নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
Fact-check: Fake Bangladesh government notice claiming two-day work-from-home policy and new office hours amid energy crisis circulated by Indian media, AI-generated image used

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে ভুয়া বিজ্ঞপ্তি ছড়াচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যম

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তির বরাতে বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে সরকারি দপ্তরে সপ্তাহে দুই দিন ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু হচ্ছে এবং দিনের আলোয় কাজ সারতে অফিসের সময় সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিজ্ঞপ্তির একটি ছবিও প্রচার করা হয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা গেছে, আলোচিত দাবিটি ভুয়া এবং প্রতিবেদনে ব্যবহার করা ছবিটিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বানানো। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ মানসুর হোসেন বিজ্ঞপ্তিটি ভুয়া বলে নিশ্চিত করেন ডিসমিসল্যাবকে। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম “দ্য ওয়াল” গত ১ এপ্রিল এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে; যার শিরোনাম— “বাংলাদেশে সরকারি দফতরে ২ দিন‌ ওয়ার্ক ফ্রম হোম, দিনের আলোয় কাজ সারতে অফিস সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টে।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের আগামী ৫ এপ্রিল থেকে সরকারি কর্মচারীরা সপ্তাহের দুদিন ওয়ার্ক ফর্ম হোম বা বাড়ি থেকে কাজ করবেন। ‌বাকি তিন দিন অফিস খোলা থাকবে। এই তিন দিন হলো রবি, সোম ও মঙ্গলবার।‌ বুধ ও বৃহস্পতিবার কর্মচারীরা কাজ করবেন বাড়ি থেকে। বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবার।” প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “বুধবার রাতে বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।”

Fact-check: Fake Bangladesh government notice claiming two-day work-from-home policy and new office hours amid energy crisis circulated by Indian media, AI-generated image used
এআই দিয়ে বানানো বিজ্ঞপ্তির বরাতে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

প্রচারিত প্রতিবেদনে একটি বিজ্ঞপ্তির ছবিও ব্যবহার করতে দেখা যায়। একই দাবিতে ছবিটি সামাজিক মাধ্যমেও (, ) ছড়িয়ে পড়ে।

Fact-check: Fake Bangladesh government notice claiming two-day work-from-home policy and new office hours amid energy crisis circulated by Indian media, AI-generated image used
একই ভুয়া দাবিতে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একাধিক পোস্টের স্ক্রিনশট।

ছড়িয়ে পড়া বিজ্ঞপ্তির শুরুতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রশাসন – ১ শাখা- এসব তথ্য দেখা যায়। এর পরে সেখানে একাধিক নির্দেশনা লেখা রয়েছে। একদম শেষে উপসচিব হিসেবে মোঃ আসাদুজ্জামান নামের একজনের স্বাক্ষর দেখা যায়। নামের নিচে ফোন নাম্বার হিসেবে “৯৫৪০XXX” লেখা। এর নিচে একটি মেইলের ঠিকানা লেখা। তার পাশে উপসচিবের সিল দেখা যায়। 

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে বিজ্ঞপ্তির ছবিটি পর্যালোচনা করে দেখে ডিসমিসল্যাব। বিজ্ঞপ্তিতে একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে। প্রথমত, সেখানে লেখা অক্ষরগুলো বেশ কিছু জায়গায় অসংলগ্ন হিসেবে দেখা যায়, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লেখার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আবার ৪ নম্বর সিদ্ধান্তে জরুরি পরিষেবা অংশের জরুরি বানানে “র” ও “ক” বর্ণের একটি মিশ্রন দেখা যায়। এ ধরনের মিশ্রন সাধারণত এআই দিয়ে লেখার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

এছাড়া, উপসচিবের সিল ও স্বাক্ষরের অংশে যে নীল রঙের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লেখা রয়েছে সেখানেও কিছু অক্ষরের অসংলগ্নতা দেখা যায়। আবার, উপসচিবের স্বাক্ষরের নিচে “০/১০/১৬” লেখা দেখা যায় যা কোনো অর্থবহ তারিখের উদাহরণ নয়। 

এ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ মানসুর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি জানান, ছড়িয়ে পড়া বিজ্ঞপ্তিটি ভুয়া এবং এ ধরনের কোনো বিজ্ঞপ্তি মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা হয়নি। ছড়িয়ে পড়া বিজ্ঞপ্তির কিছু অসংগতি উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, আসাদুজ্জামান নামের কোনো উপসচিব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রশাসন – ১ শাখায় নেই। আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গোলাকৃতির শাপলা প্রতীকের সিল ব্যবহার করে না। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও ডিসমিসল্যাবের সঙ্গে শেয়ার করেন তিনি।

ভারতীয় গণমাধ্যম ও ফেসবুকে ছড়ানো বিজ্ঞপ্তিটি ভুয়া উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়কল্পে সরকারি অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন ও সপ্তাহে ০৩ (দিন) দিন অফিস পরিচালনা প্রসঙ্গে গত ০১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ০৫.০০.০০০০.১১০.২২.০৪৫.২৬.১২০ নম্বর স্মারকে একটি স্মারক পত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হতে এ ধরণের কোনো পত্র জারি করা হয়নি। এ বিষয়ে কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানানো হলো।” 

এছাড়া, ডিসমিসল্যাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আগের প্রকাশিত একাধিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি (, , ) যাচাই করে দেখা যায়, বিজ্ঞপ্তির নিচে কর্মকর্তার সম্পূর্ণ ফোন নম্বর দেওয়া থাকে যেটা বর্তমানের ভুয়া দাবিতে ছড়ানো বিজ্ঞপ্তিতে নেই। আবার মন্ত্রণালয়টির বিজ্ঞপ্তির শুরুতে কোনো লোগোও দেখা যায় না। 

Fact-check: Fake Bangladesh government notice claiming two-day work-from-home policy and new office hours amid energy crisis circulated by Indian media, AI-generated image used
একাধিক টুলে যাচাইয়ের ফলাফল বলছে ছবিটির কিছু অংশ এআই দিয়ে তৈরি। এছাড়া, গুগলের বিশেষায়িত সিন্থআইডি টুলের ওয়াটারমার্ক বিশ্লেষণ (সূত্র-তৌসিফ আকবর, সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার, বুম বাংলাদেশ)।

বিজ্ঞপ্তির ছবিটি এআই দিয়ে বানানো কি না তা জানতে, গুগল জেমিনির এআই শনাক্তকরণ টুল সিন্থআইডির মাধ্যমে ছবিটি পরীক্ষা করা হয়। সিন্থআইডি জানায় এই ছবির কিছু অংশ গুগলের কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল ব্যবহার করে বানানো। সিন্থআইডি এই ফলাফলের ব্যাপারে “কনফিডেন্স লেভেল” বা নিশ্চয়তার মাত্রাকে “উচ্চ” বলেও নিশ্চিত করেছে। ফলাফলটি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝাতে টুলটি একটি “হিট ম্যাপ” বা ভিজ্যুয়াল গ্রিড দেখিয়েছে। যাচাইয়ের ফলাফলে স্ক্রিনশটের বামদিকের এবং ডানদিকের উপরে, নিচে কিছু অংশের ওপর নীল রঙের ছক বা আবরণ দেখা যাচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি। এছাড়া, এআই শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করেও দেখা গেছে, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রবল।

অর্থাৎ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিটি ভুয়া।

আরো কিছু লেখা