ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক
নির্বাচনের জন্য হুমকি এআই নির্মিত অপতথ্য
This article is more than 3 months old
feature

নির্বাচনের জন্য হুমকি এআই নির্মিত অপতথ্য

ডিসমিসল্যাব
অফিসিয়াল ডেস্ক

সারাবিশ্বেই নির্বাচনের আগে বহির্শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার হুমকি বাড়ছে, যার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

পরস্পরের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা দেশগুলো ২০১৬ সালে এক নতুন যুগে ঢুকে, যখন রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের প্রচারণা শুরু করে। পরবর্তী সাত বছরে একাধিক দেশ, বিশেষ করে চীন ও ইরান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের নির্বাচন প্রভাবিত করতে সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও যে এমনটি দেখা যাবে না– আপাতত তা ভাবার কোনো কারণ নেই। 

তবে এবার আরও কিছু নতুন জিনিস যুক্ত হয়েছে। যেমন, জেনারেটিভ এআই ও বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। এগুলোর মাধ্যমে যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকে শুরু করে যেকোনো ভঙ্গিতে এমনকি যেকোনো বিষয়ে দ্রুত ও সহজে অফুরন্ত টেক্সট তৈরি করা সম্ভব। একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি মনে করি, এটা এমন এক টুল যা ইন্টারনেট যুগের প্রচারণার জন্য ভীষণভাবে উপযুক্ত।

এর সবই কিন্তু বেশ নতুন। চ্যাটজিপিটি ২০২২ সালের নভেম্বরে চালু হয়েছিল। আরও শক্তিশালী জিপিটি-৪ আসে ২০২৩ সালের মার্চে। ভাষা ও ছবি বানাতে পারে এমন অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুলগুলোরও বয়স প্রায় একই রকম। এই প্রযুক্তিগুলো অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে– তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আমরা শিগগিরই সেটা জানতে পারব। 

নির্বাচনী মৌসুম

অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশেই পুরোদমে নির্বাচনের মৌসুম শুরু হচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বসবাসরত ৭১ শতাংশ মানুষ এখন থেকে আগামী বছরের শেষ নাগাদ একটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিবেন। এর মধ্যে, অক্টোবরে আর্জেন্টিনা ও পোল্যান্ড, জানুয়ারিতে তাইওয়ান, ফেব্রুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়া, এপ্রিলে ভারত, জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মেক্সিকো এবং নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ নয়টি আফ্রিকান গণতন্ত্রে ২০২৪ সালে নির্বাচন হবে। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে এখনও দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি, কিন্তু সেখানেও ২০২৪ সালে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অতীতে সামাজিক মাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্স অপারেশন পরিচালনা করা দেশগুলোর জন্য এসব নির্বাচনের অনেকগুলোই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ অনেকগুলো আফ্রিকান দেশের নির্বাচন নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে চীন। রাশিয়া সাধারণত যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, জার্মানি ও ইইউ-র নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামায়। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে সবাই সতর্ক।

এআই ইমেজ, টেক্সট ও ভিডিও জেনারেটর ইতোমধ্যেই নির্বাচন সংক্রান্ত ভুল তথ্য ছড়ানো শুরু করেছে

এই হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে শুধু বড় খেলোয়াড়দের কথা। ২০১৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টায় যুক্ত হয়েছে নতুন একটি করে দেশ। প্রথমে ছিল শুধু রাশিয়া। এরপর রাশিয়া ও চীন এবং অতি সম্প্রতি এই দেশ দুটোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান। বিদেশি প্রভাব বিস্তারের আর্থিক ব্যয় কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে আরও অনেক দেশ। চ্যাটজিপিটির মতো টুলগুলো প্রোপাগান্ডা তৈরি ও বিতরণের খরচ বহুলাংশে কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার বাজেটও এখন আছে বহু দেশের সাধ্যের মধ্যে। 

নির্বাচনে হস্তক্ষেপ

কয়েক মাস আগে আমি যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত একটি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে তারা কথা বলছিলেন ২০২৪ সালের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের বিষয়ে। সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যেমন, রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে তারা নতুন যে উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড়ের কথা তারা বলছিলেন, তা হলো “অভ্যন্তরীণ শক্তি”। এটি সরাসরিই ব্যয় হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয়।

অপতথ্যের প্রচারণা অবশ্যই নিছক কিছু কনটেন্ট তৈরির চেয়ে আরও বেশি কিছু। সবচেয়ে কঠিন পর্বটি হলো এগুলো ছড়ানো। প্রচারণা চালানোর জন্য প্রয়োজন পড়ে বেশ কিছু ভুয়া অ্যাকাউন্টের, যেখান থেকে কন্টেন্টগুলো পোস্ট করা হবে, এবং আরও কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ারের মাধ্যমে সেগুলো মূলধারায় নিয়ে যাওয়া হবে, যেন সেটি ভাইরাল করা যায়। মেটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই অ্যাকাউন্টগুলো চিহ্নিত করা ও সরিয়ে ফেলার কাজে ক্রমেই ভালো করছে। গত মাসে (আগস্ট), মেটা জানিয়েছিল যে, তারা একটি চীনা ইনফ্লুয়েন্স ক্যাম্পেইনের সঙ্গে যুক্ত সাত হাজার ৭০৪টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ৯৫৪টি ফেসবুক পেজ, ১৫টি ফেসবুক গ্রুপ এবং ১৫টি ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট সরায় এবং টিকটক, এক্স (পূর্ববর্তী টুইটার), লাইভজার্নাল ও ব্লগস্পটে আরও শতাধিক অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করেছে। কিন্তু এই ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল আরও চার বছর আগে, এআই ব্যবহার ছাড়াই অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে।

বহির্শক্তি হিসেবে রাশিয়ার অপতথ্য প্রচারণায় জড়িত থাকার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে

অপতথ্য ক্ষমতার একটি প্রতিযোগিতা। আক্রমণকারী ও প্রতিরোধকারী দুপক্ষই উন্নতি করেছে, তবে সামাজিক মাধ্যমের জগতও বদলেছে অনেক। চার বছর আগে, গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ছিল টুইটারের এবং রাজনৈতিক ভাষ্য পরিবর্তনের অন্যতম উপায় ছিল এই প্ল্যাটফর্মে চালানো প্রোপাগাণ্ডা। কলাম্বিয়া জার্নালিজমের একটি রিভিউ গবেষণায় দেখা গেছে অধিকাংশ বড় নিউজ আউটলেট বিভিন্ন রাশিয়ান টুইটকে বিপক্ষ মতের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু গণমাধ্যমের সম্পাদকরা আগে যে হারে টুইটার পড়ত, যেকেউ যেকোনো মত নিয়ে পোস্ট করত, সেই টুইটার এখন আর নেই।

অনেক প্রোপাগান্ডা আউটলেটই এখন ফেসবুক ছেড়ে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে মনোযোগ দিয়েছে, যার ফলে এগুলো শনাক্ত করা এবং সরিয়ে ফেলা আরও দুরুহ হয়ে পড়েছে। টিকটক এখন নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম যার নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে। সংক্ষিপ্ত ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ভিডিও ছড়ানোর ক্ষেত্রে এটি আরও সহায়ক। এআই ব্যবহার করে এসব ভিডিও তৈরি করাও বেশ সহজ। বর্তমানে জেনারেটিভ এআইগুলো এমন সব টুলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যেগুলো এসব কন্টেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটিও সহজ করে তুলেছে।

জেনারেটিভ এআই টুল নতুন সব কৌশলের মাধ্যমে মাঝারি মানের প্রপাগান্ডা তৈরি ও বড় পরিসরে ছড়ানোর ক্ষেত্র বিস্তার করেছে। সামাজিক মাধ্যমে একটি এআই-চালিত ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের কথা চিন্তা করুন। অধিকাংশ সময় এটি স্বাভাবিক আচরণ করে। অ্যাকাউন্টগুলো নিজেদের প্রতিদিনের দৈনন্দিন জীবন ঘিরে বানোয়াট বিভিন্ন পোস্ট দেয়, বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হয়, অন্যদের পোস্টে কমেন্ট করে- খুব সাধারণ ব্যবহারকারীর মতোই আচরণ করে। এবং খুবই কম সময় রাজনৈতিক কোনো পোস্ট দেয় বা শেয়ার করে। কম্পিউটার বিজ্ঞানী লাতানিয়া সুইনি এগুলোকে ডাকেন পারসোনা বট বলে। এরকম একটি অ্যাকাউন্টের প্রভাব খুবই কম। কিন্তু এরকম হাজার হাজার বা লক্ষাধিক বট মিলে তৈরি করতে পারে ব্যাপক প্রভাব। 

 এআই স্টেরয়েডের অপতথ্য

এটা কেবল একটি চিত্র। কিন্তু রাশিয়া, চীন কিংবা বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় নির্বাচনে হস্তক্ষেপের দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তারা সম্ভবত এই কাজে তাদের সেরা লোকদের নিয়োগ দিয়েছেন। এবং তাদের কৌশলগুলোও সম্ভবত ২০১৬ সালের তুলনায় এখন অনেক বেশি পরিশীলিত।

বড় পরিসরে সাইবার আক্রমণ বা ইনফরমেশন অপারেশন পরিচালনার আগে রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর ছোট দেশগুলোতে পরীক্ষামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ইতিহাস আছে। এগুলো যখন ঘটে তখন এর রেখে যাওয়া ছাপগুলো শনাক্ত করতে পারাটা জরুরি। নতুন অপুতথ্য প্রচারণা প্রতিরোধ করার জন্য এগুলো চিনতে পারা জরুরি। যার জন্য অনুসন্ধান জারি রাখার সঙ্গে সেগুলো তালিকাভুক্ত করাও জরুরি।

জেনারেটিভ এআই-এর উত্থানের আগেও রাশিয়া সামাজিক মাধ্যমে অত্যাধুনিক কায়দায় অপতথ্য প্রচারণা চালিয়েছে।

কম্পিউটার নিরাপত্তা জগতে, গবেষকরা স্বীকার করেন যে, আক্রমণের পদ্ধতি ও কার্যকারিতা শেয়ার করাই শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার একমাত্র উপায়। একই ধরনের চিন্তাভাবনা এজাতীয় তথ্য প্রচারণার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য: গবেষকরা কৌশলগুলো সম্পর্কে যত বেশি পড়বেন এবং অন্যান্য দেশে কী ধরনের কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে তা জানবেন, ততো ভালোভাবে তারা নিজেদের দেশকে রক্ষা করতে পারবেন।

এআই-যুগের অপতথ্য প্রচারণা ২০১৬ সালের তুলনায় অনেক বেশি পরিশীলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমার বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের দরকার তাইওয়ানসহ অন্যান্য দেশে এআই চালিত প্রোপাগান্ডার রেখে যাওয়া ছাপ শনাক্ত করার চেষ্টা করা। সেখানে মানহানি করতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রত্যাশী একজন প্রার্থীর ডিপফেক অডিও ছড়ানো হয়েছে। এমনটা না করলে, এই জিনিসগুলো এখানে চলে আসলে আমরা শনাক্ত করতে পারব না। দুর্ভাগ্যবশত এগুলো করতে গিয়ে গবেষকরাও আক্রমণহয়রানির শিকার হচ্ছেন।

হয়তো সব কিছু ঠিকঠাকই হবে। জেনারেটিভ এআই যুগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয়েছে, যেখানে অপতথ্যের তেমন কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। যেমন আর্জেন্টিনার প্রাথমিক নির্বাচন, ইকুয়েডরে প্রথম দফা নির্বাচন এবং থাইল্যান্ড, তুরস্ক, স্পেন ও গ্রিসের জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু কী হতে পারে, তা আন্দাজ করে আমরা যত তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হব, আমাদের জন্য তা মোকাবিলা করাও ততো সহজ হবে। 


ব্রুস স্নেয়ার-এর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। বাংলায় অনুবাদ করেছেন তামারা ইয়াসমীন তমা।

আরো কিছু লেখা