ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক
রাজনৈতিক বিশ্বাসকেও আকৃতি দিচ্ছে অ্যালগরিদম, কীভাবে প্রভাবিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচবেন?
This article is more than 10 months old

রাজনৈতিক বিশ্বাসকেও আকৃতি দিচ্ছে অ্যালগরিদম, কীভাবে প্রভাবিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচবেন?

ডিসমিসল্যাব
অফিসিয়াল ডেস্ক

২০১৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জ্যাকব জুমা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত গুপ্তা পরিবারের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে আসে। অভিযোগ ছিল যে, গুপ্তা পরিবার জুমার ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়েছিল এবং এখান থেকে অন্যায্যভাবে লাভবান হয়েছিল লাভজনক টেন্ডার হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। 

এরপর গুপ্তা পরিবার উপায় খুঁজতে থাকে নিজেদের থেকে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। তারা ব্রিটিশ জনসংযোগ সংস্থা বেল পটিংগারের সাহায্য নিয়ে দেশের চলমান জাতিগত ও অর্থনৈতিক উত্তেজনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ক্যাম্পেইন শুরু করে। “অর্থনৈতিক বৈষম্য”-এর পেছনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় “শ্বেতাঙ্গদের একচেটিয়া আধিপত্য”-র প্রভাব নিয়ে চলে এই ক্যাম্পেইন।

ক্যাম্পেইনটি চালানো হয়েছিল অ্যালগরিদমের সহায়তায়। প্রতিষ্ঠানটি ১০০টিরও বেশি নকল টুইটার বট বা স্বয়ংক্রিয় টুইটার অ্যাকাউন্ট তৈরি করে, যেগুলো বট সফটওয়্যারের সাহায্যে চলত। বিভিন্ন কাজ সম্পাদনার জন্য বিশেষায়িত কম্পিউটার প্রোগ্রাম ডিজাইন করা হয়েছিল, যেগুলো খুব সহজ কাজ থেকে শুরু করে জটিল কাজ যেমন টুইট, লাইক ও রিটুইটের মতো ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত অনুকরণ করত। 

যোগাযোগকে হাতিয়ার বানানোর এই প্রবণতা শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলেও এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়। যেমন বুরকিনা ফাসোতে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করেছিল রাশিয়া। এবং কেনিয়ার বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদদের একাংশ টুইটারের সাহায্যে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছিল। আফ্রিকার বাইরেও একই জিনিস দেখা যায়। ২০২৩ সালের মার্চে গবেষকেরা এমন হাজার হাজার জাল টুইটার অ্যাকাউন্টের একটি নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করেছিলেন, যেগুলো তৈরি করা হয়েছিল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করার জন্য।

আইনি বিশেষজ্ঞ এন্টোইনেট রুভরয় এটিকে বলেন “অ্যালগরিদমিক গভর্নমেন্টালিটি“। এখানে অ্যালগরিদম সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে ফেলা হয়। যেন সমাজের নানা সমস্যা শুধুই বড় ডেটা সেট সংক্রান্ত। যেখানে সমাজ মানুষের দ্বারা সমন্বিত বা পরিচালিত একটি সামষ্টিক জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে একটি বড় ডেটাসেটের জটিলতা বলে বিবেচিত হয়। 

সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে, আমি “অ্যালগোপপুলিজম” নামের একটি শব্দ ব্যবহার করেছি, যার অর্থ অ্যালগরিদমিক সহায়তায় রাজনীতি। আমাদের ব্যক্তিগত ফিডে যেসব রাজনৈতিক কনটেন্ট আমরা দেখি, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তব বিশ্ব ও রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এসব কনটেন্ট নতুন এবং কখনো কখনো “বিকল্প” বাস্তবতা তৈরি করে। আমরা রাজনীতি বলতে কী বুঝি, কী দেখি, এগুলো সেসব ধারণাকে পরিবর্তন করে; এমনকি কখনো কখনো খোদ বাস্তবতাকেও পরিবর্তন করে। 

অ্যালগোপপুলিজম এত কার্যকরভাবে ছড়িয়ে পড়ার একটি কারণ হলো আমাদের ধ্যানধারণা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা জানা খুব কঠিন। এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়। অ্যালগরিদমগুলো এমন সুক্ষভাবে ডিজাইন করা হয়, যা মানুষের যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়। 

তাহলে, এখন আপনি এই অ্যালগরিদমের প্রক্রিয়াগুলো থেকে বাঁচতে কী করতে পারেন? আমার মতে, উত্তরগুলো মিলবে যদি আমরা এটা বোঝার চেষ্টা করি যে, কীভাবে ডিজিটাল রূপান্তরগুলো আমাদের এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। এবং ব্রিটিশ পরিসংখ্যানবিদ থমাস বেইজের ৩০০ বছর আগে দিয়ে যাওয়া ধারণাগুলো জানাবোঝার মাধ্যমে।

কীভাবে এই রূপান্তর ঘটেছে

প্রযুক্তি খাতের পাঁচটি পরিবর্তন অ্যালগরিদমিক গভর্নমেন্টালিটিকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এগুলো হলো: হার্ডওয়্যারের উল্লেখযোগ্য উন্নতি; ক্লাউডের মাধ্যমে সহজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা; ডেটা এবং ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রে অগ্রগতি; গভীর ও জটিল নেটওয়ার্ক এবং ডেটা সাজানো-গোছানোর জন্য পরিশীলিত অ্যালগরিদমগুলোর বিকাশ এবং ডেটা স্থানান্তরের জন্য দ্রুত, সুলভ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠা।

একসঙ্গে এই প্রযুক্তিগুলোর আবির্ভাব ডেটা সংক্রান্ত বিজ্ঞানকে নিছক প্রযুক্তিগত হাতিয়ারের চেয়েও বেশি কিছুতে রূপান্তরিত করেছে। এটি হয়ে উঠেছে ডেটা ব্যবহারের একটি পদ্ধতি, যা শুধু এটি অনুমান করে না যে আপনি কীভাবে ডিজিটাল মিডিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবেন, বরং এটি আপনার কার্যক্রম ও চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করছে। 

এমন নয় যে সব ডিজিটাল প্রযুক্তিই ক্ষতিকর। বরং, আমি এর অন্যতম বড় একটি ঝুঁকি সামনে আনতে চাই: আমাদের সবার চিন্তাভাবনাই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে প্রভাবিত হতে পারে। কখনো কখনো তা বাস্তব-বিশ্বের ঘটনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে প্রভাবিত করা

বেইজীয় পরিসংখ্যান

এখানেই আসে থমাস বেইজের চিন্তাভাবনার প্রাসঙ্গিকতা। বেইজ ছিলেন একজন ইংলিশ পরিসংখ্যানবিদ; মেশিন লার্নিংয়ের একটি প্রভাবশালী প্যারাডাইম, বেইজীয় পরিসংখ্যান-এর নামকরণ হয়েছে তাঁর নাম অনুসারে।

বেইজের আগে কম্পিউটেশনাল প্রক্রিয়াগুলো ফ্রিকুয়েন্টিস্ট স্ট্যাটিস্টিকসের ওপর নির্ভর করত। অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই পদ্ধতির মুখোমুখি হয়েছে। যেমন, কয়েন টসের ক্ষেত্রে হেড নাকি টেল পাওয়া যাবে– তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে। এই পদ্ধতিতে পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয়, মুদ্রাটির দুইপাশ ভিন্ন এবং সেখানে কোনো জালিয়াতি করা হয়নি। একে বলে নাল হাইপোথিসিস।

বেইজীয় পরিসংখ্যানে নাল হাইপোথিসিসের প্রয়োজন পড়ে না। এটি পুরো সম্ভাব্যতা সম্পর্কিত প্রশ্নই পালটে ফেলে। কয়েনটিতে জালিয়াতি করা হয়নি এই পূর্বধারণা নিয়ে হেড/ টেল পাওয়ার সম্ভাব্যতা পরিমাপের পরিবর্তে এখানে জিজ্ঞেস করা হয় যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পদ্ধতিটি সঠিক কি না। নাল হাইপোথিসিসের সত্যতা সম্পর্কে অনুমান করার পরিবর্তে বেইজীয় অনুমান শুরু হয় সাবেজেকটিভ বিশ্বাস দিয়ে, যা রিয়েল টাইম ডেটা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হয়

অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কীভাবে এই কাজ করা হয়? ধরা যাক আপনি একটি গুজব শুনলেন যে পৃথিবী সমতল এবং আপনার এই গুজবকে সমর্থন করার মতো নিবন্ধগুলো পাওয়ার জন্য গুগল অনুসন্ধান করলেন। এই অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে অ্যালগরিদমগুলোকে নির্দিষ্ট একটি বিশ্বাসনির্ভর অনুসন্ধান করতে হবে যে ‘পৃথিবী সমতল’। ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমগুলো আপনার ফিডে এমন নিবন্ধগুলোই দেখাবে যেগুলো এই বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যদি না আপনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিপরীতধর্মী ধারণাগুলো নিয়ে অনুসন্ধান না করেন।

এর কারণ হলো বেইজীয় পদ্ধতিতে পূর্ববর্তী ধ্যানধারণা ও তথ্যগুলোকে সম্ভাব্যতার সূচনা হিসেবে ধরা হয়। যদি না আপনি আপনার পূর্ববর্তী তথ্যপ্রাপ্তির ধরন পরিবর্তন না করেন, তাহলে অ্যালগরিদম আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শুরু করা প্রমাণাদি দেওয়াই চালিয়ে যাবে। 

কিন্তু আপনার অনুসন্ধানের ফলাফল যদি সবসময় আপনার পূর্ববর্তী ধারণাকেই সমর্থন করে, তাহলে কীভাবে জানবেন যে এই ধারণাগুলো পরিবর্তন করতে হবে? এটাই হলো অ্যালগোপপুলিজমের দ্বন্দ্ব; বেইজীয় সম্ভাব্যতা অ্যালগরিদমকে পরিশীলিত ফিল্টার বাবল তৈরি করতে দেয় যার হাত থেকে বাঁচা কঠিন, কেননা আপনার অনুসন্ধানের ফলাফল সবই আপনার পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের ওপর নির্ভরশীল। 

একটা সময় ছিল যখন টেলিভিশনে দেশের সবাই একই সময়ে একই সংবাদ দেখত। কিন্তু বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে বাস্তবতার অভিন্ন সংস্করণ উপস্থাপিত হচ্ছে না। এর পরিবর্তে, আমাদের প্রত্যেকের বাস্তবতার একটি নিজস্ব সংস্করণ আছে। অন্যরা যা দেখে এবং শুনে তার সঙ্গে এর কিছু অংশের মিল আছে এবং কিছু অংশের মিল নেই। 

অনলাইনে ভিন্নভাবে যুক্ত হওয়া

এই বিষয়টি বুঝতে পারলে আপনার অনলাইন অনুসন্ধান ও কোন ধরনের জ্ঞানের সংস্পর্শে আপনি আসছেন তা পরিবর্তিত হবে। 

ফিল্টার বাবল এড়াতে সবসময় নিজস্ব বিশ্বাসের বিপরীতধর্মী বিশ্বাস সম্পর্কে অনুসন্ধান করুন। আপনি যদি শুরু থেকে এই কাজ না করেন তাহলে পৃথক প্রাইভেট ব্রাউজারে অনুসন্ধান করে ফলাফল মিলিয়ে দেখুন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি আপনার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে যাচাই করে দেখুন। দেখুন, কোনো বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট পক্ষ সমর্থন করার পর কী ধরনের ফলাফল পাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, এসব দেখে কি আপনার বাস্তব জগতের চেয়েও অনলাইনকে বেশি বিশ্বস্ত ও অর্থবহ মনে হচ্ছে? তাহলে নির্ভরযোগ্য সূত্র বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন। শুরু থেকেই সূত্রের পক্ষপাতদুষ্টতা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন এবং বেনামে প্রকাশিত সকল কনটেন্ট এড়িয়ে চলুন। 

এভাবেই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত বিশ্বাস ও আচরণ রক্ষা করা সম্ভব।


এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। বাংলায় অনুবাদ করেছেন তামারা ইয়াসমীন তমা।

আরো কিছু লেখা