
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চতুর্দশ গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমান। ড. আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এই পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলো। এই রদবদল নিয়ে তৈরি হয়েছে বেশ চাঞ্চল্য।
এর মাঝেই দেখা যায় একাধিক গণমাধ্যম সদ্য নিয়োজিত গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ছবির পরিবর্তে ব্যবহার করছে অন্য একজনের ছবি। ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে উঠে এসেছে ১০টিরও বেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, যেখানে গভর্নরের ছবি নিয়ে চলছে বিভ্রান্তি।

২৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনকিলাব “‘চমক’ নাকি ‘ডিজাস্টার’?” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, “হঠাৎ করে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ঝানু অর্থনীতিবিদ এবং দলনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত ড. আহসান এইচ মনসুরকে বিদায় জানিয়ে নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ঝানু ব্যাংকারদের বদলে হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের মালিককে গভর্নর নিয়োগ দেয়া নিয়ে সর্বত্রই আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।”
তবে প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবিটি নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ছিল না।
নতুন গভর্নর নিয়োগের সংবাদ নিয়ে ফটোকার্ডে ভুল ছবিযুক্ত করে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পোস্ট করতে দেখা গেছে বাংলাদেশের সরকারি গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে। তাদের পোস্টকৃত ফটোকার্ডেও সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নরের ছবি না দিয়ে ভুল ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়। এসএটিভিও একই দিনে একই ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে পোস্ট করে নতুন গভর্নরের দাবিতে।

একাত্তর টিভির প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে লিখেছে, “বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে মোস্তাকুর রহমানকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।” “বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান” শিরোনামে ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনেও পাওয়া যায় একই ব্যক্তির ছবি।
একই শিরোনামে একই ব্যক্তির ছবি দিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে রেডিও টুডে লিখেছে, “বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।”ডেল্টা টাইমস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে একই ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে এবং ক্যাপশনে তাকে গভর্নর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
“মোস্তাকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর, প্রজ্ঞাপন জারি” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেবিডি টুডে। পুরোপুরি একই দাবি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮) সংবাদমাধ্যম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমান। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ অনুযায়ী মোস্তাকুর রহমানকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান করা হলো। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এছাড়া মোস্তাকুর রহমান বিজিএমইএ, আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এবং ঢাকা চেম্বারের সদস্য। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে তিনি কাজ করেছেন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। একাধিক গণমাধ্যমে তার মূল ছবি প্রকাশিত হতে দেখা যায় (১, ২, ৩)।
গণমাধ্যমগুলোতে ব্যবহৃত ছবির ব্যক্তিটি আসলে কে তা যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চ এবং সংশ্লিষ্ট কিওয়ার্ড সার্চ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। যাচাইয়ে ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে ২০২৪ সালের ৩০ মে প্রথম আলোর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেলেন মোস্তাকুর রহমান।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অতিরিক্ত পরিচালক মোস্তাকুর রহমানকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দিয়ে অফসাইট সুপারভিশন বিভাগে (বিভাগ-২) সংযুক্ত করেছে।” এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত মোস্তাকুর রহমানের ছবিটিকেই ব্যবহার করতে দেখা গেছে গণমাধ্যমগুলোকে বর্তমানে গভর্নরের ছবি হিসেবে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে পরিচালকদের তালিকাতেও মো. মোস্তাকুর রহমানের নাম দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মোস্তাকুর রহমানের পরিবর্তে গণমাধ্যমগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট পরিচালকের ছবি প্রকাশ করেছে।

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ এন্ড স্টাডিজের প্রকাশিত “স্পিড ভার্সেস অ্যাকুরেসি ইন ডিজিটাল জার্নালিজম” আর্টিকেলে বলা হয়, “তৎক্ষণাৎ সংবাদ পরিবেশন পাঠকদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করলেও, এটি একইসঙ্গে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, আস্থার সংকট তৈরি করে এবং নৈতিক দ্বিধাকে আরও ঘনীভূত করে।” এই ঝুঁকিগুলো এড়াতে এই গবেষণাটি যাচাইকরণ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, মিডিয়া লিটারেসি বা সংবাদ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংবাদের মানদণ্ডকে শুধু দ্রুততার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্ভুলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে সুপারিশ করে।