
স্যাঁতসেঁতে এক ঘরে অসুস্থ ছেলের মাথায় পানি ঢালছেন এক মা। দরজায় বাড়িওয়ালার কড়া নাড়া। তার হাতে মাত্র ২০ টাকা। এই টাকায় ছেলের ওষুধ কেনাও সম্ভব না, বাড়িভাড়া তো দূরের কথা! এরপরই একটি স্বনামধন্য ই-কমার্সের এজেন্ট হিসেবে ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ দেখানো হয় বিজ্ঞাপনে। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওই নারী ও তার সন্তান নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন।
আরেকটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, পারিবারিক সহিংসতার শিকার এক নারী স্বামীর নির্যাতনে ঘরের এক কোণে বসে কাঁদছেন। মাকে বাঁচাতে ছোট সন্তান চলে আসে দুজনের মাঝে। আকুতি জানায়, বাবাকে থামার। ওই মুহূর্তে নারীটি বুঝতে পারেন, সময় এসেছে সন্তান নিয়ে এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার। আর তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় স্মার্টফোন-ভিত্তিক একটি চাকরির সুযোগ।
তবে বিজ্ঞাপনের এই নারীরা বাস্তব নন। গল্পগুলোও নয়। এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন, যা পৌঁছে যাচ্ছে বাস্তব জগতের সেইসব নারী ব্যবহারকারীদের ফেসবুক ফিডে, যারা সত্যিই খুঁজছেন সামান্য আয়, কিছুটা আর্থিক স্বাধীনতা।
ঢাকার সাবিনা আক্তার (ছদ্মনাম) এমনই একটি বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল, “গৃহিণীদের জন্য উপযুক্ত।” শুরুতে অল্প লাভ দেখিয়ে তাকে আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। স্বামীর কাছ থেকে ধার করে তিনি শেষ পর্যন্ত ৯৭০ টাকা হারান। টাকার অঙ্ক হয়তো বড় নয়, কিন্তু লজ্জা আর দোষারোপের ভয়ে কাউকে বলতে পারেননি। “জিনিসটা লজ্জার না? কীভাবে কাউকে বলি?”- প্রশ্ন ছিল তার। পরে স্বামী জানতে পেরে রাগারাগিও করেন।
শুধু যে গৃহিণী নারীরাই বিভ্রান্ত তা নয়। মানসুরা (ছদ্মনাম), একজন দন্ত চিকিৎসক, সন্তানসম্ভবা অবস্থায় কিছুদিন কাজের বাইরে ছিলেন। ঘরে বসে নিজে কিছু করার কথা ভাবছিলেন। এমন এক বিজ্ঞাপন তার ফিডে এলে তিনিও আবেদন করার কথাও ভাবেন। তবে শেষ মুহূর্তে কাছের মানুষের পরামর্শে থেমে যান।
বিজ্ঞাপনগুলোতে স্বনামধন্য ই-কমার্স জায়ান্ট ‘দারাজ’-এর নামে রিমোট চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, দারাজের এমন কোনো প্রকল্প নেই। পুরো বিষয়টিই স্ক্যাম। আর এই স্ক্যামে ব্যবহার করা হচ্ছে বার্নার ফেসবুক পেজ, সাময়িক ডোমেইন, এবং দারাজের নামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ভুয়া ওয়েবসাইট।

এসব আর্থিক প্রতারণার বিজ্ঞাপন মেটার নীতিবিরোধী হলেও দীর্ঘসময় ধরেই বিজ্ঞাপনগুলো চলছে। বরং সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ নথিতে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, কোনো ব্যবহারকারী এসব স্ক্যামের বিজ্ঞাপনে কখনো আগ্রহ দেখালে মেটার অ্যালগরিদম বারবার এমন বিজ্ঞাপন তার সামনে পৌঁছে দিচ্ছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট এ এম ফারুকের মতে, মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা এখন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। বিজ্ঞাপনের ভাষা, ভিজ্যুয়াল এবং ব্যবহারকারীর পূর্ববর্তী আচরণ বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম অনুমান করে কে বেশি সাড়া দিতে পারেন। ফলে “ঘরে বসে আয়” বা “গৃহিণীদের জন্য”-এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হলে, আগে একই ধরনের কনটেন্টে সাড়া দেওয়া ব্যবহারকারীদের কাছেই বিজ্ঞাপনটি বেশি পৌঁছাতে পারে।
জাস্টিসিয়া ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্কের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নাজিয়া নূরে জারিনের মতে, এটি নারীদের টার্গেট করে করা এক ধরনের প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধ। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে নারীরা প্রতারণার শিকার হলেও অনেক সময় অভিযোগ করতে দ্বিধা করেন। প্রতারকরা সচেতনভাবেই নারীদের এই আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নীরবতার সুযোগ নেয়। আর প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন কাঠামো ভুক্তভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে তোলে।
ফেসবুক বিজ্ঞাপনে রিমোট-জব স্ক্যাম নেটওয়ার্ক
মেটার অ্যাড লাইব্রেরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র একদিনেই অন্তত ৪০টি ভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে “দারাজ রিমোট ওয়ার্ক” নামে ৪৩৫টি বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছিল। বিজ্ঞাপনগুলোর ১৭২টি বিজ্ঞাপনই ছিলো বিভিন্ন নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার গল্প। এসব বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে, “গৃহিণীদের জন্য উপযুক্ত” এবং “ঘরে থাকা মায়েদের জন্য” ইত্যাদি বাক্য।
পেজগুলোর নামকরণে মিল দেখা যায়। ২০টি পেজের নাম সরাসরি দারাজের অনুকরণে। যেমন: Darazhr6600, Darazbd015, Darazbd021। বাকি ২০টি পেজ বিভিন্ন বিদেশি নাম ব্যবহার করে। যেমন: Alena Annq Donnie, Brookeo Love Kyle। পেজ ট্রান্সপারেন্সি ডেটা অনুযায়ী অ্যাডমিনদের অবস্থান হংকং, বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে। সবগুলো পেজই নভেম্বর ২০২৫-এর পর তৈরি করা হয়।
ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট এ এম ফারুকের মতে, পেজ ট্রান্সপারেন্সিতে যে অবস্থান দেখা যায়, তা কেবল পেজের অ্যাডমিনদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু বিজ্ঞাপন চালানোর জন্য পেজের অ্যাডমিন হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। মেটার কাঠামোয় ‘অ্যাডভার্টাইজার’, ‘পার্সিয়াল অ্যাকসেস’ বা ‘টাস্ক অ্যাকসেস’ থাকলেও বিজ্ঞাপন পরিচালনা করা যায়।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে পেজের অ্যাডমিন এক দেশে অবস্থান করছেন, ধরুন হংকং বা যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু বিজ্ঞাপনটি বাস্তবে অন্য দেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। কারণ বিজ্ঞাপনদাতার অবস্থান পেজ ট্রান্সপারেন্সিতে আলাদাভাবে প্রকাশিত হয় না।
বিজ্ঞাপনগুলো ব্যবহারকারীদের অন্তত ১৭টি ভিন্ন ডোমেইনে পাঠায়। যেমন: acticyy.fun, gongdan.shop, pmax.space, clothesora.com। আলাদা ইউআরএল ব্যবহার করা হলেও ওয়েবসাইটগুলোর লেআউট এক। “বাংলাদেশ পার্ট-টাইম” শিরোনামের একটি ব্যানারে দাবি করা হয় যে ৩৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি মাসে ৬০ হাজার পর্যন্ত টাকা আয় করছেন। সাইটগুলোতে “কোনো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই” এবং “দৈনিক আয়” ইত্যাদি উল্লেখ করে একটি কমলা রঙের “আবেদন করুন” বাটনে ক্লিক করতে বলা হয়।
“আবেদন করুন” বাটনে ক্লিক করলে তা সরাসরি নিয়ে যায় বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে। কোনোটিই বাংলাদেশি নাম্বার নয়। ডিসমিসল্যাব ১৭টি ডোমেইন থেকে তিনটি ভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার পায়। অ্যাকাউন্টগুলোতে দারাজের লোগোযুক্ত আইডি কার্ড পরা তিনজন ভিন্ন এআই নির্মিত নারীর ছবি ব্যবহার করা হয়। যোগাযোগ করা হলে প্রতি ক্ষেত্রেই “ফারিয়া ইসলাম তাবাসসুম” নামের একজন নিজেকে দারাজের মানবসম্পদ বিভাগের প্রতিনিধি দাবি করে কথা বলেন।

ফারিয়া ইসলাম তাবাসসুমের যে ছবি আইডিতে ব্যবহার করা হয়, তা এআই দ্বারা সম্পাদিত। প্রথমেই কাজের জন্য আগ্রহী ব্যক্তির নাম, বয়স, লিঙ্গ এবং পেশা ইত্যাদি জানতে চাওয়া হয়। এরপর বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট আছে কি না, তা নিশ্চিত হয়ে দারাজের অনুরূপ একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয় এবং সেখানে রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয়।
দারাজের প্রকৃত ডোমেইন নাম daraz.com হলেও এর আদলে তৈরি ভুয়া ওয়েবসাইটটির ডোমেইন নাম daraz.pw। রেজিস্ট্রেশনের পরপরই ড্যাশবোর্ড ব্যালেন্সে একটি ছোট “বোনাস” (যেমন- ৬০ টাকা) দেখানো হয়। এরপর ব্যবহারকারীদের তাদের অ্যাকাউন্ট “অ্যাক্টিভ” করতে এবং সাধারণ অর্ডার-প্রসেসিং টাস্কের মাধ্যমে কমিশন আয় শুরু করতে ১০০ টাকা জমা দিতে বলা হয়। তবে, টাকা তোলার বিষয়টি শর্ত সাপেক্ষ। শুরুতে কিছু টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হলেও আস্তে আস্তে তাদের বিনিয়োগ করা অর্থের দাবি বাড়তে থাকে।
দারাজের ভেরিফায়েড কাস্টমার কেয়ার চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, daraz.pw তাদের কোনো অফিসিয়াল ডোমেইন নয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, উক্ত সাইটটির সঙ্গে দারাজ বাংলাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই।

বিজ্ঞাপন চালানো একাধিক ফেসবুক পেজে ভুক্তভোগীদের অসংখ্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সেখান থেকেই ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
ঢাকার একজন ভুক্তভোগী সাবিনা আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, তারা মূলত নারীদের টার্গেট করেই কাজটা করে। লিখেই দেয় যে কাজটা গৃহিণীদের জন্য। আর তা দেখেই তিনি আগ্রহ থেকে জানুয়ারির শুরুর দিকে কাজের আবেদন করেন। তিনি স্বামীর থেকে টাকা নিয়ে তার ফোনেই কাজটি করেন। এবং শেষ পর্যন্ত ৯৭০ টাকা হারান।
সাবিনা জানান তিনি ফেসবুকে ম্যানুয়ালি পেজটিতে রিপোর্ট করেছিলেন, কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।
মানুষ বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসি করবে সেই ভয় থেকে সাবিনা কারও সঙ্গে বিষয়টি শেয়ারও করেনি। “জিনিসটা লজ্জার না?” বলেন তিনি। তবে তার স্বামীকে বিষয়টি জানালে স্বামী কিছুটা রাগারাগি করেন বলেও জানান তিনি। যে টাকাটা তিনি হারিয়েছেন সেটিও ছিল স্বামীর থেকে ধার করা।
আরেকজন ভুক্তভোগী ডিসমিসল্যাবকে জানান, তিনি শুরুতেই কথা বলে নিয়েছিলেন যে ৫০০ টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে না। তাকে প্রথমে গেমের মতো কিছু টাস্ক দেওয়া হয়। প্রথমবার তিনি ৮০০ টাকা উত্তোলন করতে পারেন। এরপর আরও কিছু টাস্ক সম্পাদনার জন্য অ্যাকাউন্ট “আপগ্রেড” করতে হবে- এমন কথা শুনে এক হাজার ৪০০ টাকা জমা দেন। পরবর্তীতে তার ড্যাশবোর্ডে ব্যালেন্স “বাড়লে”ও তাকে টাকা তুলতে দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, তাকে বলা হয়, আরও বেশি টাকা উত্তোলন করতে হলে আরও বেশি টাস্কের জন্য টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। নিজে প্রতারণার শিকার হলেও অন্যরা যেন সতর্ক থাকে সেই পরামর্শ দেন তিনি।
ফেসবুকের বিভিন্ন রিভিউ ও কমেন্ট সেকশনেও একাধিক নারী প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। এক ব্যবহারকারী জানান, তার ২০০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন। মন্তব্যে অন্যরাও একইভাবে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন।

নাজিয়া নুরি জারিন বলেন, যেসব নারী টাকা হারান, তারা অনেক সময় বিষয়টি কাউকে বলতে পারেন না, “সহায়তা চাওয়ার বদলে তারা ভয় পান যে, উলটো তাদেরই দোষারোপ করা হবে বা কথা শোনানো হবে। তাই তারা চুপ করে থাকেন।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের আর্থিক ভুল অনেক সময় তাদের যোগ্যতা বা পরিবারের সম্মানের সঙ্গে জড়িয়ে দেখা হয়, “পুরুষেরাও টাকা হারায়। কিন্তু নারীরা বেশি ভয় পান, সম্মান হারানোর।”
বাংলাদেশে ডিজিটাল স্পেস এখনো নারীবান্ধব নয়। ২০২২ সালের অ্যাকশন এইডের সমীক্ষা অনুযায়ী ৬৩ শতাংশ নারীই অনলাইনে হয়রানির শিকার হন। নারীদের ডিজিটাল হয়রানি মোটাদাগে প্রযুক্তি-নির্ভর হয়রানি বা টেক-ফ্যাসিলিটেটেড অ্যাবিউজ হিসেবে পরিচিত। সাইবার বুলির মতো প্রচলিত হয়রানির সঙ্গে এখন নারীদের লক্ষ্য করে পাতা হচ্ছে আর্থিক প্রতারণার ফাঁদও। বিশেষ করে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে প্রতারক চক্র এখন ঝুঁকিতে থাকা নারীদের কাছে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে আরও সহজে।
নাজিয়া মনে করেন, এসব প্রতারণাকে শুধু টাকা হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তিনি একে টেক-ফ্যাসিলেটেড হার্ম বা প্রযুক্তি নির্ভর ক্ষতির অংশ হিসেবে মনে করেন।
তার মতে, “প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সংজ্ঞায় আনা কঠিন, কারণ প্রযুক্তি খুব দ্রুত বদলে যায়। প্রযুক্তির মাধ্যমে যখন সহিংসতা বা ক্ষতি হয়, তখন সেটাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।”
২০২৫ সালে ইসরায়েল ইন্টারনেট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসওসি- আইএল) ইন্টারনেট সেফটি হটলাইন প্রকাশিত ‘অ্যালগরিদমিক স্ক্যামস: সোশাল মিডিয়া অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এজ ইনস্ট্রুমেন্টস অব ফিনান্সিয়াল ফ্রড’ শীর্ষক রিপোর্টে ২০২৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইন্টারনেট সেফটি হটলাইনে অভিযোগ হিসেবে জমা পড়া স্ক্যাম বিজ্ঞাপনগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রতিবেদনে দেখানো হয়, কীভাবে জেনারেটিভ এআই, ডিপফেক ভিডিও এবং প্ল্যাটফর্মের টার্গেটেড বিজ্ঞাপন অবকাঠামো একত্রে ব্যবহার করে আর্থিক প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন অডিয়েন্সকে টার্গেট করে প্রচারিত হচ্ছে এসব বিজ্ঞাপন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্ল্যাটফর্মগুলোর স্পন্সরড প্রমোশন ম্যাকানিজম সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে বিজ্ঞাপন প্রচারে দক্ষ। এগুলো নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন, নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম।

ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট এ এম ফারুকের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেটা তাদের বিজ্ঞাপন সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার বাড়িয়েছে। বর্তমানে বিজ্ঞাপনদাতারা বয়স, জেন্ডার ও লোকেশন নির্ধারণ করতে পারলেও, বিজ্ঞাপনটি বাস্তবে কাদের কাছে বেশি প্রদর্শিত হবে তা বড় অংশেই নির্ধারণ করে মেটার স্বয়ংক্রিয় অ্যাড ডেলিভারি সিস্টেম।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মেটার অ্যালগরিদম বিজ্ঞাপনের টেক্সট ও ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণ করে এবং ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও পূর্ববর্তী আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। ফলে যদি কোনো বিজ্ঞাপনে “ঘরে বসে আয়” বা “গৃহিণীদের” জন্য এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়, এবং পূর্বে এ ধরনের কনটেন্টে যে ধরনের ব্যবহারকারী গোষ্ঠী বেশি সাড়া দিয়ে থাকে, তাদের কাছেই বিজ্ঞাপনটি বেশি দেখাতে পারে।
নাজিয়া নূরে জারিন বলেন, এই ধরনের বিজ্ঞাপন বানানো হয় নারীদের বাস্তব আর্থিক পরিস্থিতি বুঝেই। তিনি ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “এই বিজ্ঞাপনগুলো আমার নিজের নিউজফিডেও আসত। আমি ভাবতাম, এগুলো আবার কে বিশ্বাস করবে?” কিন্তু নাজিয়ার চিন্তা বদলে যায়, যখন তার বান্ধবী এই রিমোট কাজের জন্য আবেদন করবেন কি না, সে ব্যাপারে পরামর্শ চান।
তিনি বলেন, “আমি বুঝলাম, প্রতারকরা খুব সচেতনভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষদের টার্গেট করে, বিশেষ করে সেই নারীদের, যারা টাকা আয় করতে মরিয়া এবং অনেক সময় বিষয়টি গোপন রাখতে চান।”
নাজিয়া জানান, বিজ্ঞাপনগুলোতে বারবার কিছু নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেমন “ঘরে বসে”, “মাত্র ২ ঘণ্টায়”। তার মতে, “সমাজ প্রত্যাশা করে যে নারীরা ঘরে থাকবে আর সংসার সামলাবে। তাদের নিজেদের জন্য সময় খুব কম, ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও প্রায় নেই। প্রতারকরা এটা খুব ভালো করেই জানে।”
মেটার বিজ্ঞাপন মানদণ্ড অনুসারে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত সব বিজ্ঞাপনকে প্ল্যাটফর্মের ‘ফ্রড, স্ক্যামস ও ডিসেপটিভ প্র্যাক্টিসেস’ সংক্রান্ত কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলতে হয়। এই মানদণ্ড অনুসারে ব্যবহারকারীদের প্রতারিত বা বিভ্রান্ত করতে পারে এমন সব কনটেন্ট অগ্রহণযোগ্য বা আনএকসেপ্টেবল কনটেন্ট হিসেবে বিবেচিত হবে।
মেটার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের ফ্রড, স্ক্যাম অ্যান্ড ডিসেপটিভ প্র্যাকটিসেস নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো চাকরির প্রস্তাব যদি স্পষ্ট না হয়, অল্প পরিশ্রমে আয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় কিংবা চাকরি দেওয়ার আগে অগ্রিম ফি চাওয়া হয় তবে তা ‘জব ফ্রড অ্যান্ড স্ক্যামস’ নীতিমালার অধীনে পড়বে। একইসঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ভুয়া ভাবে ব্যবহার করা, তাদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করা বা ব্র্যান্ডিং অনুকরণ করে প্রতারণা চালানোও নীতিমালার পরিপন্থি।
দারাজের নাম ও লোগো ব্যবহার করে রিমোট-জবের প্রস্তাব, “এইচআর প্রতিনিধি” পরিচয়ে যোগাযোগ, এবং অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করার জন্য অর্থ জমা দিতে বলা- সবগুলো বিষয়ই কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের ‘জব ফ্রড’, ‘ব্র্যান্ড/এনটিটি ইমপারসোনেশন’ এবং ‘অ্যাডভান্স ফি স্ক্যাম’ সংক্রান্ত নীতিমালার পরিপন্থি।
নীতিমালায় আরও উল্লেখ আছে, একাধিক অ্যাকাউন্ট সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে প্রতারণা এক ধরনের সংগঠিত প্রতারণামূলক আচরণ হিসেবে, যার অনুমোদন মেটা দেয় না। অসংখ্য ফেসবুক পেজ, ভিন্ন ভিন্ন ডোমেইন এবং একাধিক যোগাযোগ নম্বর ব্যবহার করে একই কাঠামোর বিজ্ঞাপন চালানো অর্গানাইজড ফ্রড নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বিধিনিষেধের মধ্যে পড়ে। পাশাপাশি, ব্যবহারকারীদের ফেসবুক থেকে সরিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে নিয়ে গিয়ে যোগাযোগ স্থাপন এবং অফ-প্ল্যাটফর্মে তথ্য ও অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া অফ-প্ল্যাটফর্ম ডাইভারশন ঝুঁকির মধ্যেও পড়ে।
ফারুক বলেন, এই ধরনের স্ক্যাম বিজ্ঞাপনগুলো সাধারণত কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো দেখে পরিচালিত হয়। সাধারণত মেটায় এ ধরনের স্ক্যাম বিজ্ঞাপন সহজে দেওয়া যায় না। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যামাররা মেটার অটোমেটেড অ্যাড অ্যাপ্রুভাল সিস্টেমকে ‘বাইপাস’ করতে দক্ষ। তবে বাংলাদেশে তারা স্থানীয় এজেন্টও নিয়োগ করে যারা বিকাশ বা নগদের মতো স্থানীয় মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করে।
তিনি বলেন, বিজ্ঞাপন দেওয়া পেজগুলোর নাম দেখেই খুব সহজে বোঝা যায় যে সেগুলো ভুয়া। কোনো ক্ষেত্রে বিদেশি নাম থাকে আবার কোনো ক্ষেত্রে স্ক্যামাররা পরিচিত ব্র্যান্ডের নামের সাথে বিভিন্ন র্যান্ডম সংখ্যা বা শব্দ যুক্ত করে পেজ খোলে সেগুলো চালায়। তিনি পেজের নাম থেকে ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ মেটা নথির ভিত্তিতে বলা হয়, কোম্পানিটি নিজেই ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণভাবে অনুমান করেছিল, তাদের মোট আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ— প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার, স্ক্যাম ও নিষিদ্ধ পণ্যের বিজ্ঞাপন থেকে আসতে পারে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যবহারকারীদের সামনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ বিলিয়ন “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” স্ক্যাম বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়, যেগুলো থেকে বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ নথিতে স্বীকার করা হয়েছে, কোনো ব্যবহারকারী একবার স্ক্যাম বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে বিজ্ঞাপন ব্যক্তিগতকরণ অ্যালগরিদম তাকে আরও অনুরূপ বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করে। অর্থাৎ, একবার কোনো ব্যবহারকারী এধরনের বিজ্ঞাপনে লাইক বা কমেন্ট করলে অ্যালগরিদমিকভাবে একই ধরনের প্রতারণার পুনরাবৃত্তির মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।
মেটার অ্যাড লাইব্রেরিতে সংশ্লিষ্ট কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি একদিনে ৪০টি পেজ থেকে ৪৭০টি খণ্ডকালীন কাজের বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। প্রতিটি পেজের পেজ ট্রান্সপেরেন্সি ও পেজ খোলার সময় যাচাই করা হয়। বিজ্ঞাপনগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত লিংক বিশ্লেষণ করে মোট ১৭টি পৃথক ডোমেইন শনাক্ত করা যায়। এসব ডোমেইনের ইউআরএল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেগুলো ব্যবহারকারীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট যোগাযোগ নম্বরে নিয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করে কথিত এজেন্টদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের দেওয়া দারাজের ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক ও বিকাশ নম্বর যাচাই করা হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনগুলোতে ব্যবহৃত ভিডিও ও এজেন্টদের ছবিগুলো পর্যবেক্ষণ করে সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত কি না তা যাচাই করা হয়।