ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক
সামাজিক মাধ্যম যেভাবে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, এমনকি সহিংসতা ছড়াতে ভূমিকা রাখে
This article is more than 9 months old

সামাজিক মাধ্যম যেভাবে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, এমনকি সহিংসতা ছড়াতে ভূমিকা রাখে

ডিসমিসল্যাব
অফিসিয়াল ডেস্ক

কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বক্তব্য কিংবা আরও সাধারণভাবে বললে বিভিন্ন ভুয়া তথ্যের হয়তো কোনো ভিত্তিই নেই। কিন্তু বাস্তব জগতে এগুলোর অনেক ক্ষতিকর পরিণতি আছে। এগুলো মিথ্যা ছড়াতে পারে, গণমাধ্যম ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমাতে পারে, এবং এমনকি সহিংসতা বা চরমপন্থী কার্যকলাপও উসকে দিতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্বে দাবি করা হয়েছে যে কোভিড-১৯ মহামারি একটি আজগুবি বিষয় বা পৃথিবীর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের গোপন চক্রান্ত। এ ধরনের বিশ্বাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করা হতে পারে। যেমন মাস্ক পরা বা টীকা নেওয়া। এবং এভাবে এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও এগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা জাতিসংঘের মতো বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও কর্তৃত্ব খর্ব করতে পারে, একইসঙ্গে জন্ম দিতে পারে অবিশ্বাস ও মেরুকরণ।

আরও চরম অবস্থায়, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তেও উদ্বুদ্ধ করতে পারে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘জালিয়াতি’-র মিথ্যা দাবি ছড়িয়ে পড়লে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনা ঘটে। আরেকটি উদাহরণ হলো ২০১৬ সালের পিজ্জাগেট ঘটনা। যেখানে এমন মিথ্যা বিশ্বাস ছড়িয়েছিল যে ওয়াশিংটন ডিসির একটি পিজ্জার দোকান কেন্দ্র করে শিশুদের যৌনকর্মের একটি চক্র পরিচালিত হয় এবং এর পেছনে উচ্চপদস্থ ডেমোক্র্যাটরা জড়িত আছেন। এমন বিশ্বাস থেকে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার এক ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে ওয়াশিংটন এসে রাইফেল হাতে দোকানে প্রবেশ করেন এবং কর্মচারী ও ক্রেতাদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। তিনি সেখানে সেই অপরাধের প্রমাণ খুঁজছিলেন, যা আসলে কখনোই ঘটেনি। 

এই দুটি উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, ভুয়া তথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কীভাবে স্রেফ নিছক একটি বিশ্বাস থেকে এক সময় ব্যক্তি, সামষ্টিক নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি, এমনকি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করা গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে গড়ে উঠে ও বিস্তৃত হয়। সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন ফোরাম এসব গ্রুপ গড়ে তুলতে এবং ক্রমাগত এই তথ্যগুলো ছড়ানোর মাধ্যমে তাদের বিশ্বাস আরও পাকাপোক্ত করে তুলতে সহায়তা করে। একইসঙ্গে এসব বিশ্বাস যে আরও অনেকেরই আছে– এমন একটি বোধও তৈরি করে। তাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী প্রমাণাদি উড়িয়ে দিয়ে এই গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই নিজেদের অবস্থানকে আরও পোক্ত করে তোলার চেষ্টা করে, যা তাদের উগ্রবাদের দিকেও টেনে নিতে পারে। অনেকে এই বিশ্বাসগুলোতে এতোটাই ডুবে যায় যে, এসব বিভ্রম থেকে বেরিয়ে আসাটা তাদের জন্য অকল্পনীয় হয়ে ওঠে। 

এই একাত্মতার কারণেই ভুয়া তথ্য বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মোকাবেলার সাধারণ কৌশলগুলো যেমন, ফ্যাক্ট-চেকিং, ডিবাঙ্কিং বা এসব তত্ত্বের বিকল্প মত উপস্থাপনের মতো বিষয়গুলো শুধু ব্যর্থই হয় না, সেগুলো বরং এই গোষ্ঠীগুলোকে আরও কট্টর করে তুলে।

কীভাবে এবং কেন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব গড়ে ওঠে

ঠিক কেন এবং কীভাবে সামাজিক মাধ্যমে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো টিকে থাকে– আমরা তা বোঝার চেষ্টা করেছি আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায়। 

আমরা দেখেছি যে, ইকো চেম্বার হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতি সম্মিলিত ধারণাকে আরও পাকাপোক্ত করতে সাহায্য করে। সামাজিক মাধ্যমের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোই এই ইকো চেম্বার তৈরি ও শক্তিশালী করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা এই ভুল তথ্য সম্বলিত কনটেন্টগুলো নিয়মিত ও সহজে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এসব তত্ত্বের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও গাঢ় করে তুলতে ভূমিকা রাখে। এই মানুষগুলো নিজেদের “বাস্তব জগতের গবেষক” হিসেবে কল্পনা করতে পারে, অথচ তারা ইন্টারনেটে শুধু সেসব তথ্যেরই খোঁজ করে, যেগুলো তাদের পূর্ব ধারণা ও বিশ্বাসকে সমর্থন করে।  

অনলাইন নেটওয়ার্কে মানুষ কপি/পেস্ট বা শেয়ারের মাধ্যমে সহজেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। এভাবে এই তথ্যগুলো দ্রুতই পৌঁছে যায় কোনো ফোরামের অনুসারী বা সদস্যদের কাছে। এবং সেগুলো আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে হ্যাশট্যাগ বা প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। আমাদের গবেষণা এই ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রসার লাভের পেছনে চারটি ধাপকে চিহ্নিত করেছে। 

১। পরিচয় নিশ্চিত করা: ব্যবহারকারীরা সক্রিয়ভাবে নিজেদের অবস্থান যাচাই ও নিশ্চিত করতে (বিভিন্ন ফোরাম, মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে) বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট দেখে ও আলোচনায় যুক্ত হয়।  

২। পরিচয় পাকাপোক্ত করা: ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দমতো কোনো তথ্য গ্রহণ করে আবার কোনো তথ্য এড়িয়ে যায়। পিজ্জাগেটের ঘটনায় ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা হাইতিতে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম থেকে ছবি সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে এমন সব ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি করেছিল, যেগুলো তথাকথিত যৌন পাচার চক্রের সঙ্গে সম্পর্ককে সমর্থন করে এবং সেগুলো পোস্ট করেছিল রেডিট ও ৪চ্যান-এ। নিশ্চিতভাবেই এসব ছবি বিকৃত করা হয়েছিল এবং যথার্থ প্রেক্ষাপটের উল্লেখ ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু এসব ছবিই ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয় ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রচারের জন্য। 

৩। পরিচয় সুরক্ষিত করা: এই পর্যায়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী ব্যক্তিরা তাদের “তথ্য পরিবেশ” সুরক্ষিত রাখতে চায় সেসব ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্মানহানির মাধ্যমে, যারা তাদের অবস্থান পরিপন্থী মত ও প্রমাণ হাজির করে। এজন্য শত্রুভাবাপন্ন বা নেতিবাচক পোস্ট ও কমেন্ট করা হতে পারে। 

৪। পরিচয় বাস্তবায়ন করা: ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা সমাজের আরও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তাদের বিশ্বাসের স্বীকৃতি চায়। এজন্য তারা দলে আরও লোক ভিড়ানোর চেষ্টা করে। এমনকি সদস্যদের ব্যবহার করে সহিংস কর্মকাণ্ডের দিকেও ঠেলে দেয়।

এই ধাপগুলো প্রকৃতপক্ষে সর্পিল চক্রের মতো কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে তাকে কট্টর ভাবাদর্শের দিকে নিয়ে যেতে থাকে।

আরও তথ্য নয়, প্রতিরোধ

আমাদের গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন ফ্যাক্ট বা সত্য তুলে ধরার চেষ্টাগুলো এসব তত্ত্ব ছড়ানো প্রতিরোধে শুধু অকার্যকরই নয়, বরং উল্টো ষড়যন্ত্রমূলক বিশ্বাসগুলোকে আরও পোক্ত করে। এর পরিবর্তে, আমরা নীতিনির্ধারকদের এসব তত্ত্ব প্রতিরোধ ও সহায়ক শিক্ষার দিকে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করি।

মানুষ যেন অনলাইনে পাওয়া কোনো তথ্যসূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ও যথার্থতা যাচাই করতে পারে– সেজন্য মিডিয়া স্বাক্ষরতা ও বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটানো অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনার মধ্যে আছে, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ, বিকল্প ও বিরোধী প্রমাণাদি যাচাইয়ের মাধ্যমে অসঙ্গতিগুলো ধরতে পারার সক্ষমতা ইত্যাদি।

এছাড়া, ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিস্তারের পেছনে যেসব সামাজিক ইস্যু আছে– সেগুলোর দিকে নজর দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি বলতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সংশ্লিষ্ট কমিউনিটিগুলো প্রায়ই আমাদের সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। সামাজিক অন্তর্ভূক্তি না থাকার কারণেই এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কেন্দ্রিক কমিউনিটির টিকে থাকা সম্ভব হয়েছে। সামাজিক ভেদাভেদ দূরীকরণের চেষ্টা এবং মূল্যবোধের প্রচার এসকল ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিস্তার রোধে সাহায্য করতে পারে।


ক্রিস্টিন আবডালা মিখাইলের এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। বাংলায় অনুবাদ করেছেন তামারা ইয়াসমীন তমা।

আরো কিছু লেখা