মিনহাজ আমান

রিসার্চ-লিড, ডিসমিসল্যাব
বিজ্ঞানভিত্তিক প্লাটফর্মে ছড়াচ্ছে মহাকাশ সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর দাবি
This article is more than 12 months old
Feature

বিজ্ঞানভিত্তিক প্লাটফর্মে ছড়াচ্ছে মহাকাশ সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর দাবি

মিনহাজ আমান
রিসার্চ-লিড, ডিসমিসল্যাব

অনলাইনে একাধিক বিজ্ঞানভিত্তিক প্লাটফর্মে মহাকাশ বিষয়ক বেঠিক তথ্য প্রচারের নজির পাওয়া যাচ্ছে। এই লেখায় বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ফেসবুক গ্রুপ বা পেজে প্রকাশিত চারটি বিভ্রান্তিকর পোস্টের উদাহরণ রয়েছে। আর থাকছে, এসব তথ্য যাচাইয়ের জন্য কয়েকটি প্রায়োগিক পরামর্শ।

সম্প্রতি সূর্যের একটি বিরল ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। উজ্জ্বল সোনালী বর্ণে নক্ষত্রটির বহিরাবরণের একটি স্পষ্ট অবয়ব ধরা পড়ে ছবিটিতে। কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, ছবিটি ধারণ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নিজস্ব মহাকাশযান পার্কার সোলার প্রোব।  প্রায় ১০ লাখ সদস্যের  ‘মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান’ গ্রুপে পোস্টটি একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে এবং সেখান থেকে তা শতাধিক বার শেয়ারও হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে একই ছবি ও দাবি পোস্ট করা অন্তত ৩৭টি গ্রুপের আধেয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এদের মধ্যে অন্তত ৯টি নিয়মিত বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ দিয়ে থাকে।

দাবিটি যে শুধু বাংলাদেশেই ছড়িয়েছে এমন নয়। এফপির ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন অনুযায়ী মিশরপাকিস্তানসহ অনেক দেশে এই দাবি পাওয়া গেছে। আর এএফপির ফ্যাক্টচেকে বলা হয়েছে, ছবিটি তুলেছেন অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফার ব্রে ফলস, পৃথিবী থেকেই; এটি পার্কার সোলার প্রোবের তোলা নয়। এ ব্যাপারে এএফপি থেকে যোগাযোগ করলে ফলস নিশ্চিত করেন ছবিগুলো তারই তোলা। মজা করে ফলস নিজেই টুইটারে সেই ভুয়া দাবি পোস্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করে বলেন, “আমিই সেই পার্কার সোলার প্রোব!”

দ্বিতীয় দাবিটি চাঁদ নিয়ে। গত ১২ মে ‘সাধারণ জ্ঞান – General Knowledge’ নামের ফেসবুক গ্রুপে একটি ছবি পোস্ট করে বলা হয়, চাঁদের এই স্বচ্ছ ছবিটি নাসার কোনো এক বিজ্ঞানীর তোলা। ১০ হাজার সদস্যের এই গ্রুপটিতে বিজ্ঞান, ভাষা ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যাদি পোস্ট করা হয়। এছাড়া ‘মহাকাশ, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি’ নামের আরেকটি ফেসবুক গ্রুপেও সেই পোস্টটি পাওয়া গেছে। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক থেকে জানা যায়, অ্যান্থনি সালসি নামক ফরাসি অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফার ছবিটি তুলেছেন এবং তিনি নাসার কোনো বিজ্ঞানী নন।

একইভাবে গত বছরের নভেম্বর মাসে ‘মহাকাশ ও বিজ্ঞান’ নামের বিজ্ঞানভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপে একটি ছবি পোস্ট করে বলা হয়, এটি ‘মহাকাশ থেকে দেখা পৃথিবীর সূর্যাস্ত…’। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গণমাধ্যম ইউএসএ টুডের একটি ফ্যাক্টচেক থেকে জানা যায়, সূর্যাস্তের সময়ের ছবি বলে দাবি করা ছবিটি মূলত কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজ, যা একটি পুরোনো ভিডিও থেকে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া এটি সূর্যাস্ত নয়, বরং সূর্যোদয়ের ছবি বলেও জানানো হয়।

সম্প্রতি আরেকটি ছবি একাধিক বিজ্ঞান এবং মহাকাশ সংক্রান্ত ফেসবুক গ্রুপে ছড়ায়। এতে দাবি করা হয় যে, মহাকাশচারী ম্যাক ক্যান্ডলেস মহাকাশ যানের নিরাপত্তা ছাড়াই শূন্যে ভাসছেন এবং তিনিই ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি যিনি এমনটি করেছেন। কিন্তু একাধিক ফ্যাক্টচেকিং সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মূলযানের সাথে কোনো প্রকার সংযোগ ছাড়া ব্রুস ম্যাকক্যান্ডলেসের শূন্যে ভাসার ঘটনাটি সত্য হলেও ছবিটি সম্পাদিত। ম্যাকক্যান্ডলেসের আসল ছবিটি নাসার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে ২০১৭ সালে। আর ইউএসএ টুডে বলেছে, সম্পাদিত ছবিটি সর্বপ্রথম ফ্লিকারে আপলোড করা হয়েছে ‘তিয়ানশাও জাং’ নামের একটি আইডি থেকে। পত্রিকাটিকে সেই আপলোডকারী জানান, দুটি বিচ্ছিন্ন ছবিকে যুক্ত করে তিনি ফ্লিকারে আপলোড করেছেন। ফ্যাক্টচেক হওয়ার পরও কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক ফেসবুক পেজে এই পোস্ট দেখা যায়।

এভাবে লাখ লাখ সদস্যের বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রচারের ফেসবুক গ্রুপ বা পেজগুলোতেই মহাকাশ সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর দাবি পোস্ট করা হচ্ছে এবং এসব বিভ্রান্তিকর দাবির বেশিরভাগই প্রথমে ইংরেজিতে বিভিন্ন দেশে ছড়ায় যা পরবর্তীতে অনুবাদ করে বাংলাদেশের অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে পোস্ট করা হয়। গ্রুপের অ্যাডমিনেরা যাচাই না করেই বিভ্রান্তিকর পোস্টেগুলোকে প্রকাশের অনুমতি দেন।

বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পেতে 

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া মহাকাশ সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং তা থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সায়েন্স ডট অর্গের সঙ্গে কথা বলেন কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউটে কসমোলজি এন্ড সায়েন্স কমিউনিকেশনের হকিং চেয়ার, ড. ক্যাথরিন ম্যাক। মহাকাশ নিয়ে ছড়ানো নানাবিধ ভুল তথ্যের বিপদ বুঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, এসব ছোট ছোট বিভ্রান্তিকে বিশ্বাস করতে করতে একসময় একজন ব্যক্তি মহাকাশ সংক্রান্ত বড় বড় ষড়যন্ত্র-তত্ত্বগুলোর খপ্পরে পড়ে যেতে পারেন।    

তিনি বলেন, এ ধরনের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পেতে  প্রথমে দেখতে হবে কার বরাতে এই তথ্যটি দেয়া হচ্ছে। কোনো রেফারেন্স ছাড়া তথ্যকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করতে হবে এবং সেটি শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া যেকোনো তথ্য নিউজফিডে আসলে সেটি গুগল বা যেকোনো মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে যাচাই করা যেতে পারে। পৃথিবীর বিখ্যাত মহাকাশ গবেষকেরা তাদের কার্যক্রম এবং পর্যবেক্ষণ প্রতিনিয়ত তাদের ওয়েবসাইট বা টুইটারে পোস্ট করে থাকেন, সেগুলো থেকেও যথাযথ তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায় বলেও তিনি জানান।   

কেউ ভুল খবর ছড়ালে বিদ্রুপ বা প্রশ্নবিদ্ধ না করে সঠিক তথ্যটি তাকে সাদরে জানালে কার্যকর সমাধান মিলতে পারে বলে বিশ্বাস করেন ড. ম্যাক।

আরো কিছু লেখা