ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক
ডিপফেক: তরুণেরা যেভাবে ভুল ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়তে পারে
This article is more than 2 months old

ডিপফেক: তরুণেরা যেভাবে ভুল ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়তে পারে

ডিসমিসল্যাব
অফিসিয়াল ডেস্ক

ডিপফেকের মাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া ও অপতথ্য আগামী দুই বছরে বিশ্বের সামনে গুরুতর স্বল্পমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করবে বলে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৪ সালের বৈশ্বিক ঝুঁকি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে
বিশেষজ্ঞ ও জনসাধারণের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে পরামর্শ করার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে একই রকম উপলব্ধি শেয়ার করেছে কুইবেকের ইনোভেশন কাউন্সিল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সম্প্রতি জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে অতি-বাস্তব বানোয়াট তথ্য তৈরি করা হয় ডিজিটাল প্রতারণার মাধ্যমে। এটি এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিস্ময়ই নয়, বরং সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। 

শুধুমাত্র প্রযুক্তি ও আইন দিয়ে কার্যকরভাবে ডিপফেক মোকাবেলায় যে ফাঁকফোঁকড় থেকে যায়– তা পূরণের জন্য আমি ও আমার দল একটি গবেষণা প্রকল্প চালু করেছি। যেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধানের দিকে: শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের হস্তক্ষেপ। 

শুধু প্রযুক্তিগত সমাধান যথেষ্ট নয়

ডিপফেক শনাক্তকরণ টুলগুলোর চলমান বিকাশ সত্ত্বেও, এই প্রযুক্তিগত সমাধানগুলো ডিপফেক অ্যালগরিদমের দ্রুত বাড়তে থাকা ক্ষমতাগুলোকে ধরার দৌড়ে পেরে উঠছে না।

সরকারআইনি ব্যবস্থাগুলো ডিজিটাল প্রতারণার এই দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে।

তাই এই আসন্ন হুমকি মোকাবেলায় তরুণদের প্রস্তুত করার জন্য আরও গুরুতর, আগ্রাসী ও কৌশলগত পদ্ধতি অবলম্বনের ক্ষেত্রে জরুরী হয়ে পড়েছে এ সংক্রান্ত শিক্ষা।

রাজনৈতিক অপতথ্যের উদ্বেগ

এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মেরুকরণের আশঙ্কা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক

আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় তিন বিলিয়ন মানুষ ভোট দেবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।

অপতথ্যের প্রচারণা নবনির্বাচিত সরকারের বৈধতা হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। 

ফিলিস্তিনি আমেরিকান সুপারমডেল বেলা হাদিদের মতো অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ডিপফেক ব্যবহার করা হয়েছে মিথ্যা রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য। যেগুলো দেখায় যে, জনমত প্রভাবিত করা বা মিথ্যা রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরির ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজে লাগানো যায়। 

গ্রেটা থুনবার্গ “ভেগান গ্রেনেডের” পক্ষে কথা বলছেন– এমন একটি ডিপফেক ভিডিও দেখায় যে, কীভাবে এই প্রযুক্তি অসাধু উপায়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মেটা যে সেলিব্রেটির মতো দেখতে এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট উন্মোচন করেছে– সেটিরও অপব্যবহার হতে পারে এবং অপতথ্য ছড়ানো হতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আর্থিক জালিয়াতি, পর্নোগ্রাফিক ক্ষতি

ডিপফেক ভিডিওগুলোকে যে আর্থিক জালিয়াতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

জনপ্রিয় ইউটিউবার মিস্টারবিস্টকে নকল করে টিকটকে একটি ডিপফেক প্রতারণা চালানো হয়েছিল, যেখানে দেখা যায়: তিনি মিথ্যাভাবে একটি আইফোন ১৫ উপহারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে করা হয়েছিল আর্থিক প্রতারণা।

এই ঘটনাগুলো অত্যাধুনিক এআই-চালিত সূক্ষ্ণ জালিয়াতির সামনে মানুষের দুর্বলতাকে তুলে ধরে। যেগুলো পরিচালিত হয়েছে সব বয়সী মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে।

কম বয়সী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একইভাবে একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে ডিপফেক পর্নোগ্রাফি, যেখানে অনুমতি ছাড়াই কোনো ব্যক্তির মুখ অন্য কারো মুখের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়। টেইলর সুইফটের এমনই কিছু যৌনতাপূর্ণ ডিপফেক ছবি প্ল্যাটফর্মগুলো সরিয়ে নেওয়ার আগেই দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে৷ যেখানে একটি ছবি দেখা হয়েছে সাড়ে চার কোটিরও বেশিবার।

নীতিমালা ও  প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি

গুগলের পদক্ষেপ অনুসরণ করে বর্তমানে মেটাও তাদের নীতিমালায় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনদাতাদের বিজ্ঞাপনে যেকোনো এআই ম্যানিপুলেশনের তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য করে।

রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পিএইচডি শিক্ষার্থী নিল ঝাং উন্নত অ্যালগরিদম এবং ওয়াটারমার্কিং কৌশলসহ অডিও ডিপফেকগুলোর জন্য শনাক্তকরণ টুল তৈরি করছে৷

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়ন করেছে: ২০২৩ ডিপফেক অ্যাকাউন্টিবিলিটি অ্যাক্ট, এআই অপব্যবহারের হাত থেকে রক্ষার জন্য নো এআই ফ্রড অ্যাক্ট এবং পর্নোগ্রাফিক ডিপফেকের জন্য প্রিভেন্টিং ডিপফেকস অব ইনটিমেট ইমেজেস অ্যাক্ট।  

কানাডায় আইনপ্রণেতারা বিল সি-২৭ এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ডেটা অ্যাক্ট (এআইডিএ) প্রস্তাব করেছেন, যেগুলো এআইয়ের স্বচ্ছতা এবং ডেটা প্রাইভেসির ওপর জোর দেয়।

যুক্তরাজ্যও তৈরি করেছে অনলাইন সেফটি বিল। ইইউ সম্প্রতি এআই আইনকে ঘিরে একটি অস্থায়ী চুক্তি ঘোষণা করেছে; ইইউ-এর এআই দায়বদ্ধতার নির্দেশিকা বৃহত্তর অনলাইন নিরাপত্তা এবং এআই নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে।

ভারত সরকারও ডিপফেককে লক্ষ্য করে নতুন আইনের খসড়া তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

এই পদক্ষেপগুলো ডিপফেকের ক্ষতিকারক প্রভাব রোধে ক্রমবর্ধমান বিশ্বব্যাপী প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে৷ তবুও এই প্রচেষ্টাগুলো ডিপফেকের বিস্তার বন্ধ বা রোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

তরুণদের সঙ্গে করা গবেষণা

সামাজিক বিজ্ঞান এবং মানবিক গবেষণা কাউন্সিল (এসএসএইচআরসি) এবং কানাডিয়ান হেরিটেজের অর্থায়নে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আমার পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে: কীভাবে ডিপফেক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ক্রমবর্ধমান অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভূমিকা রাখতে পারে তরুণদের ক্ষমতায়ন।

তরুণেরা কীভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ডিপফেকের প্রভাব বিবেচনা করে এবং ডিজিটাল জগতে কীভাবে নিজেদের জ্ঞান তৈরি করে– সেদিকে মনোযোগ দিয়েছিল আমাদের গবেষণা। অপতথ্য কার্যকরভাবে মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা ও ইচ্ছাও আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। 

গবেষণাটির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের, যেখানে তারা হাতেকলমে বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছে, সাক্ষাৎকার দিয়েছে এবং ফোকাস গ্রুপ আলোচনা করেছে।

অংশগ্রহণকারীরা ডিপফেক তৈরি করেছে এটি বোঝার জন্য যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার কতটা সহজলভ্য এবং এটি কতভাবে অপব্যবহার করা যায়। কত সহজে ডিপফেক তৈরি করা যায়– তা উপলব্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে এই অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষা।

অংশগ্রহণকারীরা প্রাথমিকভাবে ডিপফেকগুলোকে ডিজিটাল জগতের একটি অনিয়ন্ত্রিত এবং অনিবার্য অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছিল।

তবে অংশগ্রহণ ও আলোচনার মাধ্যমে তারা ডিপফেকের পরোক্ষ দর্শক থেকে এটির গুরুতর হুমকি সংক্রান্ত গভীর উপলব্ধির দিকে চলে যায়। এবং একইসঙ্গে, তাদের মধ্যে ডিপফেকের বিস্তার রোধের দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। তারা এগুলো মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়।

শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট পদক্ষেপের জন্য কিছু সুপারিশও তুলে ধরে, যার মধ্যে ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তরুনদের সক্ষম করে তোলা এবং এটি বোঝাতে সহায়তা করা যে, তাদের পদক্ষেপ একটি পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিল: 

  • সমাজে অপতথ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে শেখানো;
  • সামাজিক নিয়মনীতি সম্পর্কে তরুনদের নিজেদের ভাবনা বা চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো জায়গা করে দেওয়া, তাদেরকে সোশ্যাল মিডিয়ার নীতিমালা সম্পর্কে জানানো এবং অনুমোদিত ও নিষিদ্ধ কনটেন্টের রূপরেখা দেওয়া;
  • প্রযুক্তির পেছনে থাকা বিষয়গুলো জানানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ডিপফেক শনাক্তের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া; 
  • অপতথ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকার পাশাপাশি অর্থবহ বিষয়গুলোতে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা এবং কার্যকরীভাবে অপতথ্য মোকাবিলার নির্দেশনা দেওয়া।

প্রয়োজন বহুমুখী কৌশল

আমাদের গবেষণা এবং অংশগ্রহণকারীদের সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা ডিপফেকের বিস্তার মোকাবেলা করার জন্য কিছু বহুমুখী কৌশল প্রস্তাব করেছি।

সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ডিপফেক বিষয়ক শিক্ষাকে পাঠক্রমে অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন। ডিজিটাল জগতে ক্ষতিকর ডিপফেকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুবকদের সক্রিয় হতে এবং অংশগ্রহণ করতে উৎসাহ দিতে হবে। একইসঙ্গে তাদের নিরাপদ রাখতে হবে এবং এ বিষয়ে জানাবোঝা বাড়াতে হবে। 

আমরা হাতে-কলমে সহযোগিতামূলক শিক্ষার অভিজ্ঞতার গুরুত্বের ওপর জোর দেই। আমরা একটি আন্তঃবিষয়ক শিক্ষাগত পদ্ধতির পক্ষেও কথা বলি, যেটি ডিপফেকের প্রভাবগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝে ওঠার জন্য প্রযুক্তি, মনোবিজ্ঞান, মিডিয়া অধ্যয়ন এবং নীতিশাস্ত্রকে এক জায়গায় আনবে।

মানব উপাদান

আমাদের গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির উপর জোর দেয়: মানব উপাদান, বিশেষ করে শিক্ষার ভূমিকা ডিপফেকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অপরিহার্য। আমরা শুধুমাত্র প্রযুক্তি এবং আইনি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে পারি না।

শুধু তরুণ প্রজন্ম নয়, আমাদের সমাজের প্রতিটি সদস্যকে অপতথ্য বিশ্লেষণ ও চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো করে তৈরি করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি ডিজিটালি শিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেটি ডিপফেকের প্রতারণামূলক ক্ষমতাকে রুখে দিতে পারবে। 

এটি করার জন্য, আমাদের মানুষকে বোঝাতে হবে যে, ডিজিটাল জগতের বিশুদ্ধতা রক্ষায় প্রতিটি মানুষের ভূমিকা এবং দায়িত্ব রয়েছে।

নাদিয়া নাফি-র এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। বাংলায় অনুবাদ করেছেন তৌহিদুল ইসলাম রাসো।

আরো কিছু লেখা