
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। তাই, ভোটের আগের মাসগুলোতে একটি বড় উদ্বেগ ছিল, গত নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার অপতথ্যের প্রভাব অনেক বেশি থাকবে, যা জনমত গঠন এবং ভোটারদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার দিন অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ভোটগ্রহণের এক সপ্তাহ পর, ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৯টি ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান এই সময়ে রাজনীতি-বিষয়ক ১,১৮৫টি স্বতন্ত্র বা ইউনিক ভুল তথ্য শনাক্ত ও খণ্ডন করেছে। এসব ভুল তথ্যের প্রায় অর্ধেকই ছিল সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক। এর মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশ কনটেন্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে তৈরি কিংবা সম্পাদনা করা হয়েছিল।
বিশ্লেষণের জন্য ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যগুলোকে নির্বাচনের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে: প্রাক-নির্বাচন, মনোনয়ন, নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটের আগের ৪৮ ঘণ্টার প্রচারণা বন্ধের সময়, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ধাপগুলো অনুসরণ করেই এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে— যেখানে প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সময়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ভোটারদের আগ্রহের তুঙ্গে থাকা সময় এবং পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অপতথ্যের ধরন বা প্রবণতাগুলো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।
ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অপতথ্যের বড় অংশই (মোট ৪১ শতাংশ) ছড়িয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময়। তবে অপতথ্যের জোয়ার দেখা গেছে আইনগতভাবে প্রচার বন্ধ থাকার সময়। ভোট গ্রহণের ঠিক আগের ৪৮ ঘণ্টায় নির্বাচন বাতিল, ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা দেওয়া এবং প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ভুয়া খবর ছড়ানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। দেখা গেছে, প্রতি পাঁচটি ভুল বা বিভ্রান্তিকর দাবির মধ্যে প্রায় একটি শুধু এই শেষ দুই দিনেই শনাক্ত করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, নির্বাচনী সময়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়ে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা কতটা তীব্র হয়ে উঠেছিল।
এই বিশ্লেষণে নির্বাচন-সংক্রান্ত ৫২৮টি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ফলাফল পর্যন্ত অপতথ্যের ধরনে কীভাবে পরিবর্তন এসেছে। প্রথমদিকের সপ্তাহগুলোতে, ভুল তথ্য মূলত ‘নির্বাচন আদৌ হবে কি না’—এই বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। তখন ভোট স্থগিত, বাতিল বা শর্তসাপেক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মতো নানা দাবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রচারণা যত এগিয়েছে, ভুয়া জনমত জরিপ এবং প্রার্থীদের বিকৃত বক্তব্য ব্যবহারের মাধ্যমে কারা এগিয়ে আছে, তা নিয়ে জনমনে ধারণা তৈরির চেষ্টা চলেছে। ভোটের দিন অপতথ্যের মূল লক্ষ্য ছিল অনিয়মের অভিযোগ— যেমন, ভুয়া বুথফেরত জরিপ, ব্যালট ছিনতাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের খবর। নির্বাচনের পর অপতথ্যের ধরন বদলে গিয়ে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান এবং কারচুপির দিকে মোড় নেয়। ফলে বিতর্কটি ‘ভোট হবে কি না’ থেকে বদলে গিয়ে ‘ভোটের জয় বৈধ কি না’— সেদিকে মোড় নেয়।
অপতথ্যের ক্যাটাগরির মধ্যে রাজনৈতিক মিথ্যা তথ্যের আধিপত্য বরাবরই বেশি থাকে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের সময়ে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে এবং ভোটগ্রহণের সময় যত ঘনিয়ে এসেছে, এটি তত বেশি ঘনীভূত হয়েছে।
ডিসেম্বর এবং জানুয়ারির শুরুর দিকে সাধারণত প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টির মতো রাজনৈতিক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে ভোটদান প্রক্রিয়া বা প্রার্থিতা সংক্রান্ত ভুল তথ্য ছিল গড়ে মাত্র দুই থেকে তিনটি। তবে জানুয়ারির শেষ দিক থেকে এই ধারায় পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত, উভয় ধরনের ভুল তথ্যই সমান্তরালভাবে বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে নির্বাচনের একেবারে শেষ সময়ে এসে নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্যের প্রবাহ ভয়াবহ রূপ নেয়।
সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের জোয়ার দেখা গেছে ভোটের আগের ৪৮ ঘণ্টার ‘নীরব সময়ে’। মাত্র দুই দিনে নির্বাচন-সংক্রান্ত ৯৫টি মিথ্যা দাবি শনাক্ত করা হয়েছে— যা পুরো নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্যের প্রায় ১৮ শতাংশ। শুধুমাত্র ১১ ফেব্রুয়ারিতেই রাজনীতি ও নির্বাচন-সংক্রান্ত ৭০টিরও বেশি মিথ্যা তথ্য যাচাই করা হয়েছে, যা এই পুরো নির্বাচনী সময়ের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ। জানুয়ারির শুরুর দিকের তুলনায় এই সময়ে অপতথ্যের পরিমাণ প্রায় ছয় থেকে সাত গুণ বেড়েছে।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ৫২৮টি নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্যের সবচেয়ে বেশি (৪১ শতাংশ) ছড়ানো হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময়ে। তবে সময়ের ব্যাপ্তির সঙ্গে বিচার করলে দেখা যায়, অপতথ্যের সবচেয়ে বেশি আধিক্য ছিল আইনগতভাবে নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টার ‘নীরব সময়ে’।
মাত্র দুই দিনে ৯৫টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে— অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ৪৮টি। এর বিপরীতে, ১৯ দিনের প্রচারণাকালীন সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ থেকে ১২টি শনাক্ত হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক চাপের প্রতিফলন। মনোনয়ন পর্বে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচনের দিনে শনাক্ত হয় ২৬টি অপতথ্য। নির্বাচনের পরবর্তী এক সপ্তাহে এর পরিমাণ কমে এলেও তা অব্যাহত ছিল; এ সময় প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬টি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। প্রাক-নির্বাচন পর্বটি দীর্ঘতম হলেও সেখানে দৈনিক অপতথ্যের পরিমাণ ছিল পুরো সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম।
ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের ধরন ও এর গুরুত্বে পরিবর্তন হয়েছে। প্রাক-নির্বাচন এবং মনোনয়ন পর্বে তথ্য যাচাইকারীরা প্রতিদিন গড়ে ১৩টি রাজনৈতিক ও নির্বাচন-সংক্রান্ত ভুল তথ্য যাচাই করেছেন। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটিরও কম ঘটনা সরাসরি ভোটদান প্রক্রিয়া বা প্রার্থিতার সঙ্গে জড়িত ছিল। সেই সময়ে রাজনৈতিক অপতথ্যের আধিপত্য থাকলেও, তার বড় অংশই তখন পর্যন্ত নির্বাচনের কারিগরি বা পদ্ধতিগত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ছিল না।
ভোট গ্রহণের সময় যত ঘনিয়ে আসে, অপতথ্য ছড়ানোর এই ধারাতেও পরিবর্তন আসে। প্রচারণার সময়ে রাজনীতি ও নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্য প্রতিদিন গড়ে ২১টিতে গিয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে শুধু নির্বাচন-সংক্রান্ত ঘটনা ছিল দৈনিক ১১ থেকে ১২টি— যা মনোনয়ন পর্বের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ভোটের আগের প্রচারণা নিষিদ্ধের ৪৮ ঘণ্টায় দেখা যায়, তথ্য যাচাই করা রাজনৈতিক দাবিগুলোর ৮৮ শতাংশই ছিল সরাসরি নির্বাচন-সংক্রান্ত।
তথ্য যাচাইকারীরা এই নির্বাচনী সময়ে প্রতিদিন গড়ে দুইটির বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি অপতথ্য শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে একটি ঘটনা সরাসরি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যদিও সামগ্রিক বিচারে বা সংখ্যার দিক থেকে এআই দিয়ে বানানো কন্টেন্টগুলো খুব বেশিমাত্রায় ছিল না, তবে পুরো নির্বাচনী সময়জুড়ে এগুলোর উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অপতথ্যের প্রায় ১২ শতাংশ ছিল এআই-জেনারেটেড। এর মধ্যে প্রতি ১০টির মধ্যে প্রায় ৭টিই ছিল ভিডিও কনটেন্ট। প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল ছবি, যা মূলত সম্পাদনা করা বা কৃত্রিমভাবে তৈরি।
রাজনীতি ও নির্বাচন মিলিয়ে মোট ১৫০টি এআই-জেনারেটেড অপতথ্যের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩১ শতাংশ) ঘটেছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময়, যা অন্য যেকোনো পর্যায়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। তবে, এই প্রবণতা কেবল প্রচারণার সময়কালেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এআই-সংশ্লিষ্ট অপতথ্যের ৪৪ শতাংশেরও বেশি ছড়িয়েছে প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ প্রাক-নির্বাচন পর্বে এবং ২১ শতাংশ মনোনয়ন পর্বে শনাক্ত করা হয়েছে।
যদিও প্রচারণা বন্ধের ৪৮ ঘণ্টায় অপতথ্যের জোয়ার সবচেয়ে বেশি ছিল, তবে সেই নির্দিষ্ট সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি মাত্র ১১টি ঘটনা যাচাই করা হয়েছে। কনটেন্টের ফরম্যাটের দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রচারণা বন্ধের এই সময়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যম ছিল টেক্সট বা লেখা-ভিত্তিক। এর মধ্যে দাবিগুলো ছিল, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে গুজব এবং ভোট বাতিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহার বা ভোটগ্রহণে বিঘ্ন ঘটার মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য। এআই দিয়ে বানানো বা সম্পাদনা করা কনটেন্টের তুলনায়, এই ধরনের টেক্সট-ভিত্তিক তথ্য তৈরি করা এবং দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সহজ।
কৌশলগত দিক থেকে অধিকাংশ অপতথ্য সংবাদমাধ্যমের নকল করে ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রাফিক কার্ডগুলোর বেশিরভাগ প্রচলিত মিডিয়ার লেআউট বা নকশা হুবহু নকল করেছে। ভিডিওগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা দেখে মনে হয় সেগুলো সরাসরি মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন বা সরকারি কোনো ঘোষণা। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কন্টেন্টগুলোকেও প্রায়ই সংবাদ বুলেটিন বা সিসিটিভি ফুটেজের আদলে সাজানো হয়েছে। শনাক্ত হওয়া অর্ধেকেরও বেশি ঘটনা (৫৪.৫%) ছিল এমন সব গ্রাফিক কার্ড, যা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের আউটপুটের মতো করে ডিজাইন করা হয়েছিল। এর ফলে ভুয়া দাবিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার আড়ালে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভিডিও ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহৃত মাধ্যম, যা মোট ভুল তথ্যের ৩০.৩ শতাংশ। এর মধ্যে ছিল এআই-জেনারেটেড ক্লিপ, পুরোনো ভিডিও ফুটেজের নতুন ব্যবহার এবং নিরাপত্তা মহড়ার ভিডিওকে নির্বাচনের চলমান কোনো ঘটনা হিসেবে ভুল ক্যাপশনে প্রচার করা। অন্যদিকে, ছবির মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর হার ছিল ৯.৩ শতাংশ এবং টেক্সট বা লেখা-ভিত্তিক পোস্টের হার ছিল মাত্র ২.১ শতাংশ। এটি দেখিয়ে দেয়, সাধারণ লিখিত দাবির তুলনায় ভিজ্যুয়ালি সাজানো কন্টেন্টগুলো ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে অনেক বেশি ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রাক-নির্বাচন পর্ব: প্রাক-নির্বাচন পর্যায়টি পদ্ধতিগত গুজবের চেয়ে বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হয়েছিল। এই সময়ের অপতথ্য মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবমূর্তি, নেতৃত্বের নির্ভরযোগ্যতা এবং নির্বাচন স্থগিত বা বাতিলের সম্ভাবনা নিয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল।
যেমন, ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর একটি এআই দিয়ে বানানো ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দাবি করা হয়, সেটি শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো তফসিল বাতিলের দাবিতে মশাল মিছিল করছে।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডকে নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়েও নানা ধরনের ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড বিকৃত করে এমনও দাবি প্রচার করা হয় যে, ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার না হওয়া পর্যন্ত জামায়াতের আমীর জাতীয় নির্বাচন চান না।

মিথ্যা জরিপও ছড়াতে দেখা যায় এই সময়ে। কোথাও দাবি করা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জয়ী হতে যাচ্ছে, অথবা আওয়ামী লীগকে ছাড়া ৬৫ শতাংশ মানুষ ভোট দেবে না। প্রার্থিতা নিয়ে অপতথ্য ছড়ানো এই সময়ে নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়; বিশেষ করে পুরোনো ভিডিও নতুন করে প্রচার করে দাবি করা হয়, পরবর্তী নির্বাচনের জন্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করছে অথবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন।
এই পর্যায়ে ভুয়া বক্তব্যের বেশ কিছু ঘটনাও সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ঘোষণা করেছেন, দলটি ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানের আইন ব্যবস্থা চালু করবে এবং পাকিস্তান যাতায়াত ফ্রি করে দেবে। পরে দাবিটি মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়।
মনোনয়ন পর্ব: মনোনয়ন পর্ব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের ধরন দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষার লড়াই থেকে সরে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়ার দিকে মোড় নেয়। এই সময়ে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়– কে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, কার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে এবং আদৌ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না। সামাজিক মাধ্যমে এমন সব পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া বিএনপি নির্বাচন বর্জন করবে। পাশাপাশি শীর্ষ নেতাদের মনোনয়ন বাতিলের বিষয়েও ভুয়া খবর প্রচার করা হয়। যেমন, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) মনোনয়ন বাতিল করা হওয়ার ভুয়া দাবি প্রচার করা হয়।

দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন সংক্রান্ত হিসেব নিকেশ ছিল এই পর্যায়ের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিভিন্ন দাবিতে বলা হয়েছিল, জামায়াত বিএনপির কাছে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন দাবি করেছে, কিছু প্রার্থী দল পরিবর্তন করেছে অথবা নির্দিষ্ট কিছু জোট ভেঙে যাচ্ছে। অপতথ্যের ভাষ্য আরও বিস্তৃত হয়ে গণভোট এবং ব্যালট প্রতীকের সঙ্গে ধর্মীয় সংযোগ স্থাপনের দিকে মোড় নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দাবি করা হয়, একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিলে পরকালে জান্নাত পাওয়া যাবে, অথবা যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয় তবে সংবিধান পরিবর্তন হয়ে যাবে।
এই পর্যায়ে এআই-জেনারেটেড ভিডিও এবং ছবির ব্যবহার অনেক নিয়মিত হয়ে ওঠে; যার মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং দলীয় সমর্থনের বিষয়ে তৈরি করা ক্লিপগুলো ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি এআই-নির্মিত ভুয়া ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়, তিনি নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনার, সেনাপ্রধান এবং বিদেশি কূটনীতিকদের মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামেও ভুয়া বিবৃতি প্রচার করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করা। এই দাবিগুলো মূলত নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি বিদেশি সমর্থন অথবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়েছে।
প্রচারণা পর্ব: আনুষ্ঠানিক প্রচারণার সময় অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা আরও বেড়ে যায় এবং তা সরাসরি নির্বাচন পরিচালনা ও ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। প্রার্থীদের নামে অতিরঞ্জিত বা বানোয়াট প্রতিশ্রুতি প্রচার করা হয়; যার মধ্যে দাবি করা হয় যে, তারেক রহমান নির্বাচিত হলে মেট্রোরেল বন্ধ করে দেবেন এবং ‘ডিজিটাল লোকাল বাস’ চালু করবেন, অথবা প্রচারণার সময় বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডেটা প্যাকেজ বিতরণ করা হবে। অন্যান্য পোস্টগুলোতে ভোট প্রদানের বিষয়টির সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করে ছড়ানো হয়। কোথাও দাবি করা হয়, একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিলে জান্নাত নিশ্চিত হবে অথবা কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন না করলে ইসলামের সাংবিধানিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়বে।
সম্পাদনা করা ছবি নির্বাচনী প্রচারণার বলে ছড়ানোর একাধিক নজির এই সময়ে লক্ষ্য করা গেছে। জামায়াত বা বিএনপির কর্মসূচিতে মানুষের উপস্থিতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেখাতে এআই-জেনারেটেড জনসভার ছবি এবং ভিডিও (১, ২, ৩, ৪) ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি, ২০২৩ সাল বা তারও আগের পুরোনো আন্দোলনের ফুটেজ ব্যবহার করে সেগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এআই ভিডিওর মাধ্যমে সেনাবাহিনী বা পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে নির্বাচন ও সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে ভুয়া বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বা ভারতীয় কর্মকর্তারা নির্বাচনে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ নিয়েছেন। ভুয়া জরিপের মাধ্যমে কোনো একটি জোট ২৪০ থেকে ২৫০টি আসনে বিশাল জয় পাবে অথবা প্রবাসী ভোটে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে- এমন তথ্যও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রবাসীদের ভোট বা পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বেশকিছু অপতথ্য লক্ষ্য করা গেছে। কোথাও দাবি করা হয়, প্রবাসীদের বিপুল ভোট জামায়াতের পক্ষে গেছে, অথবা ভোট গণনার আগেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গেছে। এমনকি ভোট বাতিল হওয়ার মতো ভুয়া খবরও প্রচার করা হয়েছে— যাতে ভোট দেওয়ার আগেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ফলাফলের বিষয়ে একটি বিশেষ ধারণা তৈরি করে দেওয়া যায়।
এই সময়ের আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনা ছিল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতা এবং ঢাকা-১১ আসনের সংসদীয় প্রার্থী মো. নাহিদ ইসলামকে নিয়ে। বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর বলা হয়, নাহিদ ইসলাম ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল ক্যারিবীয় দেশ ডমিনিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন- এ অভিযোগে হাইকোর্টে তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যা্ রিট আবেদনের সঙ্গে যুক্ত পাসপোর্টের কপিটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং এর আগেই তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে সেই পাসপোর্টটি জাল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
ভোটের তারিখ যত ঘনিয়ে আসে, ধর্মীয় ও জাতিগত বিষয়গুলোকে জড়িয়ে অপতথ্য আরও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন পোস্টে ভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে সহিংসতা, নৈতিক অবক্ষয় বা সংবিধান পরিবর্তনের আশঙ্কার কথা বলা হয়। যেমন, সংবাদমাধ্যমের একটি জাল ফটোকার্ডে জামায়াত আমীরের বক্তব্য দাবিতে বলা হয়, হিন্দুদের অবশ্যই দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে হবে, অন্যথায় তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অন্য একটি ভুয়া গ্রাফিক কার্ডে দাবি করা হয়, ছাত্রদলের এক নেতা হিন্দুদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়েছে, বিএনপিকে ভোট না দিলে তাদের ঘরের ভেতর ঢুকে মেরে ফেলা হবে।
প্রচারণা বন্ধের সময়: ভোটের আগের এই দুই দিনে নির্বাচন-সম্পর্কিত অপতথ্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। আগের পর্বের তুলনায় এই সময়ের ভাষ্যগুলো মূলত তাৎক্ষণিক বিশৃঙ্খলা এবং ভীতি ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শিরোনামগুলোতে এমন সব ঘটনা বারবার এসেছিল যার কোনো ভিত্তি ছিল না: যেমন দলীয় সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, টাকা বা অস্ত্রসহ প্রার্থী গ্রেপ্তার, ব্যালট পেপার উদ্ধার, ভোটকেন্দ্রে হামলা অথবা যৌথ বাহিনীর হস্তক্ষেপ। অনেক ক্ষেত্রেই পুরোনো ফুটেজ; যেমন, যৌথ বাহিনীর মহড়া, বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা, আগের কোনো বিক্ষোভ বা ভোটকেন্দ্রের বিশৃঙ্খলা— পুনরায় ব্যবহার করে সেগুলোকে বর্তমানের নির্বাচনী সহিংসতা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রচারের ধরনটি ছিল আক্রমণাত্মক এবং তাৎক্ষণিক; চেষ্টা ছিল ঠিক এই মুহূর্তে কোথাও বড় কোনো ঘটনা ঘটছে এবং তা সরাসরি ভোটের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা বোঝানো।

আইন প্রয়োগ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে কেন্দ্র করে অপতথ্য ছড়ানোর আরেকটি প্রবণতা দেখা গেছে। দাবি করা হয়, দলীয় কর্মীদের বাড়ি থেকে ব্যালট পেপার জব্দ করা হয়েছে, ভোটপ্রদান শুরুর আগেই অগ্রিম ভোট দেওয়া হয়ে গেছে অথবা ভোটগ্রহণের আগেই প্রবাসী ব্যালটের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টগুলোতে প্রার্থীদের আটক, অস্ত্র উদ্ধার কিংবা ভোটকেন্দ্রে নানা অনিয়মের ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে বিতর্ক নয়, বরং সরাসরি প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা তাৎক্ষণিক কারচুপির ইঙ্গিত দিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।
খণ্ডিত এবং অতীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বক্তব্যকে বর্তমানের বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও এই সময়ে দৃশ্যমান ছিল। বহু পুরোনো নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা, এডিট করা বক্তব্যের ক্লিপ এবং ভুল ক্যাপশন দেওয়া ভিডিওগুলোকে বর্তমানের বলে প্রচার করা হয়েছিল। বিভিন্ন ভুয়া তথ্যে দাবি করা হয়, প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, রাজনৈতিক জোট ভেঙে গেছে অথবা দলের শীর্ষ নেতারা একদম শেষ মুহূর্তে তাদের আগের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছেন।
নির্বাচনের দিন: ভোটের দিনের অপতথ্য মূলত ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, বিভিন্ন আসনের বুথফেরত ভুয়া জরিপের ফলাফল এবং শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের মিথ্যা ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়েছিল। এই প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় ও সন্দেহ তৈরি করা।
নির্বাচনী নিরাপত্তার মহড়ার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, ভোটকেন্দ্র দখল করা হচ্ছে বা ব্যালট বাক্স ছিনতাই হচ্ছে। যেমন, ফেসবুকে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে মিথ্যা দাবিতে বলা হয়, রাজশাহীর একটি ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় একজনকে সেনাবাহিনী আটক করেছে। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, ভিডিওটি মূলত নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত যৌথ বাহিনীর একটি মহড়ার পুরোনো ফুটেজ। আবার, ২০২৪ সালের নির্বাচনের ব্যালট পেপারে সিল মারার একটি ভিডিও পুনরায় প্রচার করে দাবি করা হয়, বর্তমানের নির্বাচনে ঘটা কোনো অনিয়মের দৃশ্য এটি।

অন্তত দুজন প্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের মিথ্যা ঘোষণা প্রচার করতে এআই-জেনারেটেড বা কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান খান আঙ্গুর এবং খাগড়াছড়ির স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ানের নামে ছড়ানো ভিডিওগুলোতে দাবি করা হয়েছিল, তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থন করার আহ্বান জানাচ্ছেন ভোটারদের কাছে।
সামাজিক মাধ্যমে বহুবার শেয়ার হওয়া আরেকটি দাবিতে বলা হয়, নির্বাচনী সহিংসতায় এক প্রার্থীর ভাই নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয় যে, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী এবং এনসিপি নেতা আব্দুল হান্নান মাসউদের ভাই বিএনপি সমর্থকদের হামলায় মারা গেছেন। পরবর্তীতে এই দাবিটি মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে তৈরি বেশ কিছু ভুয়া ফটোকার্ডে বিভিন্ন সংসদীয় আসনের বুথফেরত জরিপের ফলাফল দাবি করা হয়েছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই ফলাফলগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে এগিয়ে এবং বিএনপি প্রার্থীকে পিছিয়ে থাকতে দেখা যায়। যেমন, একটি ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছিল, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের বুথফেরত জরিপে বিএনপি ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াত ৬১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্য একটি ভুয়া কার্ডে দাবি করা হয়, দিনাজপুর-১ আসনে বিএনপি ৩৪ শতাংশ এবং জামায়াত ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী পর্ব: নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অপতথ্য ছড়ানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচনের ফলাফলের নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া এবং এর গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এই পর্যায়ে এসে অপতথ্যের ভাষ্যগুলো প্রধানত ভোটের বৈধতা, কারচুপির অভিযোগ এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। অপতথ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু তখন ‘প্রার্থিতা’ থেকে সরে গিয়ে নির্বাচনের ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ প্রমাণের লড়াইয়ে রূপ নেয়।
যেমন, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা বেশ কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, কারচুপি বা ষড়যন্ত্র না হলে জামায়াত-জোটের প্রার্থীরা আরও অনেক বেশি আসনে জয়লাভ করতেন। একটি পোস্টে উল্লেখ করা হয়: “…জামাত ৫০০০ এর কম ভোটে হেরেছে এমন আসনের সংখ্যা ৫৩ টি। মূলত এই ৫৩ টি আসনে কারচুপি করে হারানো হয়েছে জামাতকে। জামাত প্রকৃত পক্ষে ১৩৫ টি আসনে জিতেছে। কিন্তু ডিপ স্টেট সংখ্যা কমিয়ে ৭০-৮০ টি দিতে চাচ্ছে।”

পরে, ডিসমিসল্যাবের পরিসংখ্যান-ভিত্তিক এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে মোট ২২টি আসনে, ৫৩টিতে নয়। আবার, ২২টি আসনের ফল জোটভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ১১টি আসনে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ৯টিতে। অর্থাৎ, ৫ হাজারের কম ব্যবধানে মীমাংসিত আসনগুলোর অর্ধেকেই জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। আবার, বিভিন্ন পোস্টে ভিন্ন দাবিতে বলা হয়, সারা দেশে ১৫০টি আসনে পুনর্গণনা চলছে, অথবা সরকারি বার্তা শিটে এমন প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা দেখানো হয়েছে যারা নাকি কম ভোট পেয়েছেন। তবে উভয় দাবিই ছিল মিথ্যা।
সহিংসতা-সংক্রান্ত দাবিও বেড়ে যায় এই সময়ে। নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ভিডিও পুনরায় ছড়িয়ে দিয়ে, তা নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক হামলার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে, মন খুলে ভোট দেওয়ায় নাগরিকদের ওপর সরকার গঠনকারী দল হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। আবার অন্য কিছু ভাষ্যে দাবি করা হয়, জামায়াতের পরাজয়ের পর ইসলামপন্থীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়েছে।

ফেসবুকে নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি বলে কখনো জাতিসংঘ বা কখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মন্তব্য করেছে, দাবিতেও ভুয়া তথ্য ছড়াতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে দুটি দাবিই ভুয়া বলে জানা যায় যাচাই প্রতিবেদনে। এমনকি মন্ত্রিসভা গঠনও ভুল তথ্যের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় (১, ২); বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভিত্তিহীনভাবে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টনের খবর ছড়ানো হয়।
এই বিশ্লেষণটি বাংলাদেশকেন্দ্রিক নয়টি যাচাইকরণ সংস্থার প্রকাশিত ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– রিউমর স্ক্যানার, বুমবিডি, নিউজচেকার, ফ্যাক্ট ক্রেসেন্ডো, ফ্যাক্ট ওয়াচ, এএফপি বাংলাদেশ, আজকের পত্রিকা, ডিসমিসল্যাব ও দ্য ডিসেন্ট।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই সংস্থাগুলো অন্তত ১,১৮৫টি রাজনৈতিক অপতথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৫২৮টি ঘটনা ছিল সরাসরি নির্বাচন-সংক্রান্ত, যা এই প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি।
কোনো দাবি সরাসরি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উল্লেখ করলে এবং মনোনয়ন, প্রার্থীর যোগ্যতা, আসন সমঝোতা, প্রচার কার্যক্রম, ভোটদান প্রক্রিয়া, পোস্টাল ব্যালট, বুথফেরত জরিপ, ফলাফল ঘোষণা এবং নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত থাকলে তাকে নির্বাচন-সম্পর্কিত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণের জন্য ঘটনাগুলোকে নির্বাচনী সময়রেখার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়েছে: প্রাক-নির্বাচন (১১–২৯ ডিসেম্বর), মনোনয়ন পর্ব (৩০ ডিসেম্বর–২১ জানুয়ারি), প্রচারণা (২২ জানুয়ারি–১০ ফেব্রুয়ারি), ৪৮ ঘণ্টার প্রচারণা বন্ধের সময় (১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭:৩০ – ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭:৩০), ভোটগ্রহণের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি), এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময় (১৩–২০ ফেব্রুয়ারি)।