তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
This article is more than 2 months old
Fact-check: Indian media used a misleading video to falsely claim last video of Bangladeshi Hindu Dipu Chandra Das

ভুল ভিডিও দেখিয়ে দিপু হত্যাকাণ্ডে পুলিশকে জড়ানোর চেষ্টা সাত ভারতীয় গণমাধ্যমের

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড বিষয়ক প্রতিবেদনে একাধিক ভারতীয় গণমাধ্যম একটি ভিডিও প্রচার করছে। মৃত্যুর আগে শেষ মুহূর্তের দৃশ্য দাবি করে সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন দেখানো চেষ্টা করেছে, কীভাবে ১৮ ডিসেম্বর দিপু চন্দ্রকে মবের হাতে তুলে দিয়েছিল বাংলাদেশের পুলিশ। তবে এর আগেই একাধিক ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা দেখিয়েছে, ভিডিওটি আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের এক মাস আগের। ভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ভিন্ন ব্যক্তির আটকের এই দৃশ্য নিয়ে ফ্যাক্টচেক হওয়ার পরও সাতটি ভারতীয় গণমাধ্যম তাদের এক ডজন প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছে।

রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড তাদের প্রতিবেদনে ভুল তারিখ (১৮ ডিসেম্বর) দিয়ে ভিডিওটিকে দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সূত্রের উল্লেখ না করে কিংবা সত্যতা যাচাই ছাড়াই রিপাবলিক প্রতিবেদনে বলেছে “সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল”। একই কনটেন্ট তারা তাদের ফেসবুক পেজের ভিডিও প্রতিবেদনেও ব্যবহার করেছে। সে প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই এই ঘটনাটি যে ভিন্ন ব্যক্তির সে ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা রিউমর স্ক্যানার

নিউজ এইটিন বাংলা ঢাকার ১৭ নভেম্বরের এই ভিডিওকে ময়মনসিংহের দাবি করে বলছে, “দিপুকে বাঁচায়নি বাংলাদেশ পুলিশ”, “লাগাতার কান্না, প্রাণভিক্ষা দিপু দাসের”। সে প্রতিবেদনে সাংবাদিক সাহ্নিক ঘোষ প্রশ্ন করেছেন, এই হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ প্রশাসন কেন সমর্থন জানাচ্ছে?

পুলিশ দিপু দাসকে মবের হাতে তুলে দিয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের তরফে র‍্যাবের কর্তারা তারা জানিয়েছেন যে, এই ঘটনার সময় যেখানে এই দিপু চন্দ্র দাস কাজ করত সেখানকার ফ্লোর ইনচার্জ তাকে এই উন্মত্ত জনতার হাতে তুলে দেয়। কিন্তু যে ছবি সামনে আসছে সেখানে দেখা যাচ্ছে যে পুলিশ আধিকারিকরা রয়েছেন। সেখানে তাদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইছে এই যুবক। তারপরেও তাকে উন্মত্ত জনতার হাতে কার্যত তুলে দেওয়া হচ্ছে।”

ভিন্ন ঘটনার এই ভিডিও-এর ভিত্তিতে তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনা একেবারে সামনে থেকে সমর্থন জানাচ্ছে বাংলাদেশ প্রশাসন। 

ফ্যাক্টচেক হওয়া অপ্রাসঙ্গিক এই ভিডিও দেখিয়ে সংবাদমাধ্যমটির উপস্থাপিকা বলেন, “পুলিশের কাছেই আশ্রয় নিয়েছিল দিপু দাস। কিন্তু পুলিশ তার নিরাপত্তাটুকু দিতে পারেনি।” তিনি আরও যোগ করেন, “যেভাবে পুলিশের কাছে থাকার পরেও দিপু দাস প্রাণ ভিক্ষা কাতর আবেদন জানিয়েছে পুলিশকে, কিন্তু তারপরেও যে নির্মম পরিণতি হয়েছে তার; তাতে কিন্তু প্রশাসনিক যে দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতাই স্পষ্ট হয়ে সামনে আসছে।” 

নিউজ এইটিন বাংলা তাদের আরেকটি ভিডিও প্রতিবেদনেও একই তথ্য দেয়। অপ্রাসঙ্গিক সেই ভিডিও দিয়ে উপস্থাপিকাকে বলতে শোনা যায়, “দিপুকে দুষ্কৃতিদের হাতে তুলে দেয় বাংলাদেশ পুলিশ। বাংলাদেশের দিপু দাস খুনের আগের ভিডিও এবার নিউজরুম লাইভে। পুলিশের কাছে কান্না, প্রাণ ভিক্ষা দিপু দাসের। বাংলাদেশ পুলিশ দিপুকে দুষ্কৃতিদের হাতে ছেড়ে দেয়। আর তারপরেই দিপু দাসকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে খুনের ঘটনা ঘটে।”

ভারতীয় এই গণমাধ্যমটি তাদের ইউটিউব চ্যানেলে ৬ ঘণ্টা ৫ মিনিটের ভেতর অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও নিয়ে ৩টি প্রতিবেদন (, , ) প্রকাশ করে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ডিসমিসল্যাবও বিস্তারিত ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

সিএনএন-নিউজ এইটিন দিপু হত্যাকাণ্ডের “নতুন ভিডিও” হিসেবে ৭ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের একটি প্রতিবেদনে ভিডিওটি ব্যবহার করেছে। ক্রমানুসারে চারটি ভিডিও উপস্থাপন করে সেদিনের ঘটনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে যায় মধ্যে এই ভিডিও একটি। অপ্রাসঙ্গিক এই ভিডিও দেখিয়ে একের পর এক শিরোনাম স্ক্রল করে উপস্থাপিকাকে বলতে শোনা যায়, “বাংলাদেশি পুলিশের কাছে আকুতি জানিয়েছিল”, “পুলিশ দাসকে মৃত্যুর মুখে রেখে চলে গেছে”, “গণপিটুনির মুখে দাসকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল”, “পুলিশ তাকে জনতার হাতে তুলে দিয়েছে”।

ভিডিওটির সূত্র হিসেবে “ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে পোস্ট করা সর্বশেষ ফুটেজ” উল্লেখ করে উপস্থাপিকাকে আরও বলতে শোনা যায়, “নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তাদের কাছে আকুতি-মিনতি করা সত্ত্বেও পুলিশ দিপু চন্দ্র দাসকে ক্রুদ্ধ জনতার হাতে তুলে দিচ্ছে।” এই ভিডিও দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, “এখন আমরা পুরো ভিডিওটি দেখতে পাচ্ছি যেখানে সে পুলিশের কাছে শুধু প্রাণভিক্ষাই চাইছে না, বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করছিল। তা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে সেই মবের হাতেই তুলে দেয়।”

গণমাধ্যমটির সাংবাদিক পল্লবী ঘোষ তাতে যোগ করেন, “ঢাকায় পুলিশ স্টেশনে দিপু দাসের বসে থাকার দৃশ্য রয়েছে, যেখানে সে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করছে এবং নিরাপত্তা চাইছে। কিন্তু সে কোনো নিরাপত্তাই পায়নি। বিজেপির প্রকাশ করা ছবিগুলো দেখলে দেখা যায় যে, সে ফোনে কারও সাথে কথা বলছে। সে আসলে তার পরিবারের সাথেই কথা বলছিল।” অথচ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহের ভালুকায়, ঢাকায় নয়। অন্যদিকে যার ফোনে কথা বলার ভিডিওটি প্রতিবেদনে সেসময় প্রচার করা হচ্ছিল তিনি যে দিপু চন্দ্র দাস নন তা বাংলাদেশ (, ) ও ভারতের (, ) একাধিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণিত। 

সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজের প্রতিবেদনে এই ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার করে সংবাদ পাঠিকাকে বলতে শোনা যায়, “আইন-শৃঙ্খলার খোদ রক্ষকেরাই এই জঘন্য ও অনৈতিক কাজের হোতা হয়ে দাঁড়াল। দেখুন, বাংলাদেশ পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালনে কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারা মূলত দিপুকে ঐসব ইসলামি উগ্রবাদীদের হাতে তুলে দিয়েছিল।” বাংলাদেশ থেকে রিউমর স্ক্যানার বা ডিসমিসল্যাব ছাড়াও ফ্যাক্টওয়াচ, দ্য ডিসেন্ট তাদের ফেসবুক পেজে ইতিমধ্যে জানিয়ে দেয় এই ভিডিওর অপ্রাসঙ্গিকতা। অন্যদিকে ভারত থেকে অল্টনিউজ, ইন্ডিয়া টুডেবুম তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

উভয় দেশের একাধিক ফ্যাক্টচেকের পরও মৃত্যুর আগের শেষ ভিডিও দাবি করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আর প্লাস নিউজ। অপ্রাসঙ্গিক ভিডিওর ভিত্তিতে উপস্থাপিকা বলেন, “এই ভিডিওর হাত ধরে আবারও ফাঁস হলো মুহাম্মদ ইউনুসের নির্লজ্জ চক্রান্ত। যে ভিডিও প্রমাণ করে দিচ্ছে মুহাম্মদ ইউনুসের পুলিশই দিপুর এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। ইউনুসের পুলিশ চাইলেই দিপুকে বাঁচাতে পারত। কিন্তু তারা সেটা করেনি।”

তিনি আরও যোগ করেন, “মুহাম্মদ ইউনুসের পুলিশই বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু দিপু দাসকে বাঁচতে দিল না”, “ইউনুসের পুলিশ বাংলাদেশে একজন সংখ্যালঘু হিন্দুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে”। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “তাহলে কি পুলিশও এই জিহাদিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন?” যে ভিডিওর উপর ভিত্তি করে সাড়ে ১০ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের এই প্রতিবেদন প্রচার করেছে গণমাধ্যমটি, তার সত্যতাই যাচাই করা হয়নি বলে জানায় তারা। 

আজ তক বাংলা তাদের প্রতিবেদনে এই ভিডিও প্রচার করে লিখেছে, “দিপু চন্দ্র দাসকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ”। গণমাধ্যমটি তাতে উল্লেখ করেছে যে “ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি আজ তক বাংলা”। অথচ আজ তক বাংলাই আরও একদিন আগে এই ভিডিওটি যে দিপু চন্দ্র দাসের নয় তার ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। 

তাছাড়া দ্য ফ্রি প্রেস জার্নাল, টাইমস অব ইন্ডিয়া (, ) একই ভিডিও দিপু চন্দ্র দাসের ভিডিও হিসেবে তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রচার করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাতে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, “পুলিশ সদস্য ও তার ফ্লোর ম্যানেজার তাকে ওই উন্মত্ত জনতার হাতে তুলে দিয়ে থাকতে পারেন বলে অভিযোগ উঠেছে।” টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রচারিত ভিডিওটি ফ্যাক্টচেক হওয়ার আগে হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তা তাদের ওয়েবসাইট কিংবা ইউটিউব অ্যাকাউন্ট কোনোটি থেকেই সরানো হয়নি। 

শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক লেকচারার জোনাথন ফস্টার সাংবাদিকদের দায়িত্ব বোঝাতে বলেছিলেন, “কেউ বলল বৃষ্টি হচ্ছে আর কেউ বলল রোদ, এই দুইজনের কথা প্রচার করা আপনার কাজ না। আপনার কাজ হলো জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখা আসলে সত্য কোনটা।”এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর ক্ষেত্রে “সত্যতা যাচাই করা হয়নি” বা যাচাই করা সত্য তথ্যকে উপেক্ষা করে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামের এই পোশাকশ্রমিককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘবদ্ধভাবে মারধর করে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। যদিও মামলার তদন্তে অভিযুক্তদের একাংশের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে ধর্ম অবমাননার সত্যতা যাচাই করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আরো কিছু লেখা