মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
হামের টিকার বদলে থুতু মালিশের পরামর্শ, ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও

হামের টিকার বদলে থুতু মালিশের পরামর্শ, ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

হাম টিকা শয়তানদের এজেন্ডা, বাচ্চাদের দিতে হবে “নববী” ও “আয়ুর্বেদী” চিকিৎসা। টিকা প্রদানের মূল উদ্দেশ্য “ওষুধের পরীক্ষা চালানো”। সম্প্রতি ফেসবুকে একাধিক প্রোফাইল, পেজ ও গ্রুপ থেকে এমন তথ্য সম্বলিত হুবহু একই ধরনের পোস্ট করে প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে। সবগুলো পোস্টই করা হয়েছে গত ৩০ মার্চ থেকে ০১ এপ্রিল সময়সীমার মধ্যে। এদিকে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব দিন দিন বেড়ে চলেছে ও হামের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৩৮ জন শিশু। 

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা,প্রথম আলোডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর প্রাদুর্ভাবে অনেক শিশু মৃত্যুবরণ করছে। ডেইলি স্টারের গত ৩০ মার্চ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে এ বছর হাম ও এর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৩৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মার্চ মাসেই মারা গেছে ৩২ জন। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, হাসপাতালটিতে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় সবাই হামের টিকার আওতার বাইরে ছিল।

হাম টিকা নিয়ে গুজব: হামের টিকার বদলে থুতু মালিশের পরামর্শ, ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও
হামের প্রকোপ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত ১ এপ্রিলের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৫৯ শতাংশেরই বয়স শূন্য থেকে ৯ মাসের মধ্যে। যাদের হামের প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার বয়স এখনো হয়নি। প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, চারপাশে অন্যান্য শিশুরা টিকার আওতার বাইরে থাকায় তাদের মাধ্যমে নবজাতকদের মাঝে দ্রুত হাম ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া হাম আক্রান্ত হওয়ার পেছনে আবহাওয়াগত কারণের কথাও উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে যখন এমন চিত্র উঠে আসছে, ঠিক তখনই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামের টিকা নিয়ে চলছে নেতিবাচক প্রচারণা। বিভিন্ন ধর্মীয় চিকিৎসার পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে মানুষের মাঝে ছড়ানো হচ্ছে বিভ্রান্তি। ফেসবুকে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে তিন ধরনের বয়ানে মোট ৭৮ টি টিকা-বিরোধী পোস্ট খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব।

গত ৩০ মার্চ ফেসবুকে “আরিয়ান রশিদ (Ariyan Rasid)” নামের প্রোফাইল থেকে এ ধরনের একটি পোস্ট করতে দেখা যায়। ডিসমিসল্যাবের খুঁজে পাওয়া পোস্টগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে পুরোনো। পোস্টে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম “দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস”- এর একটি ফটোকার্ড যুক্ত আছে। ফটোকার্ডে লেখা আছে “হামের বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন জুনে, লক্ষ্য ২ কোটি শিশু।” দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এমন শিরোনামের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। যেখানে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর প্রকাশ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ৫ এপ্রিল থেকে হামের জরুরি টিকাদান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

আরিয়ান রশিদের পোস্টের ক্যাপশনের শুরুতেই লেখা আছে, “No ❌ কেউ নিজেদের বাচ্চাদের এই বিশেষ টিকা দিবেন নাহ !  সচেতন করুন মানুষকে ! বাড়িতে মা খালাদের জানিয়ে রাখুন , শয়তান গুলোর এজেন্ডা ৩০ এর কাজ পুরো দমে আগাচ্ছে, বাহিরের প্যাকেট জাতীয় বারকোড ওয়ালা খাবার এবং এ ধরনের সকল টিকা থেকে নিজেও বিরত থাকুন বাচ্চাদেরকেও বিরত রাখুন !”

এরপরেই লেখা হয়, “এসব ক্যাম্পেইন সাধারণত স্কুল কলেজে করা হয় , যেদিনগুলো এই টিকা দেওয়ার ক্যাম্পেইন চলবে সেই দিনগুলো বাচ্চাকে স্কুলে যেতে দিবেন না।”

একই পোস্টে হাম প্রতিরোধে নববী ও আয়ুর্বেদী চিকিৎসা প্রয়োগের আহবান জানিয়ে লেখা হয়, “হাম এর জন্য প্রাকৃতিক চিকিৎসা এপ্লাই করুন – নববী চিকিৎসা এপ্লাই করুন ! এলাকায় খোঁজ করুন কোথায় ভালো মানের হারবাল বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক আছে !”

ইসলাম ধর্মের প্রচলিত আধ্যাত্মিক চিকিৎসা “রুকাইয়াহ”- এর মাধ্যমে শিশুর শরীরে থুথু দিয়ে মালিশ করতে বলা হয় একই পোস্টে। লেখা হয়, “সর্বপ্রথম তাকে রুকাইয়ার পানি দিয়ে গোসল করাবেন । এবং রুকাইয়া করা পানি পান করাবেন এবং সারা শরীরে সকাল সন্ধ্যা রুকাইয়া করে হালকা থুথু দিয়ে পরিষ্কার হাতে মালিশ করবেন ।”

এছাড়াও কিছু “আয়ুর্বেদী” চিকিৎসার পরামর্শ হিসেবে শরীর ঠান্ডা রাখা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া, আলো নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়। ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার, তরল খাবার প্রদান ও ভিটামিন-সি গ্রহণ করতে বলা হয়। ত্বকের চুলকানি কমাতে দেওয়া হয় নিম পাতা, অ্যালোভেরা (ঘৃতকুমারী) জেল, ওটমিল বা বেকিং সোডা ব্যবহার করার পরামর্শ।

হাম টিকা নিয়ে গুজব: হামের টিকার বদলে থুতু মালিশের পরামর্শ, ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও
“আরিয়ান রশিদ (Ariyan Rasid)” নামের ফেসবুক প্রোফাইলের পোস্ট।

শিশুকে আদার রস, মধু, তুলসি পাতার রস খাওয়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয় একই পোস্টে। পোস্টে লেখা হয়, “…সতর্কতা: যদি রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা অচেতন ভাব দেখা দেয়, একমাত্র তবেই ইমারজেন্সিতে নিকটতম হাসপাতালে যাবেন শুরুতেই গণহারে টিকা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন । কৃত্রিমভাবে মহামারী সৃষ্টির নাটক কয়দিন পর পর শুরু করে এরা”

ডিসমিসল্যাবের পাওয়া একই ক্যাপশন সম্বলিত পোস্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে “আরিয়ান রশিদ” নামের প্রোফাইল থেকে আপলোড হওয়া পোস্টটি। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি শেয়ার হয়েছে দুই শর বেশি বার। প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য জানানো হয়েছে যথাক্রমে ৪০০ ও ৭০ টির অধিক। পোস্টের মন্তব্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অনেকেই এই পোস্ট পড়ে নিজেদের বাচ্চাদের কোনো টিকা না দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।

একজন লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ… আমার বাবু মেহরাবকে আমি কখনো কোনো টিকা দিই নাই। আমার মন বলতো এগুলো ইহুদিদের চক্রান্ত। আলহামদুলিল্লাহ সুস্থ আছে। কয়েক মাস পর পর একটু জ্বর হয়, তখন নরমাল ট্রিটমেন্ট করাই আর ঘরোয়া পদ্ধতি অ্যাপ্লাই করি। আর বেবিকে কালোজিরা, মধু, আদা, লেবু এইসব খাবারে অভ্যস্ত করানোর চেষ্টায় আছি। বাবুর বয়স দেড় বছর।” আরেকজন লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ এই বিষয় গুলা জানার পড় আমার বাচ্চা কে টিকা দি নাই।আল্লাহ রহমতে আমার বাচ্চা অনেক সুস্থ আলহামদুলিল্লাহ। আমি ও অনেক কে বলি যে টিকা না নিতে কিন্তু কেও কথার গুরুত্ব দে না।”

আবার অনেকে পোস্টে থাকা তথ্যের বিপক্ষে মত দিয়েও মন্তব্য দিয়েছেন। একজন লিখেছেন, “এই যে সবজান্তা! ব্যাসিক RNA transformation একটু পড়ুন, কিভাবে জিনেটিক্যাল মডিফিকেশন হয়, এভোলুশন হয় ধারনা রাখেন। আপনাদের জন্য পেন্টাভলেন্ট টিকা দেয় না, এতে করে পলিও, হাম এর মতো অসুখ ছড়াচ্ছে। করোনা এর সাথে সব এক কাতারে ফেলে দিয়ে অন্ধ ভক্ত হওয়া যাবে না।”

আরেকজন লিখেছেন, “সব মিথ্যা পোস্ট করে মানুষকে ভুল বুঝাচ্ছেন কেন??হামের টিকা সবার দিতে হবে।।ভ্যাকসিন কিভাবে কাজ করে কি সেসব না জানলে আমারে ইনবক্স করেন।”

হাম টিকা নিয়ে গুজব: হামের টিকার বদলে থুতু মালিশের পরামর্শ, ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও
টিকা বিরোধী ফেসবুক পোস্টের পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য।

এছাড়াও আরবিতে লেখা “আব্দুল্লাহ ঈসা আতিক (عبد الله عيسى عتيق)” নামের একটি প্রোফাইল থেকেও একই দিনে হুবহু একই পোস্ট ছড়াতে দেখা যায়, যা দেড় শর অধিক শেয়ার হয়েছে। প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ৩০ মার্চ থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে ফেসবুকে হুবহু একই ধরনের ৪৪ টি পোস্ট খুঁজে পাওয়া গেছে। 

“আরিয়ান রশিদ” নামের প্রোফাইল থেকে করা টিকা বিরোধী আরও একাধিক পোস্ট পাওয়া যায় (, )। এর মধ্যে একটি পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে বেশ ছড়াতে দেখা যায়। গত ৩১ মার্চ প্রোফাইলটি থেকে সাবেক শীর্ষ ধনকুবের বিল গেটসের দানবাকৃতির একটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে জানানো হয়, শিশুদের ক্ষতি করা, পুরুষত্ব নষ্ট করা এবং মানুষকে আজীবন দুর্বল ও রোগী বানিয়ে রাখাই টিকার মূল উদ্দেশ্য। ওই পোস্টে বলা হয়, করোনা টিকা নেওয়ার কারণেই মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি অসুস্থ থাকে। এছাড়াও বলা হয়, ভ্যাকসিনের মধ্যে মৃত শিশুদের ফুসফুসের উপাদান মেশানো থাকে এবং এটি বিল গেটস ও পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের তৈরি ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ বা দাজ্জালীয় চক্রান্ত।

পোস্টটিতে আরও দাবি করা হয়, রোগ হওয়ার আগেই প্রতিষেধক হিসেবে টিকা নেওয়া ‘শিরক’ এবং ঈমান পরিপন্থী কাজ। হাম ও পোলিওসহ শিশুদের সকল টিকাকে আমেরিকা ও ইহুদিদের ষড়যন্ত্র এবং ওষুধের ব্যবসা আখ্যা দিয়ে এর পরিবর্তে চিকিৎসা হিসেবে কেবল সুন্নতি খাদ্যাভ্যাস, গাছগাছালি এবং আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে সুস্থ থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

হাম টিকা নিয়ে গুজব: হামের টিকার বদলে থুতু মালিশের পরামর্শ, ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও
“আরিয়ান রশিদ” নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে করা টিকা বিরোধী পোস্ট।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি দেড় শর বেশি শেয়ার করা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে চার শর অধিক। মন্তব্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় অনেকেই পোস্টের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। একজন লিখেছেন, “সন্তানকে কোনো টিকাই দিব না ইনশাআল্লাহ যদি কখনো বাবা হতে পারি।অনেক আগে থেকেই জানি এসব বিষয়ে।” আরেকজন লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ আমার ২ বাচ্চাকে আমি টিকা দিতে দেয়নি।”

ফেসবুকে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে হুবহু একই ধরনের আরও ১৭ টি স্বতন্ত্র পোস্ট খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আগের পোস্টটি করা হয়েছিল “আরিয়ান রশিদ” নামের প্রোফাইল থেকে। 

আবার, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আকারেও কিছু টিকা বিরোধী পোস্ট ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। মুহিব্বুল্লাহ আদনান (Muhibbullah Adnan) নামের একটি পেজ থেকে গত ৩১ মার্চ একটি পোস্ট করে ক্যাপশনের শুরুতে লেখা হয়, “আমাদের সন্তানদের উপর টিকা ব্যবহার করা হয় না বরং ওষুধের পরীক্ষা করা হয়।” পোস্টটিতে টিকাকে বিষ হিসেবে উল্লেখ করে শিশুদের টিকা না দিতে উৎসাহিত করা হয়।

ফেসবুকে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে দেখা যায় এই পোস্টটিও গত ৩০ মার্চ থেকে ০১ এপ্রিল সময়সীমার মধ্যে ১৭ বার স্বতন্ত্রভাবে পোস্ট হয়েছে।

উল্লেখ্য, “আরিয়ান রশিদ” নামের প্রোফাইল থেকে ছড়ানো “শয়তানের এজেন্ডা” দাবিতে করা পোস্টটি মুহিব্বুল্লাহ আদনানকেও আপলোড হতে দেখা গেছে।

হাম টিকা নিয়ে গুজব: হামের টিকার বদলে থুতু মালিশের পরামর্শ, ছড়ানো হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও
মুহিব্বুল্লাহ আদনান নামের ফেসবুক পেজের পোস্ট।

হামের টিকা ও চিকিৎসার বিষয়ে যা বলছে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং বিপজ্জনক বায়ুবাহিত রোগ, যার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। রোগটির ভয়াবহতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) সতর্ক করে জানিয়েছে যে, হাম কেবল সাধারণ কোনো র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি নয়; বরং এর কারণে নিউমোনিয়া এবং এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, হামে আক্রান্ত প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে এক থেকে তিনজন শ্বাসতন্ত্র ও স্নায়বিক জটিলতায় মারা যায় এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ থেকে শিশুর খিঁচুনি, বধিরতা বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি থাকে। 

হামের চিকিৎসার বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, রোগীর লক্ষণ উপশম করা, পানিশূন্যতা রোধ করা এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়াই এর মূল চিকিৎসা। এছাড়া চোখের ক্ষতি, অন্ধত্ব ও মৃত্যুর ঝুঁকি এড়াতে সংস্থাটি সব বয়সী রোগীকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাই-ডোজ ‘ভিটামিন-এ’ এর দুটি ডোজ দেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে। অন্যদিকে, রোগীর জ্বর ও অস্বস্তি কমাতে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস) পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল পানের পাশাপাশি প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন সেবনের পরামর্শ দেয়। তবে রোগীর খিঁচুনি, তীব্র শ্বাসকষ্ট, ঘুম থেকে জাগতে না পারা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে অতি দ্রুত জরুরি হাসপাতালে নেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে সংস্থাটি। 

হাম প্রতিরোধে এই তিনটি সংস্থাই সর্বসম্মতভাবে দুই ডোজ এমএমআর বা হামের টিকার ওপর জোর দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই টিকার কারণে ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকার কারণে ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, যার বেশিরভাগই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের প্রচারণার প্রভাব

সামাজিক মাধ্যমে হামের টিকা বিরোধী এমন প্রচারণা অভিভাবক ও শিশুদের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে? এ বিষয়ে স্বাস্থ্য যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুন নবীর সঙ্গে কথা বলে ডিসমিসল্যাব।

তিনি বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের প্রচারণা অবশ্যই অভিভাবকদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যদিও সব শ্রেনিতে একইভাবে ফেলবে না। বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকা কর্মসূচি কিন্তু একটা সফলতার উদাহরণ ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোল মডেল হিসেবে ধরা হতো। তখন অধিকাংশ মানুষ বিটিভি বা বিভিন্ন ওয়ান ওয়ে কমিউনিকেশনের মাধ্যমে টিকা বা ভ্যাক্সিনের বিভিন্ন তথ্য পেত। তখন সামাজিক মাধ্যম ছিল না। তাই সহজেই মানুষের কাছে মিসইনফরমেশন পৌঁছানোর পথ কম ছিল। ফলে যখন এই মিসইনফরমেশনগুলো আসবে, তখন অভিভাবকদের মনে সন্দেহ তৈরি করবে। অনেকেই তখন এটা ঝুঁকি মনে করে এড়িয়ে যেতে চাইবে।”

মাহমুদুন নবী আরও জানান, “নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য আয়ুর্বেদী চিকিৎসা সহজলভ্য। যদিও এই টিকাগুলোও ফ্রি। কিন্তু এগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী একটা জায়গায় যেতে হয়। অনেকেই ব্যস্ততার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে শিশুকে টিকা দিতে পারে না। এমন অবস্থায় আবার এ ধরনের প্রচারণা অভিভাবকদের আরও নিরুৎসাহিত করতে পারে। তাই মোটা দাগে বললে, সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের প্রচারণার বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তাই এগুলোর বিপরীতে আবার ক্যাম্পেইন হওয়া উচিৎ। যার মাধ্যমে মানুষের মাঝে হেলথ লিটারেসি বাড়ানো যেতে পারে।”

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “আয়ুর্বেদী ওষুধ বহু আগে থেকেই আছে। টিকা শুধু কি আমরাই ব্যবহার করি? আপনি একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন… ১০০-এর উপরে দেশ হামের টিকা ব্যবহার করছে হাম প্রতিরোধের জন্য।” তিনি বলেন, “সামাজিক মাধ্যমের যুগে টিকার বিপক্ষেও অপপ্রচার আছে, এর পক্ষে শক্তিশালী বক্তব্যও আছে। এখন বিবেচনায় বুঝতে হবে আমরা কোন তথ্যটা নিবো।” 

তিনি আরও বলেন, “অবশ্যই এখানে আমাদের কর্তব্য আছে। আমরা এজন্য প্রতিবারই মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, পেপার পত্রিকা, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সব জায়গাতেই আমরা এটার পক্ষে ইতিবাচক প্রচারণা চালাই এবং ইনশাআল্লাহ সামনের বারও সফলতা অর্জন করবো এবং ক্যাম্পেইন করতে পারব।”

শাহরিয়ার সাজ্জাদ মনে করেন মানুষ টিকা নেওয়ার জন্য অনেক বেশি আগ্রহী। সবাই বাঁচতে চায়। ভ্যাকসিন বিরোধী অপপ্রচার চললেও মানুষ সুস্থ থাকতে টিকা নিবেন বলেও তিনি আশার কথা জানান।

আরো কিছু লেখা