
বিশ্ব গড় আইকিউতে জাপান ও বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে একাধিক গণমাধ্যমে। প্রতিবেদনগুলোতে জানানো হয়, “ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ”-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বুদ্ধিমান জাতির তালিকায় জাপান শীর্ষে ও বাংলাদেশ ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, “ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ”- এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী শীর্ষস্থান বর্তমানে চীনের। এবং ওই ওয়েবসাইটেই বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭।
সম্প্রতি আরটিভিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে। গত ১০ জানুয়ারি আরটিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনামে লেখা হয়, “বুদ্ধিমান জাতির তালিকায় শীর্ষে জাপান, বাংলাদেশের অবস্থান কত।” প্রতিবেদনের শুরুতেই লেখা হয়– “বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে আবারও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে জাপান। মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১০৬ দশমিক ৪৮ আইকিউ স্কোর নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান জাতির তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে সূর্যোদয়ের দেশটি।”
আরটিভির প্রতিবেদনের পরের অংশে লেখা হয়– “এদিকে বাংলাদেশিদের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ নিয়ে মাঝেমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে নানা রসিকতা চোখে পড়ে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে বিশ্বের বুদ্ধিমান জাতিগুলোর তালিকায় দেশটির অবস্থান আসলে ঠিক কোথায়? ব্রিটিশ মনোবিদ রিচার্ড লিনের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা এই তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশিদেরও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার প্রকৃত চিত্র। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে। ৭৪ দশমিক ৩৩ গড় আইকিউ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে ১৫০তম স্থানে রয়েছে।”
আরটিভির প্রতিবেদনটিতে আরও জানানো হয়, জাপানের পরেই ১০৬ দশমিক ৪৭ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় তাইওয়ান দ্বিতীয় ও ১০৫ দশমিক ৮৯ স্কোর নিয়ে সিঙ্গাপুর তৃতীয় স্থানে রয়েছে। আরটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে হংকং, চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়া।

এই প্রতিবেদন লেখার সময় দেখা যায় আরটিভির প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
তবে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে দেখা যায়, আরটিভি ছাড়াও দেশ রূপান্তর, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, দৈনিক ইনকিলাব, বাংলাদেশ টাইমস সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে (১, ২, ৩, ৪, ৫) একই ধরণের তথ্য জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
সবগুলো প্রতিবেদনেই তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় “ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ” নামের একটি ওয়েবসাইটকে।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ একটি অনলাইন তথ্যভান্ডার, যারা বিভিন্ন জনসংখ্যা বিষয়ক ডেটাকে সহজ গ্রাফ ও চার্টের মাধ্যমে তুলে ধরে। তারা জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামাজিক নানা বিষয়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি নিজস্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসও দিয়ে থাকে।
ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, তাদের সর্বশেষ প্রকাশিত গড় আইকিউ র্যাঙ্কিং- এ আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট ২০২৪ অনুযায়ী ১০৭ দশমিক ১৯ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন। এরপরেই ১০৭ দশমিক ১ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে তাইওয়ান। ১০৭ দশমিক ০৬ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে তাইওয়ান। চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে আছে যথাক্রমে ম্যাকাও (১০৬.৭৩), দক্ষিণ কোরিয়া (১০৬.৬৩) ও জাপান (১০৬.৪)।

“ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ”- এর আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট ২০২৪ এর তথ্য অনুযায়ী গড় আইকিউ র্যাঙ্কিং- এ বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭তম। ৯৬ দশমিক ৪৬ স্কোর নিয়ে ১৪৯টি দেশের মধ্যে এই অবস্থান বাংলাদেশের।
সংস্থাটিতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এই নতুন র্যাঙ্কিং করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট (আইআইটি)-এর ২০২৪ সালের তথ্যের উপর ভিত্তি করে। টেস্টে অংশ নেওয়া বিশ্বব্যাপী ১৩,৫২,৭৬৩ জন অংশগ্রহণকারীর ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ওই র্যাঙ্কিং করা হয়েছিল বলে জানায় ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ।
সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেওয়া তথ্যগুলো হুবহু মিলে যায় ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ে উল্লেখিত ২০১৯ সালের আইকিউ র্যাঙ্কিং- এর সাথে, যা মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড লিনের গবেষণার ভিত্তিতে করা হয়েছিল। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে মনোবিদ লিনের গবেষণার তথ্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ এ পরিচালিত এই গবেষণার তথ্য ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে। এই র্যাঙ্কিং- এ ১০৬ দশমিক ৪৮ আইকিউ স্কোর নিয়ে প্রথম স্থানে ছিল জাপান। আর ৭৪ দশমিক ৩৩ গড় আইকিউ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ছিল ১৫০তম স্থানে।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট (আইআইটি)-এর ২০২৪ সালের তথ্য ও মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড লিনের গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত ২০১৯ সালের তথ্য পাশাপাশি অবস্থান করছে।
তবে ২০২৬ সালে ওয়েবসাইটটিতে যে নতুন র্যাঙ্কিং হালনাগাদ (আপডেট) করা হয়েছে, তা ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট (আইআইটি)-এর তথ্য অনুসারে করা হয়েছে। এটাই ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ বিশ্ব গড় আইকিউ র্যাঙ্কিং। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ওয়েবসাইট পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রকাশিত নতুন র্যাঙ্কিং ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ৪১ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে হালনাগাদ করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গত ১০ ডিসেম্বর। অর্থাৎ, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০১৯ সালের র্যাঙ্কিং সেদিন আর “সাম্প্রতিক” ছিল না।
ওয়েবসাইটে নতুন র্যাঙ্কিং হালনাগাদ করলেও রিপোর্টের নিচে থাকা প্রশ্নোত্তর অংশ পরিবর্তন করেনি। ফলে “কোন দেশের গড় আইকিউ সবচেয়ে বেশি?” এই প্রশ্নের উত্তরে জাপানের নামই রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে সে উত্তরেও বলে দেওয়া হয়েছে, এই উত্তর ২০১৯ সালে রিচার্ড লিন ও ডেভিড বেকারের গবেষণা অনুযায়ী।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ ওয়েবসাইট তাদের সর্বশেষ র্যাঙ্কিং প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট এর প্রকাশিত ২০২৪ সালের ফলকে গ্রহণ করেছে। এবং তাদের ওয়েবসাইটে তা গত ৯ জানুয়ারিতে প্রকাশ করেছে। এই আইকিউ টেস্টে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৬৩ জন অংশ নিয়েছিলেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট গত ১ জানুয়ারি ২০২৫ সালে নেওয়া আইকিউ টেস্টগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নতুন র্যাঙ্কিং ছাপিয়েছে। ওয়েবসাইটটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১২ লাখ ১২ হাজার ৭১৪ জন নিজেদের আইকিউ পরীক্ষা করিয়েছেন।
নতুন র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, ১০৬.৯৭ স্কোর নিয়ে শীর্ষে এখন দক্ষিণ কোরিয়া। ১০৬.৪৮ আইকিউ স্কোর নিয়ে দুইয়ে এখন চীন। ১০৬.৩ স্কোর নিয়ে তিনে জাপান। উল্লেখ্য, ২০২৪-এ দুই থেকে চারে থাকা তাইওয়ান, হংকং ও ম্যাকাওকে ২০২৫ সালে চীনের অংশ ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইকিউ টেস্ট-এর ২০২৫ এর ফল অনুযায়ী বাংলাদেশের গড় আইকিউ এখন ৯৭.৩২। এবং ১৩৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৩।
অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমগুলোতে ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্ব গড় আইকিউ র্যাঙ্কিং নিয়ে প্রকাশিত তথ্যগুলো “সাম্প্রতিক” সময়ের নয় ,বরং পুরোনো। সংস্থাটির সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য অনুযায়ী র্যাঙ্কিং-এ প্রথমে আছে চীন, জাপান নয়। আর বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম নয় বরং ৭৭তম।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ‘দ্য জার্নালিস্টস রিসোর্স’-এ প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম বিশেষজ্ঞ টমাস প্যাটারসনের একটি নিবন্ধে ভুল তথ্য এড়াতে সাংবাদিকদের তিনটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রথমটি হল, ভুল ভারসাম্য পরিহার করা। প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে গিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের পাশাপাশি কম নির্ভরযোগ্য দাবিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা উচিত নয়। বরং কোনো দাবি অসত্য হলে প্রতিবেদনে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল সূত্রের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকা। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কোনো তথ্য যাচাই না করেই সংবাদে জায়গা দেওয়া ঠিক নয়। সাংবাদিকদের ‘গেটকিপার’ বা প্রহরী হিসেবে মিথ্যা দাবিগুলো শনাক্ত করে তা বাদ দিতে হবে। তৃতীয়ত, যাচাই ছাড়া দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রবণতা ত্যাগ করা। প্রতিযোগিতার দোহাই দিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো যাবে না। কোনো তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করার পরই কেবল তা প্রকাশ করা উচিত।