
১৭ বছর পর বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে আজ। রাজনৈতিক কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ- ভোট উৎসবের আমেজে সবার মাঝে ‘ঈদ’ ‘ঈদ’ ভাব দেখা যাচ্ছে। ১১ জানুয়ারি দিবাগত রাতটাকে তাই চাঁদ রাত ভেবে নিলে খুব বেশি আপত্তির ছিল না। কিন্তু পুরো রাতের গল্প একে বানিয়ে ফেলেছে গুজবের রাতে। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ভাষায়, ‘লাইলাতুল গুজব।’
ইঙ্গিত আগেই মিলছিল। নির্বাচনের আগের দিনে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ভুয়া ফটোকার্ডে মিথ্যা দাবি, পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনা বলে প্রচার, ভোটকেন্দ্রে হামলা, অস্ত্র উদ্ধারের দায় অন্যের কাঁধে দেওয়া এবং প্রার্থীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো দাবি দেখা গেছে দিনজুড়ে।

এর পাশাপাশি কিছু প্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী বিধিমালা ভঙ্গের দায়ে রাজনৈতিক কর্মীদের আটকের খবর এসেছে গণমাধ্যমে। আর সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে যেন খুলে গেল প্যান্ডোরার বাক্স।
সময় যত গড়িয়েছে একের পর এক প্রার্থিতা বাতিলের বার্তা আসতে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কখনো সাধারণ স্ট্যাটাসেই এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে, আবার কখনো বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পরিচিত গণমাধ্যমের আদলে ভুয়া ফটোকার্ডকে অস্ত্র মেনেছেন ব্যবহারকারীরা।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ। তবে সে আসনে নিজের দাবি ছাড়েননি জামায়াতের ডা. আবু নাসেরও। গতকাল রাতে ফেসবুকে একটি ভেরিফায়েড পেজ থেকে দাবি তোলা হয়, শাপলা কলি মার্কার এনসিপি প্রার্থী আরিফ দাঁড়িপাল্লা মার্কার প্রার্থী নাসেরকে সমর্থন জানিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আরিফ নিজেই সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি এবং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বহাল আছেন।
ধানের শীষের পক্ষেও এমন ভুয়া দাবি ছড়াতে দেখা যায়। একটি এআই ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান খান আঙ্গুর ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। অথচ ফেসবুকে একাধিক ভিডিও পাওয়া গেছে, যেখানে আতাউর রহমান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর তথ্যটি গুজব বলে নিশ্চিত করেন।
মজার ব্যাপার, একটু পর একটি গ্রুপ থেকে পালটা দাবি করা হয়, “আঙ্গুর সাহেব কে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ালেন নজরুল ইসলাম আজাদ।”
প্রার্থী সরে দাঁড়িয়ে এনসিপিকে সমর্থন জানিয়েছেন, এমন দাবিও ছড়িয়েছিল। নোয়াখালী-২ আসনে শাপলা কলির সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়াকে সমর্থন জানিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী মোহাম্মদ মফিজুর রহমান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন— এমন দাবিতে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রার্থী নিজে ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে এ ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান।
নোয়াখালী -১ আসনের ক্ষেত্রেও প্রার্থিতা সরিয়ে নেওয়ার ভুয়া খবর এসেছে। দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে হাতপাখার প্রার্থী জহিরুল ইসলাম সরে দাঁড়িয়েছেন- এমন কিছু দাবি দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু প্রার্থী ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে স্ট্যাটাস দেন, “গুপ্ত বাহিনীর অপপ্রচার রুখে দিন! আগামীকাল সারাদিন হাত পাখা মার্কায় ভোট দিন।”

তবে সবচেয়ে বড় চমকটি ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে ঘিরে। দাবি করা হয়, দলীয় পদ থেকে সরে ধানের শীষের জন্য ভোট চাইছেন তিনি। যদিও ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময়কার ভিডিওকে সাম্প্রতিক দাবিতে প্রচার করা হচ্ছিল কাল রাতে।
দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার আদলে বানানো দুইটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে দাবি করা হয়, বরগুনা-২ আসনের জামায়াত প্রার্থী সুলতান আহমেদ তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। তবে দাবি এবং কার্ড- দুইটিই ভুয়া ছিল।
জামালপুর-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী দৌলতুজ্জামান আনসারী এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী রেজা কিবরিয়ার ক্ষেত্রেও সরে দাঁড়ানোর খবর ছড়িয়েছিল।
প্রার্থিতা সরিয়ে নেওয়ার খবর ছড়ানোর উদ্দেশ্য যদি হয় ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, তবে এর চূড়ান্ত রূপ হাজির হয়েছিল গত রাতে। ১১ দলীয় জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয়, জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে যুগান্তরের লোগো ব্যবহার করা সে ফটোকার্ডটি ছিল ভুয়া।
এর বাইরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সারা রাতই দেখা গেছে। বগুড়ায় ভোটকেন্দ্রে অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক হন জামায়াত নেতা। আর সে ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয় বগুড়ায় বিএনপি ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা করছে।
আবার নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সিদ্ধিরগঞ্জ ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ধনকুণ্ডা স্কুল নির্বাচনী কেন্দ্রে জামায়াত আগেই ভোট দিয়ে দিচ্ছে— এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে সিদ্ধিরগঞ্জের দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারী রিটার্নিং অফিসার শাহিনা ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ঢাকা-৬ আসনের জুবিলী স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রের ঘটনাটি ছিল আরও বিভ্রান্তিকর। একদিকে দাবি করা হয়, “বিএনপি প্রার্থীর কর্মী দিনের ভোট রাতে ভোট দিতে অপচেষ্টা করায় তোপের মুখে পড়েছেন।” আবার অন্য পক্ষ থেকে দাবি ওঠে, “৪৩ নং ওয়ার্ড জুবিলী স্কুল কেন্দ্র জামাত শিবির এখন থেকেই ভোট কেন্দ্রে অনিয়ম শুরু করেছে।”

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “জামায়াতের বিরুদ্ধে রাজধানীতে ভোটকেন্দ্র দখল চেষ্টার অভিযোগ”। আর ফেসবুক রিলের ক্যাপশন ছিল, “জামায়াত কর্মীদের জুবিলী স্কুল কেন্দ্র দখলের চেষ্টা”। যদিও ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়, “রাজধানীর পুরান ঢাকার জুবিলি স্কুল ভোটকেন্দ্রে বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলায় প্রিসাইডিং অফিসার ও জামায়াতের পাঁচজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।”
আবার নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও এ নিয়ে ভুয়া খবর ছড়াতে আগ্রহী দেখা গেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদেরও। নিজেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজশাহী মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক দাবি করা এক আইডি থেকে দুই বছর পুরোনো ভোটের ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে, মধ্যরাতে চকরিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট চুরি চলছে।
গুঞ্জনের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও। অন্তত ২০০ বার শেয়ার করা এক পোস্টে দাবি করা হয়, “সেনা জওয়ানরা বিদ্রোহ করেছে, ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে ২৩ জন মেজর জেনারেল, ১১ জন কর্নেল ও তিনজন লেফটেন্যান্ট জেনারেলকে। …যেকোনো সময় বিদ্রোহ হতে পারে…”

এর বাইরে কেন্দ্র দখল, কেন্দ্র অনুপ্রবেশ, অগ্রিম ব্যালটে সিল মারা, ফলাফল সিটে স্বাক্ষরের মতো পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ছিল। গাজীপুর-২ আসনের সব ভোট রাতেই হয়ে যাওয়ারও দাবি উঠেছে। এমনকি ঢাকা-৮ এর এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে গ্রেফতারের দাবিও ছড়াতে দেখা গেছে।
প্রায় দেড় যুগ পর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখার অপেক্ষা সবার। তবে গত রাতে ছড়ানো ভুয়া দাবি আর অপতথ্যের বিশ্লেষণ অন্তত এটুকু বলে দিচ্ছে, গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে অংশ নিতে ভোলেনি প্রায় কোনো পক্ষই!