কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা এআই-এর উত্থান তথ্য প্রকাশ (ডিজক্লোজার), সম্মতি (কনসেন্ট) এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ক্ষমতার মতো বিষয়কে নতুন করে তীব্র বিতর্কের ক্ষেত্র বানিয়ে তুলেছে।
ইউটিউবের একটি সাম্প্রতিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এই বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। এই ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম আপলোড করা কিছু কনটেন্টের গুণমান বাড়াতে “অস্পষ্টতা দূর (আনব্লার), অনাহুত দাগ কমানো (ডিনয়েজ) এবং স্পষ্টতা বৃদ্ধি”র জন্য এআই টুল ব্যবহার করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এবং তা করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সম্মতি না নিয়ে, তাদের না জানিয়েই। ভিডিওর দর্শকরাও ইউটিউবের এই হস্তক্ষেপ সম্পর্কে কিছু জানতে পারেননি।

এসব ব্যাপারে স্বচ্ছতা না থাকলে, এআই-সম্পাদিত কন্টেন্টের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দূরে থাক, শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে যায় ব্যবহারকারীদের জন্য। আর এআই টুল আসার আগ থেকেই এ ধরনের বিকৃতি আমাদের সঙ্গী।
অদৃশ্য কালির নতুন আঁচড়
ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোই সূক্ষ্ম কারসাজির কাজটা প্রথম করেছে, এমন নয়।
বছরের পর বছর লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনগুলো ছবির নির্দিষ্ট কিছু ফিচারকে কোমল বা তীক্ষ্ণ করতে “এয়ারব্রাশ” করছে। পাঠক তো বটেই, এমনকি অনেক সময় সংশ্লিষ্ট তারকাও এ সম্পর্কে জানতেন না। অভিনেত্রী কেট উইনস্লেট ২০০৩ সালে ব্রিটিশ জিকিউ ম্যাগাজিনের একটি সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সম্মতি ছাড়াই এই ফ্যাশন ম্যাগাজিন কভার ফটোতে তার কোমর সরু করাসহ আরও বিভিন্ন পরিবর্তন করেছিল।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার আগে ছবি সম্পাদনার তীব্র আগ্রহ দেখা যায়। অবশ্য এর কারণ আছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ফ্লিকার-এ (ছবি ও ভিডিও শেয়ারিং কমিউনিটি) পোস্ট করা ৭৬ লাখ ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফিল্টার করা ছবি দেখার ও এনগেজমেন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে ইউটিউবের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বেশ ভালোভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, এসব ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের ক্ষমতা কতটা সীমিত।
২০২১ সালে টিকটক-ও একই ধরনের বিতর্কের মুখে পড়েছিল। কিছু অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারী লক্ষ্য করেন, পোস্টে তাদের সম্মতি বা কোনো প্রকার অবহিত না করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি “বিউটি ফিল্টার” প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে সৌন্দর্যবর্ধনকারী টিকটক ফিল্টারের ব্যবহার এবং নিজের অবয়ব নিয়ে নেতিবাচক ধারণা জন্মানোর মধ্যে সম্পর্ক আছে।
ব্যবহারকারীকে না জানিয়ে এমন পরিবর্তন অফলাইন জগতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালে আইফোনের নতুন মডেলগুলোতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ফিচার ব্যবহৃত হচ্ছিল যার নাম স্মার্ট এইচডিআর। ব্যবহারকারীর ত্বককে “মসৃণ” করে দিত এটি। পরবর্তীকালে অ্যাপল একে একটি “বাগ” বলে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনেও হাজির হয়েছিল এই সমস্যা। ‘নাইন নিউজ’ ভিক্টোরিয়ান এমপি জর্জি পারসেলের একটি ছবি প্রকাশ করেছিল। এআই দিয়ে সম্পাদিত সে ছবিতে পারসেলের শরীরের মধ্যাংশ উন্মুক্ত দেখাচ্ছিল, অথচ মূল ছবিতে সেটি ঢাকা ছিল। ব্যবহৃত ছবিটি এআই দিয়ে সম্পাদনা করার কথা দর্শকদের জানায়নি সংবাদমাধ্যমটি।
এই সমস্যাটি শুধু দৃশ্যমান কন্টেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন না। ২০২৩ সালে লেখক জেন ফ্রাইডম্যান লক্ষ্য করেন, অ্যামাজন তার নামে পাঁচটি বই বিক্রি করছে, যেগুলো এআই দিয়ে লেখা হয়েছে। একে তো তিনি বইগুলো লেখেননি, তারওপর তার সুনামও ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল এ ঘটনা।
সবগুলো ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অ্যালগরিদমিক পরিবর্তনগুলো কোনো ডিসক্লোজার ছাড়াই দর্শকদের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে।
তথ্য প্রকাশের হারিয়ে যাওয়া
এআই যেভাবে দিন দিন বাস্তবতায় হানা দিচ্ছে, এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সহজতম উপায় হলো ‘ডিসক্লোজার’ বা তথ্য প্রকাশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারের বিষয়ে স্বচ্ছ থাকে, ব্যবহারকারীরা তাদের ওপর বেশি আস্থা রাখে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান এবং এআই-এর ওপর ব্যবহারকারীর প্রাথমিক আস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বজুড়ে এআই এর ওপর ব্যবহারকারীদের আস্থা কমে যাচ্ছে। আবার নিজেরা যে এআই ব্যবহার করেছেন সেগুলোর প্রতি আস্থা ক্রমশ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তারা বিশ্বাস করে এআই অবশ্যই ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে।
তাহলে কোম্পানিগুলো কেন এখনো তথ্য প্রকাশ না করেই এআই ব্যবহার করছে? এর সম্ভাব্য কারণ হলো প্রকাশ্যে এআই এর ব্যবহার মাঝে মাঝে সমস্যার জন্ম দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারের কথা প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা ক্রমাগত কমতে থাকে। তবে সেটা এআই ব্যবহারের তথ্য গোপন রেখে পরবর্তীতে ধরা পড়ার চেয়ে কম ক্ষতিকর।
ব্যবহারকারীদের আস্থার বিষয়টি পাশে রেখে যদি দেখা হয়, ডিসক্লোজারের প্রভাব বেশ জটিল। গবেষণা বলছে, এআই জেনারেটেড ভুল তথ্যের ক্ষেত্রে সেটি এআই দিয়ে তৈরি- এ তথ্য প্রকাশ করলেও পাঠকদের চোখে বিশ্বাসযোগ্যতা খুব একটা কমে না। তবে, ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ আসতে পারে- এ ভয়ে মানুষ ওই ধরনের কন্টেন্ট শেয়ার করার ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিধায় ভুগতে পারেন।
এআইয়ের অচেনা স্রোত সামলানো
সময়ের সাথে সাথে এআই দিয়ে তৈরি বা কারসাজি করা কন্টেন্ট শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এমনকি অত্যন্ত উন্নত এআই ডিটেক্টরগুলোও এই দৌড়ে এক ধাপ পিছিয়ে রয়েছে।
ভুল তথ্য বা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘কনফার্মেশন বায়াস‘ বা পূর্বসংস্কার। ব্যবহারকারীরা নিজের মতের সঙ্গে যায় এমন মিডিয়াকে (এআই নির্মিত বা অন্যান্য) কম সন্দেহের চোখে দেখেন। এআই-এর উত্থানে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে এই সমস্যা।
সৌভাগ্যবশত আমাদের হাতেও কিছু অস্ত্র আছে; যদি আমরা সেগুলো জানার ব্যাপারে সচেতন হই। বিশেষ করে তরুণ মিডিয়া ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটে ভুল তথ্যের জোয়ার প্রতিহত করতে কিছু কৌশল তৈরি করে নিয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘ট্রায়াঙ্গুলেশন’। এর অর্থ হলো কোনো একটি খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তা যাচাই করা।
বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা গ্রুপগুলোকে লাইক ও অনুসরণ করে এবং নিম্নমানের উৎসগুলোকে বর্জন করে ব্যবহারকারীরা তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ফিডকেও নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে। তবে তাদের জন্য দিন দিন এটা করা কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ টিকটক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ মডেলের অনুসারী। এই মডেল ব্যবহারকারীর পরিকল্পিত সক্রিয় অংশগ্রহণের চেয়ে পরোক্ষ বা নিষ্ক্রিয় ব্যবহারকে উৎসাহিত করে।
ক্রিয়েটরদের ভিডিও তাদের সম্মতি বা কোনো ডিসক্লোজার ছাড়াই পরিবর্তন করার যে সিদ্ধান্ত ইউটিউব নিয়েছে, তা হয়তো একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তাদের আইনি অধিকারের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু এটি ব্যবহারকারী এবং কন্ট্রিবিউটরদের জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অন্যান্য বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর পূর্বঘটনা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বিপুল ক্ষমতার কথা বিবেচনা করলে বলা যায়, সম্ভবত এমন কিছু এবারই শেষ নয়।
টিমোথি কসকি-এর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। বাংলায় অনুবাদ করেছেন ফারিহা আফরীন।