
যাচাই সংখ্যায় ২০২৫ সালকে অনায়াসেই ভুল তথ্যের বছর বলা যায়। এ সময় বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা নয়টি যাচাই প্রতিষ্ঠান মিলে আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। তবে যে বছরে তিনটি যাচাইয়ের প্রায় দুটি রাজনৈতিক, প্রতি ১০টির একটি এআই দিয়ে তৈরি, আর অর্ধেকই ভিডিও বা রিল, সেটি অপতথ্যের ধরন ও বিস্তারে বড় ধরনের বিবর্তনের বার্তা দিয়েছে।
২০২৫ সালে এসব ওয়েবসাইট অন্তত ৫,৭০৬টি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে স্বতন্ত্র ভুল তথ্য পাওয়া গেছে ৪,১৩১টি, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩,১৬৭টি। বছর শেষে, ডিসমিসল্যাব স্বতন্ত্র ভুল তথ্যগুলোকে বিশ্লেষণ করেছে। সেখান থেকে শিরোনামে থাকা শীর্ষ ১০ ব্যক্তির তালিকা তৈরি করেছে। এসব প্রতিবেদনে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত ২২ হাজার পোস্ট বিশ্লেষণ করে, সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্যের উৎস হিসেবে উঠে আসা অ্যাকাউন্টগুলোও শনাক্ত করেছে।
গত বছর রাজনীতি, নির্বাচন, দুর্ঘটনা, সহিংসতা, ধর্মীয় উত্তেজনা বা আন্তর্জাতিক সংঘাত – যে ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেই ঘটনার ছায়া ধরেই গড়ে উঠেছে অপতথ্যের নতুন ঢেউ। বছরজুড়ে যাচাই হওয়া ভুল তথ্যের প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল রাজনৈতিক। আইনশৃঙ্খলা এবং ধর্মীয় অপতথ্য ছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে বিমান দুর্ঘটনা ও নভেম্বরে ভূমিকম্পের সময় দুর্যোগ সংক্রান্ত ভুল তথ্য বেড়েছে, আর আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে ভারত–পাকিস্তান ও ইরান–ইসরায়েল সংঘাত সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ভিডিও, আর এতে বড় ভূমিকা রেখেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি আধেয়। প্রায় প্রতিটি ইস্যুতে এআই-নির্মিত ভুয়া ছবি-ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। তবে বছরের শেষ দিকে বেড়েছে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে নেতা-কর্মী, সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে ভুয়া উদ্ধৃতি ছড়ানোর প্রবণতা।
এই বিশ্লেষণের পরের অংশে দেখা যাবে ২০২৫ সালে কারা সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিরোনামে এসেছেন; শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্য কোন প্ল্যাটফর্মে, কারা বেশি ছড়িয়েছেন; এবং ভিডিও, ফটোকার্ড ও এআই কীভাবে অপতথ্যের বিস্তারকে আরও দ্রুত ও জটিল করে তুলেছে।
ডিসমিসল্যাব ২০২৫ সালে প্রকাশিত চার হাজারের বেশি স্বতন্ত্র যাচাই প্রতিবেদনের শিরোনাম বিশ্লেষণ করেছে। অপতথ্যের শিরোনামে যেসব ব্যক্তি ছিলেন তাদের মধ্যে সেরা দশের একটি তালিকায় যথারীতি শীর্ষে আছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৭৪টি ফ্যাক্টচেক শিরোনামে তার নাম ছিল। এসব ভুল তথ্যের বড় অংশেই তার পুরোনো ভিডিও, ছবি ও বক্তব্যকে “সাম্প্রতিক” দাবি করে বিভিন্ন বার্তা ছড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয় বড় ধারাটি ছিল শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফেরার গুজব; সম্পাদিত ভিডিও, মিছিল-স্লোগানের ক্লিপ বা প্রচারণামূলক কনটেন্ট ব্যবহার করে দাবি করা হয়েছে তিনি শিগগির, অমুক তারিখ, বা অমুক মাসে দেশে ফিরবেন বা আবার দায়িত্ব নেবেন। ‘বৈধ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে তার প্রতি আন্তর্জাতিক ‘সমর্থন’ সংক্রান্ত ভুয়া তথ্যও নিয়মিতভাবে দেখা গেছে। শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর গুজব, এবং এআই ব্যবহার করে তৈরি করা নকল বক্তব্য বা ‘স্বীকারোক্তি’-ও ছিল বছরজুড়ে।
এরপরই রয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে পাওয়া গেছে ১৫০টি ফ্যাক্টচেক শিরোনামে। এসব ভুল তথ্যের প্রধান লক্ষ্য ছিল তার সরকারকে অস্থিতিশীল ও অবৈধ প্রমাণ করা। বছরজুড়ে ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হয়েছে “ইউনূস পদত্যাগ করেছেন” বা করবেন, সেনাবাহিনী তাকে পদত্যাগের ‘ডেডলাইন’ দিয়েছে, কিংবা সরকার ‘অবৈধ’। গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের নামে সম্পাদিত ফটোকার্ড ও ভুয়া উদ্ধৃতি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিদেশি নেতাদের উদ্ধৃতি টেনে নিষেধাজ্ঞা, নাগরিকত্ব বাতিল বা কূটনৈতিক যোগাযোগ সংক্রান্ত মিথ্যা তথ্যও ছড়ানো হয়েছে। যেমন, একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ড. ইউনূসকে ‘স্বৈরশাসক’ বলেছেন। এছাড়া পণ্যের বেচাকেনা ও প্রতারণামূলক স্কিমে তার এআই-নির্মিত ভুয়া বক্তব্য ব্যবহারের ঘটনাও দেখা গেছে।
আততায়ীর গুলিতে নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে নিয়ে অনেক মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে এবং প্রায় এক শ যাচাই প্রতিবেদনের শিরোনামে তার নাম এসেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই তাকে নিয়ে অপপ্রচার শুরু হয়; তখন অধিকাংশ ভাষ্য ছিল তার চরিত্র ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। যেমন, শুরুতেই ওসমান হাদির সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ দৃশ্য এবং একজন শিশুকে তিনি “ব্যাড টাচ” করেছেন – এমন ভুয়া দাবি ছড়ানো হয়। তবে হাদির মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ায়; হামলা, তদন্ত, গ্রেপ্তার বা বক্তব্য ঘিরে কৃত্রিম “প্রমাণ” তৈরি করে গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করা হয়। পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ হওয়া, মৃত্যু, হাসপাতালে নেওয়া কিংবা “চোখ খুলেছে” – এ ধরনের নাটকীয় দাবি ছড়াতে থাকে। একইসঙ্গে হাদি হত্যার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, বিএনপি ও জামায়াত বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিকে জড়ানোর উদ্দেশ্যে দোষারোপমূলক প্রচারণাও দেখা যায়।

তালিকার চারে বিএনপির চেয়ারপার্সন তারেক রহমান। ৭২টি শিরোনাম বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাকে ঘিরে কখনো গুণগান, কখনো বিভ্রান্তিমূলক দাবি ছড়িয়েছে। যেমন, ফুটবলার লিওনেল মেসি তারেকের সঙ্গে দেখা করেছেন বা তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন – এমন অপতথ্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল চাঁদাবাজির পক্ষে তার ভুয়া বক্তব্য বা “ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি বানানোর ঘোষণা” দেওয়ার মতো দাবিও। তবে প্রধান প্রবণতা ছিল তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে। সম্পাদিত ভিডিও, পুরোনো ক্লিপ ও এআই-সৃষ্ট ছবি দিয়ে কখনো বলা হয়েছে তিনি শিগগির দেশে ফিরবেন, কখনো লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে তাকে দেখা গেছে, ইত্যাদি। পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের নামে সম্পাদিত ফটোকার্ড ও ভুয়া উদ্ধৃতির মাধ্যমে নির্বাচন ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মিথ্যা মন্তব্য প্রচার করে গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টাও দেখা গেছে।
এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ছিলেন ৫৮টি শিরোনামে। তাকে ঘিরে অপতথ্যের বড় অংশই ছিল গ্রেপ্তার, হামলা, গুরুতর আহত হওয়া কিংবা নিহত হওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর দাবি, যেখানে পুরোনো বা অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও-ছবি প্রমাণ হিসেবে চালানো হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের নামে সম্পাদিত ফটোকার্ড, ভুয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও বানানো উদ্ধৃতি ছড়িয়ে তাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, দলীয় সমঝোতা বা সহিংস ঘটনার সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টাও ছিল।
শিরোনামের সেরা দশে অন্যদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
ভুল বা অপতথ্য অনেকেই ছড়ান — কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, কেউবা বাণিজ্যিক। সবার পোস্ট যে সমানভাবে ফ্যাক্টচেকারদের প্রতিবেদনে উঠে আসে, তা-ও নয়। সাধারণত যাচাই প্রতিবেদনে এক বা একাধিক পোস্ট প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয়। গত এক বছরে এমন ২২ হাজার ১২৯টি পোস্ট নয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এভাবে ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে ১০ হাজারেরও বেশি অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে যাদের ছড়ানো ভুল তথ্য যাচাই হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ছিল, স্বাভাবিকভাবেই, ফেসবুকে।
ফেসবুকে “গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ” নামের প্রোফাইল থেকে ছড়ানো ১১৪টি ভুল তথ্য যাচাই করেছেন ফ্যাক্টচেকাররা। এই অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে এবং বিএনপি, জামায়াত ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে নেতিবাচক পোস্ট করা হয়। অ্যাকাউন্টের নামেই দলীয় পরিচিতি রয়েছে, তবে ইউআরএলে সাদিয়া সুলতানা নাম দেখা যায়। দ্বিতীয়তে, “আমরা হারবো না” নামের আরেক অ্যাকাউন্ট, যার প্রোফাইলে শেখ হাসিনা ও তার ছেলের ছবি রয়েছে। ইনি পরিচিতিতে লিখেছেন, “পলিটিক্যাল সায়েন্সেস” এ কাজ করেন। তার প্রতিদিনকার পোস্টগুলোও আওয়ামী লীগের সমর্থনে। গতবছর তার ৮১টি পোস্ট ফ্যাক্টচেকারদের জালে ধরা পড়েছে। ফেসবুকে অপতথ্য ছড়ানোয় সেরা পাঁচের অন্য অ্যাকাউন্টগুলো হলো শিপন ইসলাম, পিন্টু ইউসুফ, তামান্না আখতার ইয়াসমীনের (অ্যাকাউন্টটি এখন পাওয়া যাচ্ছে না)। তারাও একই দলের সমর্থক।
ইউটিউবের ক্ষেত্রে চিত্রটি আলাদা। ফেসবুকে যেখানে শীর্ষ অ্যাকাউন্টগুলো মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সেখানে ইউটিউবে শীর্ষ পাঁচে থাকা অ্যাকাউন্টগুলোর উদ্দেশ্য ছিল আপাতদৃষ্টিতে বাণিজ্যিক। প্রতিটিই “মনিটাইজড”। এরা সব পক্ষকে নিয়েই কমবেশি ভুল তথ্য ছড়ায় এবং নিজেদেরকে সংবাদ চ্যানেল হিসেবে উপস্থাপন করে। এই তালিকায় শীর্ষে ছিল “বিজয় শর্টস ওয়াইটি”; এরপর পর্যায়ক্রমে পাবলিক ইনসাইট, আলো এন্টারটেইমেন্ট নিউজ, টিএনবি নিউজ টিভি এবং নিউজ ৩৬৫।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে শীর্ষ অ্যাকাউন্টগুলোকে মূলত ধর্মীয় ভুল তথ্য ছড়াতে দেখা গেছে। এদের বেশিরভাগই ভারতীয় বা দেশটির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঘরানার সমর্থক। এক নম্বরে হলো “ভয়েস অব বাংলাদেশি হিন্দুজ” নামের একটি হ্যান্ডেল; তাদের ২৫টি পোস্ট যাচাই হয়েছে। পারিবারিক বিবাদের জেরে হওয়া হামলাকে হিন্দুদের ওপর মুসলিম হামলার বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে সংঘর্ষকে বৌদ্ধদের ওপর সেনাবাহিনী ও জামায়াতের নির্যাতনের মতো ধর্মীয় মিথ্যা তথ্য ছড়ায় হ্যান্ডেলটি। বছরের মাঝপথে অ্যাকাউন্টটিকে ‘সাসপেন্ড’ বা বন্ধ করে দিয়েছে এক্স। এই তালিকার চতুর্থ নাম “পাকিস্তান আনটোল্ড”, তবে তা “দিল্লী, গুজরানওয়ালা” থেকে পরিচালিত এবং তারা “হিন্দুদের দৃষ্টিতে পাকিস্তানকে দেখে” বলে বিবরণে লেখা রয়েছে।
টিকটকে “তৌহিদুর জামান তৌহিদ” নামের অ্যাকাউন্টটি যাচাই প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশিবার (সাত) এসেছে। বিবরণে নিজেকে “প্রবাসী মুজিব সৈনিক” দাবি করা এই ব্যবহারকারী আওয়ামী লীগের সমর্থনে এআই-নির্মিত ভুল তথ্য ছড়ান (১, ২, ৩)।
২০২৫ সালে যত স্বতন্ত্র ভুল তথ্য যাচাই হয়েছে, তার শতকরা ১০ ভাগই (৪১৭টি) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি। অর্থাৎ, প্রতি ১০টিতে একটি। রাজনীতি থেকে শুরু করে দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক সংঘাত বা পরিবেশে – সব ইস্যুতে কম বেশি এআই-নির্মিত ভুল তথ্য দেখা গেছে। ওপরের চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন যত এগিয়েছে এ ধরনের ভুল তথ্যের বিস্তারও তত বেড়েছে।
রাজনৈতিক অপতথ্যে এআইয়ের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। যেমন: গত ২৫ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান দেশে ফিরলে বিমানবন্দরের পরিবারসহ, বা বিমান থেকে নামার পর দেশের মাটি স্পর্শ করেছেন দাবিতে এআই দিয়ে একাধিক ছবি ছড়িয়ে পড়ে। প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়, তিনি সুস্থ এবং হাঁটতে পারছেন দাবিতে একাধিক ছবি-ভিডিও ছড়ায়।
এছাড়া ভারতের সংসদে শেখ হাসিনার বক্তব্য দাবিতে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, আবার কোথাও ‘হাসিনাকে চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড বা দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা ছাত্রদের ছবি প্রচার করা হয়েছে, আবার কোথাও “পাপেট ভিডিও মেসেজ”–এর মতো কৌশলে শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরা’ বা রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ কৃত্রিম ভিডিও প্রচারণা চালানো হয়েছে। এআই দিয়ে বানানো ছবি-ভিডিও দিয়ে (১, ২, ৩) বছরজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বছরজুড়ে এআই-অপতথ্যের শিকার হন বিনোদন-ব্যক্তিত্বরাও। যেমন, মডেল ও অ্যাক্টিভিস্ট ফারজানা সিঁথির নাচের দৃশ্য দাবিতে ছড়ানো একটি ভিডিও তৈরি করা হয় ভারতীয় এক নৃত্যশিল্পীর নাচের ভিডিওকে ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃত করে। আবার ভারত থেকে পরিচালিত এক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ছবি সম্পাদনা করে অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মানের বলে প্রচার করতে দেখা যায়।
দুর্যোগেও তা-ই। নভেম্বরে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের সময়ে (১, ২), কিংবা জুলাইয়ে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হলে সেই সময়ে এআই দিয়ে বানানো বেশকিছু ছবি আসল ঘটনার বলে ছড়ানো হয়। গত ২১ নভেম্বর বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঘটনায়ও বেশ কিছু এআই ভিডিও ছড়ায়।
বছরজুড়েই রাজনীতি নিয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, যাচাইও হয়েছে বেশি। প্রতিটি প্রান্তিকেই বিষয়ভিত্তিক ভুল তথ্যে এক নম্বরে ছিল রাজনীতি। তবে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রতি মাসে যেখানে গড়ে দুইশ রাজনৈতিক ভুল তথ্য যাচাই হয়, তা ডিসেম্বরে ৪০৮টিতে দাঁড়ায়।
সেপ্টেম্বর থেকে রাজনীতি নিয়ে অপতথ্য বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন। পরের মাসগুলোতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়, পদ্ধতি ও বিভিন্ন দলের মনোনয়ন নিয়ে (১, ২, ৩) ভুল তথ্য ছড়াতে থাকে। নভেম্বরের মাঝামাঝি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায় ঘিরে লকডাউন কর্মসূচি (১, ২) এবং ডিসেম্বরে আততায়ীর গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও মৃত্যু রাজনৈতিক অপতথ্য বিস্তারে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তারিখ ঘোষণার পর, মাত্র এক মাসে নির্বাচন নিয়ে অন্তত ৫৫টি শনাক্ত হয়, যার বেশিরভাগই ছিল বিভিন্ন জোট ও ভুয়া জরিপের ফলাফল ঘিরে। পাশাপাশি মনোনয়ন না পাওয়া বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাঙচুর-অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য বলে এআই-নির্মিত ভিডিও, নেতা-কর্মীদের বহিষ্কার বা পদত্যাগের ভুয়া দাবি এবং এনসিপির মনোনয়নপ্রাপ্ত হিসেবে ভুল ব্যক্তিকে জড়িয়ে পোস্ট ছড়াতে দেখা যায়।

২০২৫ সালে রাজনীতির বাইরে আইনশৃঙ্খলা (যাচাই হওয়া ভুল তথ্যের ৭%), ধর্ম (৬%), আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি (৬%) ও দুর্যোগ (৪%) নিয়ে প্রচুর ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। সার্বিকভাবে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা ছড়ানোর প্রবণতা বজায় ছিল। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ৯০টি যাচাই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ধর্ষণ নিয়ে, খুন বা হত্যা নিয়ে ছিল ১০০টির বেশি, নির্যাতন নিয়ে ছিল ৪৫টি। আর ধর্মীয় ক্যাটাগরিতে বছরজুড়ে বাংলাদেশে হিন্দু বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন বা নিপীড়নের ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মে–জুনে, মূলত ভারত–পাকিস্তান এবং ইরান–ইসরায়েল সংঘাতকে ঘিরে।
বছরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ভিডিওর মাধ্যমে। মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৫২ শতাংশ ছড়িয়েছে ভিডিও আকারে। পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ভুয়া দাবিতে সাম্প্রতিক বলে ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া ভুয়া দাবিতে ছড়ানো হয়েছে এআই দিয়ে বানানো ভিডিও-ও।
২১ শতাংশ ভুল তথ্য ছড়িয়েছে গ্রাফিক কার্ডের মাধ্যমে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামে, সরকারের উপদেষ্টা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নামে ভুয়া উক্তি বানিয়ে তা প্রচার করা হয়েছে। ভুয়া ফটোকার্ডের ৭৪ শতাংশই ছড়িয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে নকল করে। ডিসেম্বরে এসে ভিডিওর চেয়ে গ্রাফিক কার্ডের মাধ্যমে ভুল তথ্য বেশি ছড়াতে দেখা গেছে। আর ছবির মাধ্যমে ছড়িয়েছে যাচাই হওয়া অপতথ্যের প্রায় ১৮ শতাংশ।
২০২৫ সালে ভুল তথ্যের প্রবণতা ও ভাষ্য বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ইস্যুতে ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করে এমন ৯টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের প্রতিবেদন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সাইটগুলো হলো রিউমর স্ক্যানার, বুমবিডি, নিউজচেকার, ফ্যাক্ট ক্রেসেন্ডো, ফ্যাক্ট ওয়াচ, এএফপি বাংলাদেশ, আজকের পত্রিকা, ডিসমিসল্যাব ও দ্য ডিসেন্ট। বিষয়বস্তু অনুযায়ী এসব প্রতিবেদনকে ১৭টি ক্যাটেগরিতে ভাগ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে এসব সাইটে মোট ৫৭০৬টি ফ্যাকচেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও একই ভুল তথ্য নিয়ে একাধিক সাইটে প্রতিবেদন থাকায় স্বতন্ত্র বা ইউনিক ভুল তথ্য নির্ধারণে প্রতি ঘটনায় একটি প্রতিবেদন গণনা করা হয়েছে। এভাবে ২০২৫ সালে স্বতন্ত্র বিষয়ের ফ্যাকচেক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে ৪১৩১টি। কখনো কখনো একটি ঘটনায় একাধিক ভুল তথ্য যাচাই করে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এমন ক্ষেত্রে একাধিক যাচাই থাকলেও প্রতিবেদনটিকে একক হিসেবে গণনা করা হয়েছে, ফলে যাচাই হওয়া ভুল তথ্যের মোট সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় সামান্য কম হতে পারে।