নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
Fact-check reveals AI-edited personal photo falsely shared on Facebook with a fictional story claiming a woman dining with her husband and ex, raising privacy concerns.

লাইকের খোঁজে অন্যের ছবি ব্যবহার, হাস্যরসের আড়ালে গোপনীয়তা লঙ্ঘন

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

একটি সেলফিতে তিন ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে। ছবির ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, এক নারী তার স্বামী ও প্রাক্তনকে নিয়ে একসঙ্গে ডিনার করছেন। পোস্টের গল্পকে সত্য ধরে নেওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো ব্যবহারকারী সংযুক্ত ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়েও বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করছে।

গল্পটি কাল্পনিক, তবে ছবির মানুষগুলো নয়। বরং তাদের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে নেওয়া ছবি ব্যবহার করেই বলা হচ্ছে এমন বানানো গল্প। যাদের ছবি তারা জানতেও পারছেন না, কোথায় এবং কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের ছবি।

Fact-check reveals AI-edited personal photo falsely shared on Facebook with a fictional story claiming a woman dining with her husband and ex, raising privacy concerns.
ভুয়া দাবিতে ছড়ানো এআই সম্পাদিত ছবি (বামে) ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে নেওয়া আসল ছবি (ডানে)।

এ বিষয়ে একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। ব্যক্তিগত ছবি এভাবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সম্পাদিত করে প্রকাশ হচ্ছে জেনে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তারা সামাজিকভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও জানান। 

ফেসবুকে একটি পেজ থেকে গত ২১ এপ্রিল একটি ছবি পোস্ট করা হয়। এ পোস্টটির ক্যাপশনের এক অংশে লেখা হয়, “স্বামী, প্রাক্তন, আর আমার ডিনার! ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন আমার একমাত্র আদরের জামাই সোহান (কাল গেঞ্জি পড়া) কী খুশি আমাদেরকে একসাথে দেখে! ওদিকে আমার এক্স আরাফাত অফিস শেষ করে ফর্মাল জামাতেই চলে এসেছে!” (বানান অপরিবর্তিত)।

পোস্টের ছবিতে দেখা যায়, দুজন পুরুষ এবং এক নারী একটি টেবিলে বসে আছেন, টেবিলে খাবার সাজানো। ওই নারী সেলফি তুলছেন। 

উৎস যাচাই করতে ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। সূত্র খুঁজতে গেলে দেখা যায়, ছবিটি পোস্ট করা হয়েছিল একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ১৮ এপ্রিলে। ছবিটি যে প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছে, এটি তার এবং তার সহকর্মীদের ছবি। পোস্টটির ক্যাপশনেও সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়টি উল্লিখিত রয়েছে।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ছবিটি আড়াই হাজারের বেশিবার শেয়ার হয়েছে, প্রতিক্রিয়া পড়েছে ১৫ হাজারের বেশি। ছড়িয়ে পড়া ছবি এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইলের ছবিটি তুলনা করলে দুটি ছবির মধ্যে বেশ কিছু অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে করা পোস্টের ছবির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবির তিনজনের চেহারা এবং পোশাকের ধরন ও রঙে অমিল রয়েছে। তবে আশেপাশের অন্যান্য বস্তু, টেবিল, খাবার, ব্যক্তিদের জুতায় মিল রয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পাদিত কি না, তা যাচাই করতে ছবিটি গুগলের ‘সিন্থ-আইডি’ প্রযুক্তিনির্ভর একটি বিশেষায়িত শনাক্তকরণ টুলেও পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ছবিটির অধিকাংশ অংশ সিন্থ-আইডি দিয়ে বানানোর সম্ভাবনা রয়েছে। 

অর্থাৎ, একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইলের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সম্পাদিত করে ভিন্ন একটি ক্যাপশন জুড়ে দিয়ে পোস্ট করা হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ছবিটি ফেসবুকের একাধিক (, , , , , ) প্রোফাইল, পেজ এবং গ্রুপ থেকে শেয়ার করা হয়েছে। ক্যাপশনটিকে সত্য ধরে নিয়ে অনেকেই নেতিবাচক ক্যাপশন যুক্ত করে পোস্টটি শেয়ার করেছেন।

ডাক্তার রুবেল মালয়েশিয়া” নামের পেজটি পেজটি পর্যবেক্ষণ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। পেজটি থেকে এপ্রিল মাস জুড়েই একাধিক পোস্ট করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ছবি নিয়ে। এ ধরনের প্রথম পোস্টটি করা হয়েছে ১৮ এপ্রিল। এই পোস্টের ছবিতে এক ব্যক্তির কোলে একটি মেয়ে শিশু। ক্যাপশনে লেখা হয়, “স্ত্রীর পরকীয়ার ফসল কোলে যাকে দেখছেন, ও আমার মেয়ে। কিন্তু ও আমার ঔরসজাত মেয়ে নয়। আমার সাবেক স্ত্রী ও তার এক্স বয়ফ্রেন্ডের মিলনের ফসল এই সন্তান।” ক্যাপশনের শেষে লেখা হয়, “(বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে। সংযুক্ত ছবিটি রোগীর অনুমতি নিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার নতুন খোলা পেজটিতে একটা ফলো দিলে অনেক খুশি হব।)।”

Fact-check reveals AI-edited personal photo falsely shared on Facebook with a fictional story claiming a woman dining with her husband and ex, raising privacy concerns.
ভুয়া পরকীয়ার গল্পে ব্যবহৃত ছবি (বামে) ও আসল ছবি (ডানে)।

পোস্টটিতে থাকা ছবিটির প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানে দেখা যায়, হুবহু একই ছবি একজনের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে নেওয়া হয়েছে, যা ওই প্রোফাইলে পোস্ট করা হয়েছিল গত ১৭ এপ্রিল। প্রোফাইলটি যাচাইয়ে দেখা যায়, একই শিশুর একাধিক ছবি নিজ সন্তান বলে পোস্ট করা হয়েছে প্রোফাইলটি থেকে। “ডাক্তার রুবেল মালয়েশিয়া” পেজ থেকে এই ছবিটি পোস্টের ক্ষেত্রে কোনো সম্পাদনা করা হয়নি। শিশুটির মুখও ঢেকে দেওয়া হয়নি।

এ ধরনের আরও একটি পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে ছবির কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অপ্রাসঙ্গিক একটি ক্যাপশন সহকারে পোস্ট করা হয়েছে। এই পোস্টে একজন নারীর ছবি ব্যবহার করে লেখা হয়েছে, “নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট নিলাম। নার্সিং সার্টিফিকেট দেখিয়েছিল, দেখেই বুঝেছিলাম ভুয়া সার্টিফিকেট।” এই ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখা যায়, ছবিটি প্রকৃতপক্ষে এক ডাক্তারের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে নেওয়া হয়েছে। 

সম্পাদিত ছবির ব্যবহার

এই পেজ থেকে ছবি সম্পাদনা করে পোস্ট করতে প্রথম দেখা যায় ১৯ এপ্রিল। দুজন পুরুষ এবং এক নারীর ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনের এক অংশে লেখা হয়, “স্ত্রীর প্রাক্তনের সাথে জন্মদিন পালন। ছবিতে রাজিয়ার সাথেই দাড়ানো যাকে দেখা যাচ্ছে, সেটা আমি, রিয়াজ। চশমা পড়া অন্য ছেলেটা, যার দিকে রাজিয়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, আমার স্ত্রীর প্রাক্তন- শামিম।”

এ ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে “কফি হাউস” নামের একটি গ্রুপে পোস্ট করা একটি ছবি পাওয়া যায়। সেখানে চশমা পরা ব্যক্তি যাকে ছড়িয়ে পড়া ছবির ক্যাপশনে শামীম বলা হয়েছে, তিনি নিজেকে “মোহাম্মদ ইমন আহমদ” নামে পরিচয় দিয়েছেন। এবং এই ছবিতে তার সঙ্গে নারীটি এবং অন্য ব্যক্তিটি নেই। ছড়িয়ে পড়া ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পাদিত কি না তা যাচাই করতে ছবিটি গুগলের ‘সিন্থ-আইডি’ প্রযুক্তিনির্ভর একটি বিশেষায়িত শনাক্তকরণ টুলেও পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ছবিটির অধিকাংশ অংশে সিন্থ-আইডির জলছাপ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, এটি গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে সম্পাদনা করা হয়েছে।

এরকম একাধিক (,) ছবি আংশিক সম্পাদনা করে পেজটি থেকে পোস্ট করা হয়েছে। অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করে অপ্রাসঙ্গিক ক্যাপশন সহকারে পোস্টগুলো করা হচ্ছে। পোস্টগুলোর কমেন্ট যাচাই করলে দেখা যায়, অনেকেই পোস্টগুলোকে সত্য বলে ধরে নিয়েছেন, অনেকেই আবার সংশয় প্রকাশ করে জানতে চেয়েছেন, ঘটনাগুলো সত্য কিনা। 

ভুক্তভোগীরা যা বলছেন

ডাক্তার রুবেল মালয়শিয়া পেজটি থেকে যাদের ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে পোস্ট দেওয়া হয়েছে, সে প্রোফাইলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। একজন ভুক্তভোগী নিজের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এ ধরনের অবাস্তব ক্যাপশনের সঙ্গে আমার ছবি সংযুক্ত থাকায়, সামাজিক ভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি।” এভাবে তাদের ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহৃত হওয়ায় তাদের আপত্তি আছে কিনা তা জানতে চাইলে আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, “অবশ্যই আপত্তি আছে। আমার শিশু সন্তানের ছবি আমার অনুমতি ছাড়া ব্যবহৃত হচ্ছে, এছাড়া ক্যাপশনটাও বিভ্রান্তিকর।” আরেকজন ভুক্তভোগী নিজের ছবিকে এভাবে ব্যবহার হচ্ছে দেখে বিব্রত বলেও জানান।

ভুক্তভোগীরা ডিসমিসল্যাবের কাছে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত এবং কীভাবে এ পোস্টগুলো ফেসবুক থেকে সরানো যায়, এ বিষয়ে পরামর্শ চান। 

ডাক্তার রুবেল মালয়েশিয়া পেজটি

এই পেজটি তৈরি করা হয়েছে ২০২৩ সালের ১০ আগস্টে। পেজটির অ্যাবাউট সেকশনে এটিকে স্যাটায়ার বা প্যারোডি হিসেবে লেখা হয়েছে। পেজটির কিছু জায়গায় অবস্থান মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর লেখা হয়েছে, আবার কিছু জায়গায় ঢাকা, বাংলাদেশ লেখা হয়েছে। পেজটি থেকে এ ধরনের পোস্ট করার উদ্দেশ্য কী বা এভাবে অন্যদের ব্যক্তিগত ছবি পোস্ট করায় তাদের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে পেজটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, পেজটি জানায়, “সব ছবি এআই দিয়ে তৈরি।” পেজে পোস্ট করা বেশ কিছু ছবি এআই দিয়ে তৈরি না, এটি উল্লেখ করলে পেজটি থেকে আর কোনো উত্তর আসেনি। 

Fact-check reveals AI-edited personal photo falsely shared on Facebook with a fictional story claiming a woman dining with her husband and ex, raising privacy concerns.
ডাক্তার রুবেল মালয়শিয়া পেজটির বিস্তারিত।

দ্য হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক শিয়াওগে ঝাং এর গবেষণা “রিসার্চ অন দ্য ইমপ্যাক্ট অফ সোশাল মিডিয়া অন পিপলস প্রাইভেসি অ্যান্ড ইটস কাউন্টারমেজারস”-এ বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা একজন ব্যক্তির সুনাম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল সমাজে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অপব্যবহার ও প্রকাশ কেবল ব্যাপক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবই ফেলে না, বরং এটি আধুনিক সমাজে ব্যক্তিগত তথ্যের অরক্ষিত অবস্থাকেও প্রতিফলিত করে। ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার সম্পর্কে গবেষণাটিতে লেখা হয়েছে, “এই অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতারও চরম লঙ্ঘন।”

আরো কিছু লেখা