আবরার ইফাজ

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ড. অমর্ত্য সেনের মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়িয়ে যে বার্তা দিলেন তমাসো দেবেন্দেত্তি 
This article is more than 8 months old

ড. অমর্ত্য সেনের মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়িয়ে যে বার্তা দিলেন তমাসো দেবেন্দেত্তি 

আবরার ইফাজ

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

“একটি দুঃসংবাদ। আমার প্রিয় অধ্যাপক অমর্ত্য সেন কিছুক্ষণ আগে মারা গিয়েছেন। ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না”- ক্লডিয়া গোল্ডিন নামের এক্স (পূর্ববর্তী টুইটার) প্রোফাইল থেকে গত ১০ অক্টোবর এই পোস্টটি খুব দ্রুত গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। 

এর এক ঘন্টার মধ্যে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেনের মেয়ে নন্দনা দেব সেন তার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে জানান, তার বাবা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং তারা খুব সুন্দর একটি ছুটি কাটিয়েছেন। কিন্তু ততক্ষণে ভুয়া খবরটি দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এক্স থেকে মূলধারার গণমাধ্যম গড়িয়ে সামাজিক মাধ্যমেও রীতিমত আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়।

এই খবর কীভাবে ছড়ালো তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে ডিসমিসল্যাব খুঁজে পায় তমাসো দেবেন্দেত্তি নামের এক ইতালীয় সাংবাদিককে। তার অতীত কর্ম, বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন টুইটার পোস্ট বিশ্লেষণ করে, সামাজিক মাধ্যমের যুগে গণমাধ্যমের ভূমিকা ও সত্য-মিথ্যার বিস্তার নিয়ে একটি গভীর উপলব্ধির সন্ধান পাওয়া যায়।

খবরটি যেভাবে ছড়াল

আগেই বলা হয়েছে, এই খবরটি প্রথম আসে ক্লডিয়া গোল্ডিন নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে। ঠিক তার আগের দিন, অক্টোবর ৯ তারিখে, দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস ক্লডিয়া গোল্ডিনকে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। নোবেল প্রাইজের অফিসিয়াল এক্স প্রোফাইল থেকে গোল্ডিনকে মেনশন করে একটি পোস্টও দেওয়া হয়। 

ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম (, ) কথিত গোল্ডিনের এক্স পোস্টের সূত্র ধরে অমর্ত্য সেনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে। বাংলাদেশের বেশ কিছু গণমাধ্যম আবার পিটিআই ও এনডিটিভির বরাত দিয়ে দ্রুত এই ভুয়া খবরটি (, , ) তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করে। কোন কোন গণমাধ্যম সবার আগে খবর জানানোর তাগিদে তাদের সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টে ফটোকার্ড প্রকাশ করে। একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল তাদের স্ক্রলে খবরটি দেখায়। আসল খবর জানাজানির পর প্রতিটি বার্তাকক্ষই অমর্ত্য সেনের মৃত্যুর খবর সরিয়ে নেয় () বা বদলে ফেলে (, )।

অর্থনীতির এক নোবেল বিজয়ী, একই শাখার আরেক নোবেল বিজয়ীর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন – খবরটি অনেকেই দেখেই বিশ্বাস করে নেন। এবং এক ঘন্টার মধ্যে, দুই হাজারের বেশি ব্যবহারকারী মৃত্যুর ভুয়া পোস্টটি শেয়ার করেন এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ তাতে রিঅ্যাক্ট করে সম্পৃক্ত হন। 

ক্লডিয়া গোল্ডিনের আসল এক্স অ্যাকাউন্টের হ্যান্ডেল হলো @PikaGoldin, আর ভুয়া অ্যাকাউন্টটির হ্যান্ডেল ছিল @profCGoldin; কিন্তু অনেকেই সেটি আর যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেননি। 

লাইভ মিন্ট বলছে, এই ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করা হয় ২০২৩-এর মে মাসে এবং এই প্রোফাইল ক্লডিয়া গোল্ডিনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অবশ্য নন্দনা সেন প্রকৃত খবর জানিয়ে পোস্ট করার কিছুক্ষণ পর খোদ ভুয়া অ্যাকাউন্টটি থেকে জানানো হয় যে, এই প্রোফাইল তমাসো দেবেন্দেত্তি নামের একজন ইতালীয় সাংবাদিকের তৈরি এবং মিথ্যা সংবাদটিও তারই ছড়ানো। তারও কিছুক্ষণ পরে ভুয়া প্রোফাইলটি একেবারেই মুছে দেওয়া হয়।

কিন্তু নোবেল পাওয়ার কয়েক মাস আগেই ক্লডিয়া গোল্ডিনের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা এবং নোবেল পাওয়ার পরপরই সেটি দিয়ে আরেক অর্থনীতিবিদের নামে ভুয়া খবর ছড়ানো কী কাকতালীয়? ২০১২ সালের মার্চে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে তমাসোর এই কৌশল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়: তিনি সাধারণত যে কোনো নামে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন, পরে সেটির নাম সুবিধা মতো বদলে নেন। তিনি কিম জং উনের নামে খোলা একটি ভুয়া অ্যাকাউন্টে ক্লিক করে গার্ডিয়ানের সাংবাদিকদের দেখান, কত সহজেই সেটির নাম সোনিয়া গান্ধীতে বদলে ফেলা যায়।

তমাসো দেবেন্দেত্তি কে?

তমাসো দেবেন্দেত্তি ভুয়া সাক্ষাৎকার ও ভুয়া খবর ছড়ানোর জন্য বেশ বিখ্যাত। তিনি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতিহাস পড়ান। ৬৪ বছর বয়সী তমাসো, থাকেন রোম শহরে। তার বাবা এন্তোনিও দেবেন্দেত্তি ছিলেন কবি ও সাহিত্য সমালোচক; দাদা ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক।

অমর্ত্য সেনের আগে, এবছর ১১ সেপ্টেম্বর, তিনি স্প্যানিশ লেখক অ্যান্টোনিও মুনোজ মোলিনার মৃত্যুর ভুয়া খবর পোস্ট করেন। এই কাজেও তিনি একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম সেটি প্রচার করে। গত বছর মার্চে তিনি নোবেল বিজয়ী ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক কাজুও ইশিগুরোর মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়িয়ে আলোচিত হন। 

তমাসোর শুরুটা ছিল ভুয়া সাক্ষাৎকার প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি ইতালির বিভিন্ন রক্ষণশীল গণমাধ্যমকে ভুয়া সাক্ষাৎকার দিয়ে বোকা বানাতেন। আর্থার মিলার, জন গ্রিশাম এবং ফিলিপ রথের মতো বিখ্যাত লেখকদের কাল্পনিক সাক্ষাৎকার নিয়ে তিনি এসব গণমাধ্যমে হাজির হতেন এবং গণমাধ্যমগুলো যাচাই না করেই সেই লেখা প্রকাশ করতো।

গার্ডিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভুয়া সাক্ষাৎকারের ব্যাপারটি সামনে আসে ২০১০ সালে, ফিলিপ রথকে কোনো সাংবাদিক তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমালোচনার ব্যাপারে প্রশ্ন করার পর। ফিলিপ রথ এমন কোনো সাক্ষাৎকারের কথা অস্বীকার করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তমাসো দেবেন্দেত্তির ভুয়া সাক্ষাৎকারের বিষয়টি সামনে আসে।

এ বিষয়ে তমাসোর অবস্থান বেশ পরিস্কার। তিনি দাবি করেন, সাক্ষাৎকার ছাপানোর জন্য তিনি পত্রিকা থেকে মাত্র ২০ থেকে ৪০ ইউরো নিতেন এবং ইতালির পত্রিকাগুলো যে তাদের মতের পক্ষে গেলে কোনো তথ্যই যাচাই করে না, সেটি প্রমাণের জন্যই তিনি এই কাজ করতেন।

নিউ ইয়র্কার পত্রিকার লেখক জুডিথ থারমানকে তমাসো বলেন, “ইতালি একটি তামাশা। এখানে তথ্যের ভিত্তি হলো মিথ্যাচার।” 

বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তমাসোর একটি সাক্ষাৎকার নেন মিগেল মোরা। সাক্ষাৎকারটি স্পেনের এল পাইস পত্রিকায় প্রকাশ হয়। এই সাক্ষাৎকারে তমাসো বলেন, তিনি একজন সৎ সাংস্কৃতিক সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন যে ইতালির গণমাধ্যমে কোনো সাক্ষাৎকার ছাপাতে হলে সংস্কৃতির চেয়ে “বড়” নাম গুরুত্বপূর্ণ, তখন তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় গোরে ভিদালের ভুয়া সাক্ষাৎকার জমা দেন এবং সেগুলো ছাপানোও হয়। 

এরপর একে একে তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে সাক্ষাৎকার লিখতে থাকেন। তিনি এল পাইসকে বলেন, “আমি ইতালিতে মিথ্যার চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাকে পছন্দ করি। আমি বিশ্বাস করি যে আমি একটি নতুন ধারা আবিষ্কার করতে পেরেছি এবং আশা করছি আমার ওয়েবসাইট ও বইয়ে আরো নতুন মিথ্যাচার প্রকাশ করতে পারবো। অবশ্যই ফিলিপ রথের মুখবন্ধসহ।”

তমাসো কেন মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়ান?

গত এক দশকে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের মৃত্যুর ভুয়া সংবাদ ছড়িয়েছেন তমাসো। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ, লেখক মিলেন কুন্ডেরা, পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টসহ অনেকেই তার ছড়ানো ভুয়া সংবাদের বলি হয়েছেন।

তমাসো ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, মানুষ সামাজিক মাধ্যমকে সূত্র হিসেবে বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে; তারা বিশ্বাস করে ভুয়া সংবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সফল হয়েছে এবং এই বিশ্বাসের কারণেই মানুষ আরো প্রতারণার শিকার হচ্ছে। 

গত ৪ সেপ্টেম্বর, রোমিও পেনিয়া নামের এক গায়কের মৃত্যুর ভুয়া সংবাদ ছড়ানোর পর কাতালুনিয়া রেডিও তমাসোর একটি সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে তিনি বলেন, “আমি এই কাজটি করেছি সাংবাদিকতার বর্তমান দশার মুখোশ খুলে দিতে।” তিনি আরো বলেন, সামাজিক মাধ্যম এবং গতিই এখন সাংবাদিকতার জন্য মুখ্য বিষয়, যা বড় ধরনের ভুলের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

জিরোহেজ বলছে, ২০১২ সালে তমাসো সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়ানোর কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়। তমাসো এই ঘটনার জন্য গণমাধ্যমকেই দায়ী করেছেন, কারণ গণমাধ্যম যাচাই না করেই একটি ভুয়া প্রোফাইলের টুইটকে তথ্য হিসেবে ধরে নিয়ে সংবাদ প্রচার করেছিল। 

সাংবাদিক মারিও ভার্গাস ইয়োসা তার বই নোটস অন দ্য ডেথ অফ কালচার: এসে অন স্পেক্টেকল এন্ড সোসাইটি-তে তমাসো দেবেন্দেত্তির উক্তি দিয়ে লিখেছেন: 

”‘আমি মিথ্যা বলেছি, কিন্তু তা শুধু একটি সত্য বলার জন্য।’ কোন সত্য? আমরা যে প্রতারণাপূর্ণ সময়ে বাস করি, সেখানে কোনও অপরাধ, যদি তা মজাদার হয় এবং যথেষ্ট লোকেদের বিনোদন দেয়, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” 

আরো কিছু লেখা