
ইরানের দক্ষিণ আফ্রিকা দূতাবাসের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানের এক সেনা সদস্য ডালিমের জুস পান করতে করতে স্কেটিং করছেন। ওই মুহূর্তে তার পেছনে একটি ভারী ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হচ্ছে। পোস্টের ক্যাপশনে ভিডিওটি “ফান পোস্ট” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে ভিডিওটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমগুলোর পোস্টে ব্যবহারকারীদের মন্তব্য পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট, এ ভিডিওকে বাস্তব ধরে নিয়েছেন অনেকেই। অথচ, ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ছড়ানো ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমগুলো ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার বিষয়ে তথ্য না দিয়ে বলছে, “সত্যতা নিয়ে দূতাবাস কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি”। ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা।

“কালবেলা ওয়ার্ল্ড” নামের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ভিডিওর কিছু দৃশ্য দেখানো হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “জুস পান করতে করতে ছুঁড়ছে মি’সা’ই’ল, ইরানের ভিডিও ভাইরাল!” প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, “ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেও তাদের প্ল্যাটফর্মে এই ভিডিওটি প্রকাশ করেছে। ইরান দূতাবাসের পক্ষ থেকে এটি একটি ফান পোস্ট বা মজার ছলে করা পোস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ভিডিওটির সত্যতা বা এর পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে দূতাবাস এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।”

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কালবেলার প্রতিবেদনটি দেখা হয়েছে ২০ লাখের বেশি বার। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে দেড় লাখের বেশি। এক হাজারের বেশি মন্তব্য করা হয়েছে। একজন মন্তব্যে লিখেছেন, “এটাকেই বলে মুসলিমের ঈমানী শক্তি।” আরেকজন লিখেছেন, “একেই বলে আনন্দ।” এছাড়াও একজন লিখেছেন, “বলতে হবে বাঘের বাচ্চা।” পোস্টে থাকা প্রথম দিকের মন্তব্যগুলো থেকে দেখা যায়, অনেকেই এটি আসল ভিডিও হিসেবে ধরে নিচ্ছেন। একজন ব্যবহারকারী ভিডিওটি এআই দিয়ে বানানো বলে উল্লেখ করলে উত্তরে কয়েকজন তাকে গালিগালাজ করেন।

ভিডিওটি নিয়ে কালবেলা, যুগান্তর, যমুনা টেলিভিশন, বার্তা বাজার, ইত্তেফাক, বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোরসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম (১, ২, ৩, ৪, ৫) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ “ইরান অ্যাম্বাসি এসএ” নামের একটি ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ সেকেন্ডের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়, “আজকের মজার পোস্ট: ডালিমের রস পান করুন, যাতে আরও নির্ভুলভাবে তেল আবিবে আঘাত করতে পারেন।”
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সামরিক পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি পিচঢালা হাইওয়ের ওপর স্কেটবোর্ড চালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসছেন। পোশাকের ডান হাতে ইরানের পতাকার একটি ব্যাজ রয়েছে। এক হাতে সেলফি স্টিক ধরে ভিডিও করছেন এবং অপর হাতে একটি বোতল থেকে লাল রঙের কোনো পানীয় পান করছেন। ভিডিওর শেষভাগে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখা যায় তাকে।
ওই ব্যক্তির ঠিক পেছনে রাস্তায় একটি সামরিক যান থেকে একটি বড় মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র সোজা আকাশের দিকে উৎক্ষিপ্ত হতে দেখা যায়। সে সময় সেখানে প্রচুর ধুলো ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হয়ে। রাস্তার ডান পাশে বড় আকারের আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সামরিক যান স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দূরে রাস্তার ওপর আরও একটি সামরিক যান দৃশ্যমান। চারপাশের পরিবেশটি রুক্ষ, শুষ্ক প্রান্তর ও পাহাড়ি এলাকার মতো দেখতে এবং ওপরের আকাশ সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও নীল।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ২৫ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে ৪৫ হাজারের বেশি। ভিডিওটি ৭ হাজারের বেশি বার রিপোস্ট হয়েছে।
কালবেলার মতো যমুনা টেলিভিশনের ওয়েবসাইটে এ ভিডিও নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনেও প্রায় একই ধরনের তথ্য জানানো হয়। শিরোনামে লেখা হয়, “ইরানের দূতাবাসের ভিডিও ‘ডালিমের জুস পান করলে তেলআবিবে আঘাত হবে আরও নির্ভুল।” প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে, “সাউথ আফ্রিকায় অবস্থিতি ইরানিয়ান এম্বাসি থেকে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। কারণ—ভিডিওটি অনেকটা ইসরায়েলকে অপমান করে বানানো হয়েছে।”
যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়, “ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানি দূতাবাস সাউথ আফ্রিকার অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছে। এছাড়াও ইন্ডিয়া টুডে’র পেজ থেকে ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোন বিবৃতি এখন পর্যন্ত দেয়নি ইরানি দূতাবাস। তবে পোস্টের ক্যাপশনে লেখা ‘ফান পোস্ট’।”
একইভাবে, অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও ভিডিওটির সত্যতা বা এটি এআই দিয়ে বানানো কিনা– তা স্পষ্ট না করেই ইরানি দূতাবাসের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। বেশকিছু প্রতিবেদনে কালবেলা ও যমুনার মতো রেফারেন্স হিসেবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন বেশ ভাইরাল হতে দেখা গেছে। মন্তব্যে কিছু ব্যবহারকারীরা ভিডিওটি বাস্তব ও এআই দাবি করে পাল্টাপাল্টি মন্তব্য করেছেন। সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকেও ভিডিওটি যাচাই করে এর সত্যতা নিয়ে কিছু জানানো হয়নি। শুধু ইরান দূতাবাসের বরাতে খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
রিপোর্টার্স উইথআউট বর্ডারস (RSF) থেকে প্রকাশিত একটি নীতিমালায় (প্যারিস চার্টার অন এআই অ্যান্ড জার্নালিজম) সাংবাদিকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের ১০ নভেম্বর প্যারিস পিস ফোরাম (প্যারিস শান্তি ফোরাম) উপলক্ষে রিপোর্টার্স উইথআউট বর্ডারস (RSF) এবং তাদের ১৬টি অংশীদার (পার্টনার) প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ‘প্যারিস চার্টার অন এআই অ্যান্ড জার্নালিজম‘ বা এআই এবং সাংবাদিকতা বিষয়ক প্যারিস সনদ প্রকাশ করে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক মারিয়া রেসার সভাপতিত্বে এবং বিশ্বের ২০টি দেশের ৩২ জন সাংবাদিকতা ও এআই বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিশন এই সনদটি তৈরি করেছে।
এই নীতিমালায় সাংবাদিকদের এআই কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি বা এআই-এর সাহায্যে ছড়ানো ভিডিও বা কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সনদের ৫, ৬ এবং ৭ নম্বর নীতিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা আলোচ্য ভিডিওটির ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোর অবহেলার বিষয়টিকেই নির্দেশ করে।
পাঁচ নম্বর নীতিতে বলা হয়েছে, সাংবাদিকতার কনটেন্ট তৈরি বা বিতরণে এআই-এর এমন কোনো ব্যবহার যা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং যারা এই তথ্য বা সংবাদ পাচ্ছেন, তাদেরকে মূল কনটেন্টের পাশাপাশি এআই ব্যবহারের বিষয়টি জানাতে হবে।
আবার ছয় নম্বর নীতিতে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমগুলোকে প্রকাশিত কনটেন্টের সত্যতা এবং উৎসের নিশ্চয়তা দিতে হবে। যেসব কনটেন্ট এই অরিজিনালিটি বা প্রামাণিক মানদণ্ড পূরণ করে না, সেগুলোকে সম্ভাব্য ‘বিভ্রান্তিকর’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং প্রকাশের আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে। তবে আলোচ্য মিসাইল ছোঁড়ার ভিডিওটির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমগুলো এই যাচাইয়ের কাজটি না করেই খবর প্রকাশ করেছে।
এছাড়াও ৭ নম্বর নীতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমগুলোকে বাস্তব জগতের আসল ছবি বা ভিডিও এবং এআই দিয়ে তৈরি বা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত কনটেন্টের মধ্যে একটি স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য পার্থক্য নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদমাধ্যমগুলোকে অবশ্যই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে, বাস্তবের মতো দেখতে এআই-জেনারেটেড ছবি বা ভিডিও, কিংবা বাস্তব কোনো ব্যক্তিকে নকল করে তৈরি করা কনটেন্ট প্রচার বা ব্যবহার করা থেকে তাদের বিরত থাকা উচিত।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ভিডিওটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে গত ২৮ মার্চ থেকে। কিন্তু ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, এর আগেই গত ২৭ মার্চ তেইত নামের তুরস্কের একটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ভিডিওটি এআই দিয়ে বানানো বলে নিশ্চিত করেছে।
অধিকতর যাচাইয়ের স্বার্থে পরবর্তীকালে ভিডিওটি ফ্যাক্ট চেক করে ডিসমিসল্যাব। এতে ভিডিওটি এআই দিয়ে বানানো বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ফলে প্রচণ্ড কম্পন, শব্দ এবং প্রবল বাতাসের সৃষ্টি হলেও ভিডিওতে থাকা সেনা সদস্যের উপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি। ভিডিওর শব্দ ও দৃশ্যের মধ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। ভিডিও ধারণকারী ডিভাইসের বেশ কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হলেও অডিওতে থাকা শব্দ খুব বেশি জোরালো ছিল না।
পরবর্তী যাচাইয়ে ভিডিওটি গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল সিন্থ আইডিতে পরীক্ষা করলে টুলটি জানায়, “এই ভিডিওর দৃশ্যগুলো গুগল এআই ব্যবহার করে সম্পাদনা বা তৈরি করা হয়েছে। বিশেষভাবে ভিডিওটির ০:২০ থেকে ০:২৪ সেকেন্ডের মধ্যকার দৃশ্যে ওয়াটারমার্কটি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে, ভিডিওটির অডিও অংশে কোনো সিন্থআইডি ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়নি।”

এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশন দিয়েও ভিডিওটি পরীক্ষা করা হয়। এতে জানা যায়, ভিডিওটি এআই জেনারেটেড হওয়ার সম্ভাবনা ৯৮.৫ শতাংশ।

অর্থাৎ, ইরানের দক্ষিণ আফ্রিকা দূতাবাসের এক্স অ্যাকাউন্টে “ফান পোস্ট” হিসেবে প্রকাশিত ভিডিওটি কোনো বাস্তব ঘটনার দৃশ্য নয়, বরং এআই দিয়ে তৈরি।