ম্যাসেজিং অ্যাপে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় সামাজিক মাধ্যমের বাইরে ফ্যাক্টচেকিং বাড়াতে হবে
This article is more than 2 months old

ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক

ম্যাসেজিং অ্যাপে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় সামাজিক মাধ্যমের বাইরে ফ্যাক্টচেকিং বাড়াতে হবে

ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে, আশা করা হচ্ছে যে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা মানুষকে ভুল তথ্যের হাত থেকে বাঁচাবে। 

ইন্দোনেশিয়ার গণমাধ্যম ও অ্যাক্টিভিস্টরা ভুল তথ্য মোকাবিলার জন্য এখনো ব্যাপকভাবে মনোযোগ দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্যাক্টচেকিং কর্মকাণ্ডের দিকে। 

এর কারণও সহজে বোঝা যায়। সামাজিক মাধ্যমগুলো এখনো মানুষের কাছে বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা জানার বড় উৎস। বলাবাহুল্য, ইন্দোনেশিয়ার বেশিরভাগ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী (৬৮ শতাংশ) নানা বিষয়ে তথ্য জানার জন্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতেই খোঁজ করেন।

তারপরও, আমরা যেন প্রায় ভুলতে বসেছি যে, আমাদের ব্যক্তিগত আলোচনা, কথোপকথনগুলোও ভুল তথ্য ছড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। 

ইন্দোনেশিয়ায় ভুল তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ান অ্যান্টি-স্ল্যান্ডার সোসাইটি (এমএএফআইএনডিও)-এর একটি প্রতিবেদনে বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপকে ভুল তথ্য ছড়ানোর একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার মাল্টিমিডিয়া নুসানতারা ইউনিভার্সিটি (ইউএমএন)-এর ডিজিটাল সাংবাদিকতা বিভাগে  আমাদের গবেষণা দলের সঙ্গে করা আমার সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে মানুষ খুব কমই ম্যাসেজিং অ্যাপগুলোর নাম উল্লেখ করে।

সম্ভবত ইন্দোনেশিয়ার গণমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকারদের হোয়াটসঅ্যাপ, লাইন ও টেলিগ্রামের মতো ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপগুলোতে ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমের বিস্তৃতি জোরদার করার সময় এসেছে।

ব্যক্তিগত ম্যাসেজিং অ্যাপে মিসইনফরমেশন

দ্য রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ জার্নালিজম-এর ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট- ২০২১ অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়াসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের মানুষ হোয়াটসঅ্যাপকে ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করে।

এর অর্থ আমাদের ইন্সট্যান্ট ম্যাসেজিং কার্যক্রম এসব গুজব ছড়ানো থেকে নিরাপদ নয়।

তবে, আমাদের গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ১,৫৯৬ জনের মধ্যে মাত্র ৩৭৯ জন হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও লাইনে ফ্যাক্ট-চেক করা কনটেন্ট খুঁজে থাকেন।

অধিকাংশ উত্তরদাতাই (১,৩৩৫ জন) সামাজিক মাধ্যমে ফ্যাক্ট-চেক করা কনটেন্ট খুঁজতে পছন্দ করেন। অন্যান্য যেসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে তারা পছন্দ করেন, সেগুলো হলো- নিউজ ওয়েবসাইট (৭৬৯), সার্চ ইঞ্জিন (৭৩১) এবং টেলিভিশন (৩৮৮)।

আমাদের যুক্তি অনুযায়ী, হোয়াটস অ্যাপ ও অন্যান্য মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ফ্যাক্টচেককে নিয়ে গেলে তা সামাজিক মাধ্যম কেন্দ্রিক বর্তমান কৌশলকে আরও পরিপূর্ণ করে তুলবে। 

ফ্যাক্ট-চেকিং কমিউনিটিগুলোর কী করা উচিত?

শুরুতে, সাংবাদিক বা সংবাদ মাধ্যমগুলো তাদের প্রকাশিত ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদনগুলোকে মেসেজিং সার্ভিসে বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপে নিয়ে আসতে পারে। 

মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশনগুলোর সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করলে সম্পৃক্ততা ও অডিয়েন্স বাড়বে। একইসঙ্গে বাড়বে ভুল তথ্য মোকাবেলায় ফ্যাক্টচেক আর্টিকেলের ছড়িয়ে পড়ার পরিধিও। 

গণমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকাররা অডিয়েন্সদের সম্পৃক্ত করতে চ্যাট ফিচারও ব্যবহার করতে পারে। এমএএফআইএনডিও ও ইন্দোনেশিয়ার মিডিয়া সংস্থা টেম্পো এই কাজ করেছে। উভয় সংস্থাই হোয়াটসঅ্যাপের সঙ্গে জোট বেঁধে ফ্যাক্টচেককে সেখানে সম্পৃক্ত করেছে চ্যাটবট প্রযুক্তি ব্যবহার করে। 

চ্যাটবটগুলো শুধুমাত্র ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কোনো বার্তা পেলে তবেই প্রতিক্রিয়া জানাবে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কেবল ফ্যাক্ট-চেক হওয়া আর্টিকেলগুলো পড়তে পারবে তা নয়, বরং সন্দেহজনক কোনো তথ্য তাদের নজরে এলে সেসব সম্পর্কেও জানাতে পারবে। 

টেম্পো ও এমএএফআইএনডিও-র এসব চ্যাটবট শুরুর উদ্যোগ হিসেবে খুবই ভালো। 

তবে দুটোই নিষ্ক্রিয় প্রযুক্তি, কারণ তারা শুধুমাত্র পাঠকদের কাছ থেকে ফ্যাক্ট-চেকিং বার্তা পেয়ে শুধুমাত্র সেসব ফ্যাক্ট-চেক করা আর্টকেলই পরবর্তীতে সব ব্যবহারকারীকে পাঠিয়ে থাকে। এছাড়া, যেসব ব্যবহারকারীর কাছে এই চ্যাটবট দুটোর নাম্বার আছে, তারাই শুধু এটি ব্যবহার করতে পারবে। 

আমি যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে আমার বিশ্বাস, এই পদ্ধতিকে আরও কার্যকরী করে তুলতে পারে দুটো কৌশল: পুশ নোটিফিকেশন এবং পার্সোনালাইজেশন বা ব্যক্তিভেদে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম।

পুশ বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবহারকারীদের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ডিজিটাল কনটেন্ট পাঠানো হয়। পার্সোনালাইজেশনের মাধ্যমে মূলত দর্শকদের পছন্দ-বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের কাছে সেই অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক কনটেন্ট বা নোটিফিকেশন পাঠানো হয়।

পার্সোনালাইজড পুশ নোটিফিকেশন

সংবাদ মাধ্যম ও ফ্যাক্ট-চেকিং কমিউনিটিগুলো জেন্ডার, পেশা বা লোকেশনের ওপর ভিত্তি করে তাদের দর্শকদের ডেটাবেজ ম্যাপ করা শুরু করতে পারে। 

কোন ধরনের ফ্যাক্ট-চেকগুলো মানুষ বেশি দেখছে তার সঙ্গে দর্শকদের বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ফলে, গণমাধ্যমগুলো ডেটাবেজ তৈরি করে বিভিন্ন অডিয়েন্সের আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয় নির্ধারণ করতে পারে। 

দর্শকদের শ্রেণিকরণ করার পর সংস্থাগুলো তাদের পছন্দ অনুযায়ী পুশ নোটিফিকেশন পাঠানো শুরু করতে পারে।

এর অর্থ সংবাদ মাধ্যমগুলো হোয়াটস্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আগ্রহী দর্শকদের কাছে নোটিফিকেশন পাঠাবে। এখানে ‘সংশ্লিষ্ট’ বলতে বোঝানো হচ্ছে নোটিফিকেশনের বিষয়গুলো মূলত দর্শকদের পছন্দ করা বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।

তবে, এটাও মাথায় রাখতে হবে যে পুশ নোটিফিকেশন পদ্ধতিতে কখনো কখনো ভুলত্রুটিও হতে পারে। যেমন, সংবাদ মাধ্যমগুলো ভুল সময়ে দর্শকের আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এমন নোটিফিকেশন পাঠাতে পারে। এরকম পরিকল্পনাহীন নোটিফিকেশন বহু দর্শকের মাঝেই বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে পারে। 

এ কারণে, পুশ নোটিফিকেশন ও পার্সোনালাইজেশন কৌশলগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। আমি একে বলি, ‘পার্সোনালাইজেশন-বেসড পুশ নোটিফিকেশনস’। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা শুধু তাদের আগ্রহের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কনটেন্টগুলোর নোটিফিকেশন পাবে।

সম্মতি নেওয়া ও প্রাইভেসি রক্ষা

তবে, দর্শকদের শ্রেণিকরণ করার পূর্বে গণমাধ্যমগুলোর উচিত হবে প্রথমে তাদের সম্মতি নেওয়া। তারা তাদের ডেটাগুলো দিতে আগ্রহী কি না, এ বিষয়ে তাদের জিজ্ঞেস করে নিতে হবে।

এছাড়া মিডিয়া হাউজগুলোকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, যেকোনো পার্সোনালাইজড ফ্যাক্টচেকিং ডেটাবেজে ব্যবহৃত দর্শকদের ব্যক্তিগত ডেটাগুলোর গোপনীয়তা যেন তারা পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষা করে।

গোপনীয়তা লঙ্ঘন এড়াতে সংবাদ মাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকারদের বিশ্বস্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সাবস্ক্রিপশন সিস্টেম চালু করায় বিনিয়োগ করতে হবে।

এই কৌশল বাস্তবায়নে মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দরকার। এটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভুলতথ্যের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব হবে।

ব্যবহারকারীরা যদি সরাসরি বিভিন্ন নিউজরুমের সঙ্গে চ্যাট করে কোনো তথ্য সত্য নাকি মিথ্যা, তা যাচাই করতে পারত, তাহলে ভালো হতো।

এটি নিজেদের পরিবার বা বন্ধুমহলে ব্যক্তিগত চ্যাটের সময় ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে ইন্দোনেশীয়দের বিরত রাখতে সাহায্য করতে পারত। একইসঙ্গে আসন্ন নির্বাচনের আগে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচারও নিশ্চিত করা যেত।


এফ.এক্স. লিলিক ডুুয়ি মারডিয়ানতোর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। বাংলায় অনুবাদ করেছেন তামারা ইয়াসমীন তমা।

আরো কিছু লেখা