তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও

বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

“ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা প্রয়োজন মতো এসে বায়তুল মোকাররমে পূজা দিতে পারবে…”— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের ১০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও ক্লিপ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ১২ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেত্রী পাপিয়াকে বলতে শোনা যায়, “শরীরের জন্য তামাক বড়ই ক্ষতিকর, আর ধর্মের জন্য ইসলাম বড়ই ক্ষতিকর”। অন্যদিকে, ৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে স্থানীয় পর্যায়ের বিএনপি নেতা মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসকে বলতে শোনা যায়, “রোজা, নামাজ কিচ্ছু লাগবে না। ধানের শীষে ভোট দিলেই বেহেশতে যাইতে পারবেন।”

প্রথম ভিডিওটি প্রায় আট লাখবার দেখা হয়েছে। দ্বিতীয় ভিডিওর মোট এনগেজমেন্ট ছিল ৩০ হাজারের বেশি। আর মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসের ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১২ লাখেরও বেশিবার। ভিডিওগুলোর বক্তারা প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রতিটি ভিডিওর দৈর্ঘ্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওগুলোতে বক্তব্য বিকৃত বা প্রযুক্তিগতভাবে কোনো পরিবর্তন (ডিপফেক) করা হয়নি। তবে মূল ভিডিওর পূর্ণ বক্তব্যের এমন অংশ বেছে নেওয়া হয়েছে, যেন বক্তব্যের অর্থ ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওর ক্যাপশনেই বক্তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়েছে। মন্তব্যে অন্য ব্যবহারকারীরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। সেখানে উঠে আসছে বক্তাদের বিরুদ্ধে ‘নাস্তিক’, ‘কাফির’, ‘মুরতাদ’, ‘ধর্মব্যবসায়ী’র মতো বিভিন্ন আক্রমণাত্মক মন্তব্য। 

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য খণ্ডিত করে ধর্মীয় আঙ্গিকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপনের এমন পাঁচটি ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে ডিসমিসল্যাব। একই সঙ্গে এসব ভিডিও কারা ছড়াচ্ছে তাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও এসব ভিডিও ছড়াচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমেও এ ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বক্তব্য বা উদ্ধৃতি বাস্তব হলেও তা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করার কৌশল হলো ডিকনটেক্সচুয়ালাইজেশন বা প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নকরণ। এতে বক্তব্যের অর্থ ও উদ্দেশ্য বদলে যায়। তারা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনসাধারণের আবেগ প্রভাবিত করার শক্তিশালী মাধ্যম ধর্ম। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কাউকে অভিযুক্ত করা গেলে তা দ্রুত বড় ধরনের বিতর্কে পরিণত হয়। আর নির্বাচনের সময় এই কৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন পক্ষ। নিচে সম্প্রতি ছড়ানো এমন কয়েকটি ভিডিওর কেস স্টাডি তুলে ধরা হলো:

কেস স্টাডি ১

মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবিরের বক্তব্যের একটি অংশ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয়, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট না দিলে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দেশে থাকতে দেওয়া হবে না- এমন হুমকি দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, বাঁশেরকেল্লা পেজসহ মিডিয়ার নামে খোলা কিছু ফেসবুক পেজেও (, , ) ভিডিওটি ছড়াতে দেখা যায়। এরকম একটি পোস্টের কমেন্টে একজন মন্তব্য করেন, “এই লোকটাকে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। সংখ্যালঘুদের হুমকির অভিযোগে।” আরেকজন বলেন, “এই লোকটার বিরুদ্ধে কি এখনো হয়েছে?? যদি জামাতের ব্যক্তি হত তাহলে তো এত সময় সরকারের ঘরে ঝড় উঠত, তার বিরুদ্ধে কেন গ্রেফতার করানো হচ্ছে না??”

যাচাইয়ে দেখা যায়, সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে ভিডিওটি ভিন্ন দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

ছড়িয়ে পড়া ২৮ সেকেন্ডের ভিডিওটি গত ২ জানুয়ারি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুড়ী ইউনিয়নে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে আয়োজিত একটি সভায় ধারণ করা হয়। ছড়ানো ভিডিওতে জিন্নাহ কবিরকে বলতে শোনা যায়, “আপনারা যদি আগামী নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট না দেন… আপনারা কেউ এই বাংলার মাটিতে বসবাস করতে পারবেন না; এই বাংলার কোনো স্বাধীনতা থাকবে না।”

বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও
এস এ জিন্নাহ কবিরের মূল বক্তব্যের (ডানে) কিছু অংশ (বামে) বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে এস এ জিন্নাহ কবিরের নামে খোলা একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে তার প্রায় আট মিনিটের সম্পূর্ণ বক্তব্যের ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে তিনি ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন:

“নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ থাকত, আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। আমাদের এই স্বাধীনতা নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকত না। বিএনপি আছে, আওয়ামী লীগ নেই। বিএনপি কার সাথে প্রতিযোগিতা করছে, সে দলটি কে—আপনারাও জানেন, আমরাও জানি। জামায়াতে ইসলাম দাঁড়িপাল্লা নিয়ে আজকে বিএনপির সঙ্গে লড়াই করবে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি। এই জামায়াতে ইসলাম ৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে বাঙালিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধরে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্যাম্পে হস্তান্তর করেছিল।”

এই বক্তব্যের পরপরই তিনি জামায়াত ক্ষমতায় এলে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে গিয়ে ওই মন্তব্য করেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেক্ষাপট ছাড়াই কেটে প্রচার করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হুমকি দেওয়ার প্রমাণ নয়, বরং জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সমালোচনার অংশ, যা প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

কেস স্টাডি ২

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক হারুনুর রশিদ হারুনের সহধর্মিণী রৌশন আরা শিরিনের ৯ সেকেন্ডের বক্তব্যের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। ভিডিওটিতে তাকে বলতে শোনা যায়, “কখনোই আমরা ধর্মকে মূল্যায়ন করব না, আমরা মানুষকে মূল্যায়ন করব। আমরা কখনো ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।” 

ভিডিওটি শেয়ার দিয়ে একজন লেখেন, “তোমাদের মতো  নাস্তিক ভন্ডদের সমর্থন করবে না বাংলাদেশের মানুষ”। আরেকজন লেখেন, “ধর্ম নিয়ে কটুক্তি বিএনপি নেত্রীর”। “নাউজুবিল্লাহ, কখনোই আমরা ধর্মকে মূল্যায়ন করব না।” জাহিদ নামের এক ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর নিজের ভিডিওর সঙ্গে ভিডিওটি জুড়ে দিয়ে লেখেন, “নাউজুবিল্লাহ, কখনোই আমরা ধর্মকে মূল্যায়ন করব না।” ভিডিওটির এনগেজমেন্ট ১০ হাজারের বেশি। পোস্টগুলোর মন্তব্যে তাকে ‘নাস্তিক’, ‘ভণ্ড’ ইত্যাদি বলে আক্রমণও করা হয়। বক্তব্যটি নিয়ে বেশকিছু ফটোকার্ডও ছড়াতে দেখা যায়। 

যাচাইয়ে দেখা যায়, গত ২৯ নভেম্বর রামগঞ্জে অনুষ্ঠিত মহিলা দলের সমাবেশ এবং খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য দোয়ার অনুষ্ঠানে তিনি এই বক্তব্য রাখেন। 

লক্ষ্মীপুর টাইমস নামের একটি ফেসবুকে পেজে তার আড়াই মিনিটের একটি বক্তব্য পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলেন, বিএনপি কখনোই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা ধর্মীয় বিভাজনে বিশ্বাস করে না এবং ক্ষমতায় এলে সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বিএনপি ক্ষমতায় আসলে পরে সকল রকম সকল জাতির গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করবে।”

বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও
বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা (বামে) এবং মূল বক্তব্যের (ডানে) ভিডিও পোস্টের স্ক্রিনশট।

পূর্ণ বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, জামায়াত বরাবরই ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করে এবং ভোটারদের সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি বলেন, “আমরা কখনো ধর্মকে মূল্যায়ন করব না, আমরা মানুষকে মূল্যায়ন করব”—অর্থাৎ তিনি ধর্মবিহীন সমাজের কথা বলেননি, বরং জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনার প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, মানুষ হিসেবে সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখার কথা বোঝাতে এই বক্তব্য দেন।  

কেস স্টাডি–৩

গত ২২ জানুয়ারি বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রানিহাটি ইউনিয়নের কৃষ্ণ গোবিন্দপুর কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া। ওই বক্তব্যের ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ (, ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, “শরীরের জন্য তামাক বড়ই ক্ষতিকর, আর ধর্মের জন্য ইসলাম বড়ই ক্ষতিকর।”

বক্তব্যের এই অংশটি ছড়িয়ে দাবি করা হয়, বিএনপি নেত্রী ইসলামকে তামাকের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং একে ইসলামবিরোধী ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

যাচাইয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির ইউটিউব চ্যানেলে “তামাক যেমন দেহের জন্য ক্ষতিকর, জামায়াত তেমন ইসলামের জন্য ক্ষতিকর: বিএনপি নেত্রী পাপিয়া” শিরোনামে একই সভায় দেওয়া তার প্রায় তিন মিনিটের বক্তব্য পাওয়া যায়।

পূর্ণ বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পাপিয়ার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটহীন অংশ। বক্তব্যে তিনি ইসলামকে নয়, বরং রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামের সমালোচনা করতে গিয়ে এই তুলনাটি ব্যবহার করেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আজকে একটা কথা বলতে চাই। যে ধর্মের জন্য ইসলাম বড়ই ক্ষতিকর। আর কাঠের জন্য উইপোকা খারাপ জিনিস।’

বক্তব্যে ধর্মের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “দোজখ বেহেশত আল্লাহর সৃষ্টি, পাব আমরা আমাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, কর্মকাণ্ডের হিসাব করবে মহান সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামিন। বিএনপি যখন ক্ষমতায় এসেছে সংবিধানে জিয়াউর রহমান বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লিখেছে। আল্লাহর প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাস রেখেছে। আলম ওলামা থেকে শুরু করে সমস্ত ধর্মীয় চিন্তাবিদেরা ইমাম মুয়াজলিমরা শান্তিতে বাংলাদেশে বসবাস করে।”

বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও
প্রেক্ষাপট ছাড়া প্রচার করা (বামে) এবং মূল বক্তব্যের (ডানে) ভিডিওর স্ক্রিনশট।

এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের নেতাকর্মীরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বিশেষ করে নারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এই প্রসঙ্গেই তিনি পুনরায় বলেন, “তামাক যেমন দেহের জন্য ক্ষতিকর, জামায়াত তেমন ইসলামের জন্য ক্ষতিকর।”

অর্থাৎ, উক্ত সভায় বিএনপি নেত্রী পাপিয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামের সমালোচনা করলেও বক্তব্যের একটি অংশ প্রেক্ষাপট ছাড়া প্রচার করার ফলে সেটিকে ইসলামবিরোধী মন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর।

কেস স্টাডি-৪ 

ফেসবুকে বিএনপি নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের একটি ভিডিও (,) ছড়িয়ে পড়ে সম্প্রতি। তাকে বলতে শোনা যায়, “ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে নামাজ পড়তে পারবে এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা প্রয়োজন মতো  এসে বায়তুল মোকাররমে পুজো দিতে পারবে।”

যাচাইয়ে দেখা যায়, গত ১৬ জানুয়ারি শেরে বাংলা নগরে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যান এই বিএনপি নেতা। সেখানে গিয়ে তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখেন। তবে এটি তার পূর্ণ বক্তব্য নয়। দৈনিক সমকালের ফেসবুক পেজে তার তিন মিনিটের বেশি সময়ের বক্তব্য থেকে ১০ সেকেন্ডের অংশটি কেটে নেওয়া হয়।

পুরো বক্তব্যের ফুটেজটিতে তিনি বলেন, “এরা সুযোগ পেলে এমনও কথা বলবে, এমনও ফতোয়া দিবে যে মুসল্লিরা প্রয়োজন মতো ওই যে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে নামাজ পড়তে পারবে এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা প্রয়োজন মতো এসে বায়তুল মোকাররমে এসে পূজা দিতে পারবে। এরা ক্ষমতায় আসার জন্য এরকম উদ্ভট উদ্ভট নানা রকম ফতোয়া দিবে। এদেশের জনগণ, ধর্মপ্রাণ জনগণ, এদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলে তাদের এই ধর্ম ব্যবসায়ীদের এই প্রচেষ্টা ইনশাল্লাহ ব্যালেটের মাধ্যমেই প্রতিহত করবে।”

বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও
বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা (বামে) এবং মূল বক্তব্যের (ডানে) ভিডিও পোস্টের স্ক্রিনশট।

অর্থাৎ, তিনি একটি রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে সমালোচনা করেন। কিন্তু তার বক্তব্যটির পুরো অংশ প্রচার না করে একটি নির্দিষ্ট অংশ কেটে নিয়ে তার সঙ্গে বিভ্রান্তিকর শিরোনাম জুড়ে দেওয়ায় তৈরি হয় বিভ্রান্তি। 

কেস স্টাডি ৫

নাঙ্গলকোট উপজেলার বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসের ৬ সেকেন্ডের একটি বক্তব্য (, ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “রোজা, নামাজ, হজ, যাকাত কিচ্ছু লাগবে না, ধানের শীষে ভোট দিলেই বেহেশতে যাইতে পারবেন।”

এই বক্তব্যের অংশটি ছড়িয়ে দাবি করা হয়, তিনি ভোটকে ধর্মীয় ইবাদতের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় মন্তব্য করেছেন।

যাচাইয়ে “নিউজ ২৪ নাঙ্গলকোট” নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ১৭ জানুয়ারি পোস্ট করা তার বক্তব্যের ২৮ সেকেন্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে তিনি ওই মন্তব্যটি উদ্ধৃত করে সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন, “তাদের বড় এক নেতা বক্তব্য রাখছে কী? ‘রোজা, নামাজ, হজ, যাকাত কিচ্ছু লাগবে না, ধানের শীষে ভোট দিলেই বেহেশতে যাইতে পারবেন।’ আরে—দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলেই বেহেশতে যাইতে পারবেন। নাউজুবিল্লাহ বলেন সবাই। এই কথাটা যারা বলে, এরাও জাহান্নামি। আর যদি বিশ্বাস করে, তারাও জাহান্নামি হবে।”

বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও
মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসের খণ্ডিত (বামে) এবং পুরো বক্তব্য প্রদানের ভিডিওর স্ক্রিনশট।

এখানে তিনি প্রথমে ভুলবশত “ধানের শীষে ভোট দিলেই বেহেশতে যাইতে পারবেন” বললেও তারপরেই বলেছেন, “দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলেই বেহেশতে যাইতে পারবেন”। কিন্তু তার পুরো বক্তব্যের একটি খণ্ডিত অংশ প্রেক্ষাপট ছাড়া প্রচার করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন মনে হয় তিনি আসলেই বিএনপিতে ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়ার কথা বলেছেন, যা বিভ্রান্তিকর।

নির্বাচনে প্রভাব রাখতে পারে খণ্ডিত বক্তব্য প্রচার

নির্বাচনের আগে এধরনের ভিডিও ছড়ানোয় শুধু প্রার্থীদের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, একইসঙ্গে ভোটারদের সঙ্গেও প্রতারণা করা হচ্ছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের গণমাধ্যম অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সুমন রহমান। তিনি বলেন, “স্বাধীনভাবে ভোট দান করাটা একজন ভোটারের অধিকার। আমি ভালোভাবে জেনে ভোট দেব। আপনি যখন আমাকে ভুল তথ্য দিচ্ছেন, তখন আমি একজন প্রার্থীকে সেই ভিত্তিতে খারাপ জানলাম। তখন এটা আমার ভোটকে প্রভাবিত করবে।”

পরিকল্পিতভাবে কাজটি করা হয়েছে দাবি করে অপপ্রচারের শিকার মানিকগঞ্জ-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবির বলেন, “আমার বক্তব্য ছিল সাড়ে সাত মিনিট। উনারা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের বক্তব্যটা প্রকাশ করেছেন। পরিকল্পিতভাবে বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার নিশ্চয়ই আইনের বহির্ভূত। যে কারণে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি, আমি মামলা করেছি, জিডিও করেছি।” তিনি আরও বলেন, “একটা সম্প্রদায়ের ভোটকে আমার থেকে বিমুখ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই কাজটা তারা চালিয়েছে।”

ড. সুমন রহমান বলেন, “শুধু নির্বাচনের আগে না, এটা সবসময় ছড়ায়। এটাকে আমরা বলি ডিকন্টেক্সচুয়ালাইজেশন। ভুল তথ্য, অপতথ্য ছড়ানোর বড় টেকনিক ডিন্টেক্সচুয়ালাইজ করা। অর্থাৎ যে কথাটা বলা হচ্ছে বা কোট করা হচ্ছে বা ক্লেইম করা হচ্ছে এটা সত্য, কিন্তু এটা আসলে অন্য প্রেক্ষিতে অন্যভাবে বলা হয়েছিল। যখন এটাকে কেটে ফেলা হয় তখন এটার প্রেক্ষিত পরিবর্তন হয়ে যায়, অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়”। 

বর্তমানে প্রোপাগান্ডা ওয়ারফেয়ার হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নির্বাচনের সময় এখন প্রার্থীদের জনসভার প্রত্যেকটা বক্তব্য, প্রত্যেকটা মুভমেন্ট নোট করা হচ্ছে, রেকর্ড করা হচ্ছে। খুব ভালো পরিমাণ ইনভেস্টমেন্ট করা হচ্ছে নির্বাচনকালীন প্রচারণায়। এখন যেহেতু নির্বাচনে কিছুদিন আছে,  প্রচারণাকারীরা যেনতেন প্রকারে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। প্রোপাগান্ডা ওয়ারফেয়ার চলছে। অপতথ্য এই প্রোপাগান্ডার পার্ট হয়ে গেছে। সাধারণ ইনফরমেশন ইকোসিস্টেমেই মিসইনফরমেশন ঢুকে পড়ে আর এখন তো প্রোপাগান্ডা। প্রোপাগান্ডার কাজই হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করা।”

প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নকরণের ক্ষেত্রে অনেক সময় সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে জনসাধারণের সেন্টিমেন্ট প্লে করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে ধর্ম। অর্থাৎ যদি প্রমাণ করা যায় যে কেউ ধর্মকে আঘাত করেছে, তাহলে এটা একটা বড় রকমের ঘটনা হয়। আর ধর্ম তো আমাদের জন্য খুবই সাধারণ ডিসকোর্স। যে কারণে আমরা ধর্ম নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলে ফেলি। শুধু ধর্মীয় দলগুলো করে তা না। প্রার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বী সবাই নানানভাবে ধর্মকে হাজির করে। এই জিনিসগুলো প্রচার করতে পারলে পাবলিক সেন্টিমেন্টকে চালনা করা খুব সহজ হয়।”

আরো কিছু লেখা