
পেজটির নাম জনতার ইনকিলাব। তৈরি করা হয়েছে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, মাত্র সাত দিনে পেজটির অনুসারী এক লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও পেজের মূল কন্টেন্ট। আর এসব এআই ভিডিওর চরিত্র? সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্য।

তারেক রহমান ও তার পরিবারের আদলে বানানো এআই চরিত্ররা নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ভিডিওতে। ক্যাপশনেও বলে দেওয়া হচ্ছে, “পেজ ফলো করে স্ক্রিনশট দিলেই পেয়ে যাবেন বিশাল টাকা পুরস্কার”। এসব পোস্ট আবার শেয়ার করা হচ্ছে একাধিক পেজ ও গ্রুপে। এমন ভিডিও বানানোর কারণ খুঁজতে গেলে সংশ্লিষ্ট পেজের এক অ্যাডমিন দাবি করেন, লাইক ও ফলোয়ার বাড়িয়ে পরবর্তীতে পেজটি বিক্রি করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও এমন ভিডিও তৈরি করতে দেখা গেছে অনেক পেজে। সেসব ক্ষেত্রে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে বিকাশ বা নগদ নাম্বার চাওয়া হতো। এখন সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফ্যামিলি কার্ডের আশ্বাস। অনেক ব্যবহারকারী এসব বার্তা বিশ্বাস করে পোস্টের মন্তব্যে দিচ্ছেন যোগাযোগের নাম্বার ও ঠিকানা।

পেজটির বর্তমান নাম জনতার ইনকিলাব হলেও ইতোমধ্যে একবার পরিবর্তন করা হয়েছে নাম। শুরুতে নাম “তারেক রহমান” থাকলেও, পরে তা পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে “জনতার ইনকিলাব”। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পেজটি থেকে মোট ৩৪টি পোস্ট আপলোড ও শেয়ার করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্তত ২৭ পোস্টে এআই ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। সবগুলো পোস্টের ক্যাপশনেই লেখা আছে, “পেইজ ফলো করে স্ক্রিনশট দিলেই পেয়ে যাবেন বিশাল টাকা পুরস্কার।”
পেজটি থেকে পোস্ট হওয়া প্রথম ভিডিওর দৈর্ঘ্য ছিল ছয় সেকেন্ড। এতে তারেক রহমানের আদলে তৈরি এআই চরিত্রকে বলতে শোনা যায়, “বিএনপিকে ভালবেসে থাকলে টাকা ছাড়া লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করেন”। ক্যাপশনে লেখা আছে, “পেইজ ফলো করে স্ক্রিনশট দিলেই পেয়ে যাবেন বিশাল টাকা পুরস্কার। আমার নতুন পেজটি ফলো করে দিন।” উল্লেখ্য, পোস্টটি করার সময় পেজটির নাম ছিল “তারেক রহমান”।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি দেখা হয়েছে ৪৫ হাজারের বেশি বার। শেয়ার হয়েছে এক হাজারের অধিক। মন্তব্য জানানো হয়েছে দেড় শর অধিক। একজন নিজের নাম লিখে একটি মোবাইল নাম্বার দিয়েছেন মন্তব্যে। আরেকজন একটি মোবাইল নাম্বার দিয়ে লিখেছেন, “আমার।কোনো।টাকা।লাকবেনা।শুথু।আপনা।শাথে।দেখা।করবো।আমার।নামবার।”

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায় তারেক রহমানের আদলে তৈরি এআই চরিত্র বলছে, “ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া চালু হয়ে গেছে।” পাশ থেকে জুবাইদা রহমানের আদলে তৈরি এআই চরিত্র বলছে, “যারা এখনো পাননি তারা কমেন্ট করেন। সবাই পাবেন।” আবার তারেক রহমান বলছেন, “সাথে দশটা শেয়ার কইরেন।” পেছন থেকে আবার জাইমা রহমানের আদলে তৈরি এআই চরিত্র বলছে, “হ্যাঁ, শেয়ার করুন যাতে সবাই জানতে পারে।”
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটির ভিউ হয়েছে ২৫ লাখের বেশি। শেয়ার হয়েছে অন্তত ৪০ হাজার বার। এছাড়াও মন্তব্য করা হয়েছে ১৪ হাজারের অধিক।
একজন মন্তব্যে লিখেছেন, “আমরা পাইনি, আমাদের বাসা জইনা বাজার শ্রীপুর গাজীপুর গ্রাম ধনুয়া বাসা হাজী মার্কেট বাঁশতলা আমাদের এই ফ্যামিলি কাট টা খুবই দরকার।” আরেকজন নিজের নাম্বার দিয়ে লিখেছেন, “আমি পাইনি হাজী মোঃ মুনির উদদীন ৫নং চর জুবিলী ইউনিয়ন পরিষদ ৩নং ওয়াড়।” অন্য আরেকজন একইভাবে মন্তব্যে একটি মোবাইল নাম্বার দিয়ে লিখেছেন, “আমার ভিটা বাড়ি নাই আমি ফ্যামিলি কাড পাইনি।”
আরও একাধিক(১, ২, ৩, ৪, ৫) ভিডিওতে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করার জন্য বলা হয়েছে। কয়েকটি ভিডিওতে (১, ২) তারেক রহমানের সঙ্গে ডা. মুহম্মদ ইউনূসকে জড়িয়েও বানানো হয়েছে এআই ভিডিও।
পেজটি যুক্ত রয়েছে এমন একটি ফেসবুক গ্রুপও খুঁজে পাওয়া যায় “জনতার ইনকিলাব” নামে। গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি। গ্রুপটি গত বছরের এপ্রিলে “উরমিলা” নামে তৈরি করা হয়েছিল। যা পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে হয়েছে “জনতার ইনকিলাব।” এছাড়াও পেজটি আরও দুইটি পাবলিক গ্রুপে যুক্ত যাছে যেগুলোর নাম, “তারেক রহমান” ও “বিএনপি”।

তিনটি গ্রুপেই ঘুরেফিরে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের আদলে তৈরি এআই ভিডিও প্রচার করতে দেখা যায়। এছাড়া সবগুলো গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেলেই “জনতার ইনকিলাব” পেজটি রয়েছে। দুইটি গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেলে “মোহাম্মদ সজল শেইক (Mohammad Sojol Sheik)” নামের একটি প্রোফাইলও যুক্ত থাকতে দেখা গেছে। “পথের গল্প” নামের একটি পেজকেও দুইটি গ্রুপের অ্যাডমিন লিস্টে পাওয়া গেছে।
অধিকতর যাচাইয়ের স্বার্থে “মোহাম্মদ সজল শেইক” নামের প্রোফাইল ও “পথের গল্প” নামের ফেসবুক পেজের ইনবক্সে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। “মোহাম্মদ সজল শেইক” নামের প্রোফাইল থেকে মেসেজের উত্তর দিলে তিনিই ‘জনতার ইনকিলাব’ নামের পেজের অ্যাডমিন বলে নিশ্চিত করেন ডিসমিসল্যাবকে।
মোহাম্মদ সজলের ভাষ্যমতে, এআই ভিডিওর মাধ্যমে ফলোয়ার বাড়িয়ে পেজগুলো দ্রুত বিক্রি করে দেওয়াই তাদের মূল উদ্দেশ্য। মনিটাইজেশনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে দ্রুত লাভের জন্য তারা এই কৌশল অবলম্বন করেন। ভিডিওগুলো গুগলের এআই মডেল ভিইও থ্রি দিয়ে বানানো হয় বলেও জানান মোহাম্মদ সজল।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনের আগেও তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের আদলে তৈরি এআই চরিত্র দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া প্রলোভন দেখানো হয়েছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ডিসমিসল্যাবের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জিয়া পরিবারের সদস্যদের ছবি ও কণ্ঠ নকল করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার তথ্য উঠে আসে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তত ১৩টি ফেসবুক পেজ এবং একাধিক গ্রুপ ব্যবহার করে এসব ভুয়া প্রচারণা চালানো হচ্ছিল। তখন ভিডিওগুলোর মূল বার্তা ছিল নির্বাচন, জন্মদিন বা ধর্মীয় উৎসবের মতো বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ২০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান। ব্যবহারকারীদের পেজ ফলো ও শেয়ার করার শর্ত দিয়ে কমেন্টে বিকাশ বা নগদ নাম্বার চাওয়া হতো।
তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ভিডিওগুলোর ধরন বদলেছে। বর্তমানে সরাসরি অর্থ সহায়তার পাশাপাশি সরকারি বা দলীয় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ভিডিওগুলোতে তারেক রহমানের পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো ব্যক্তিদের এআই চরিত্রও ব্যবহার করা হচ্ছে।
ব্যবহারকারীরা সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বার প্রদান করছে, যা তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা ক্যাসপারস্কি (Kaspersky)-এর তথ্যমতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাম, ফোন নম্বর বা ঠিকানার মতো ব্যক্তিগত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। অপরাধীরা এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির একটি ভার্চুয়াল প্রোফাইল তৈরি করে। এরপর তারা সরাসরি ফোনে বা মেসেজে যোগাযোগ করে নিজেদের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করে।
যেহেতু প্রতারকের কাছে ওই ব্যক্তির নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই থাকে, তাই সাধারণ ব্যবহারকারীরা এই ধরণের পরিচয়কে সত্য বলে ধরে নেন। মনস্তাত্ত্বিক কারসাজির এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে অপরাধীরা খুব সহজেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন বা ওটিপি হাতিয়ে নেয়। এভাবে একটি সাধারণ ফোন নম্বর প্রকাশের মাধ্যমেই কোনো ব্যক্তি আর্থিক জালিয়াতি বা পরিচয় চুরির (Identity Theft) শিকার হতে পারেন।