রসারে] নিয়ামকের ভূমিকা পালন করবে,” বলেন তালাত মামুন। “আমাদের দেশের মানুষের গড় মিডিয়া লিটারেসি তো এত বেশি না। কি দেখছি, কাকে দেখছি- এসব বিষয়ে অত জানছি না আমরা। তারপর হয়তো এক সময়ে সে তথ্যটা বিশ্বাসই করে নিচ্ছি।”

ভিউ-বেইটিং এবং প্রশ্নবিদ্ধ মনিটাইজেশন ব্যবস্থা

বিবিসির অনুকরণে তৈরি, এক হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার আছে এবং নিয়মিত ভিডিও আপলোড করা হয়– এমন ১৪টি চ্যানেলের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ১৩টি চ্যানেলই তাদের ভিডিওগুলোর জন্য আলাদা আলাদা শিরোনাম দেয় না। প্রতিটি ভিডিওরই শিরোনাম থাকে একই রকম। শুধু আপলোডের দিন অনুযায়ী তারিখ বদল করা হয়। যেমন: 

ডেইলি স্টারের ডিজিটাল গ্রোথ এডিটর আজাদ বেগ এই চ্যানেলগুলোর এ ধরনের শিরোনাম দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “এগুলো দর্শকদের আকৃষ্ট করার একটি উপায়, কারণ গুগল/ইউটিউব কখনো কখনো হেডলাইনে সাম্প্রতিক তারিখ সম্বলিত কনটেন্টগুলো আগে দেখায়।” তিনি একে “ভিউ-বেইট” বলে অভিহিত করেন যার মূল উদ্দেশ্য হলো, “দর্শকদের বিভ্রান্ত করা।”

এই গবেষণায় খতিয়ে দেখা হয়েছে যে কীভাবে ইউটিউবের সার্চ অ্যালগরিদমকে প্রভাবিত করার জন্য এমন ভিউ-বেইট কৌশল কাজ করে। “আন্তর্জাতিক খবর”, ”আন্তর্জাতিক সংবাদ”, “বিশ্ব সংবাদ”, “International Bangla News”, “antorjatik news”, “antorjatik khobor”— এই ছয়টি কিওয়ার্ড দিয়ে ইউটিউবে একাধিকবার সার্চ দিয়ে দেখা গেছে ফলাফলে নকল চ্যানেলগুলোরই আধিক্য থাকে। যেমন, “আন্তর্জাতিক সংবাদ” লিখে সার্চ দিলে ইউটিউবে যে প্রথম ১০টি ভিডিওর ফলাফল আসে, তার মধ্যে পাঁচটি ভিডিও আছে বিবিসিকে নকল করে তৈরি “আন্তর্জাতিক সংবাদ” নামের চ্যানেলটির।

২০১৮ সালে প্রকাশিত ইউনেস্কোর একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়: “কোনটাকে সংবাদ বলে বিবেচনা করা হবে— তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্মগুলোর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সীমিত। ফলে এখানে স্বীকৃত কোনো সংবাদমাধ্যমকে নকল করা খুবই সহজ এবং এর ফলে কোনো প্রতারণাকেও মনে হতে পারে সত্যি জিনিস।”

ইউটিউবে বিজ্ঞাপন থেকে আয় যেসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে তার একটি হলো ভিডিওটির ভিউ বা সেটি কত বার দেখা হয়। বিবিসির অনুকরণে তৈরি এবং নিয়মিত ভিডিও আপলোড করে— এমন ১৪টি চ্যানেলকে ‘ইজ দিস চ্যানেল মনিটাইজড’ এবং ‘ওয়াইটিলার্জ মনিটাইজেশন চেকার’ নামের দুইটি টুল দিয়ে আলাদাভাবে যাচাই করে দেখা গেছে, এদের মধ্যে ১২টি চ্যানেলের ভিডিওতে বিজ্ঞাপন চলেছে। অর্থাৎ, ইউটিউবও এখান থেকে আয় করেছে। 

সংবাদমাধ্যমের লোগো-ব্র্যান্ডিং নকল করে তৈরি করা চ্যানেলগুলো দর্শকদের বিভ্রান্ত করছে এবং এগুলো বন্ধের জন্য ইউটিউবের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ বলে মন্তব্য করেছেন কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, “ইউটিউবের এসব ভুয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাদের অবশ্যই মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অপতথ্য ছড়ানো বা ভুল উপস্থাপনের মধ্যে পার্থক্য টানতে পারতে হবে।”

আরো কিছু লেখা