
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার পলাতক আসামি সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে মো. মনজুর আলমকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে গত ১৭ ডিসেম্বর। তবে সামাজিক মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য ছড়াচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিনের ছবি যুক্ত ফটোকার্ডের মাধ্যমে। ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা গেছে, নাম কাছাকাছি হলেও তারা ভিন্ন দুই আইনজীবী।
“এরিয়া একাত্তর (Area 71)” নামের ফেসবুক গ্রুপে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিনের ছবি যুক্ত একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে। ফটোকার্ডে লেখা রয়েছে, “সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।” পোস্ট ক্যাপশনের প্রথম অংশে লেখা রয়েছে, “মানজুর আল মতিন জামাত পরিবার থেকে বেড়ে উঠা এক এলজিবিটিকিউ (সমকামী) সমর্থক। ইউনুসের রাষ্ট্র আজ সজিব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে মানজুর আল মতিনকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এই মতিনের বাবা ছিলো বঙ্গবন্ধু হ’ত্যা মামলার বিচারপতি।”

পোস্টের কমেন্ট বক্সে অনেকেই তথ্যটি সঠিক ভেবে মন্তব্য করেছেন। একজন লিখেছেন, “আরেক লাল বদর।” আরেকজন ব্যবহারকারী লিখেছেন “র্বতমান রাষ্টপক্ষই তো জামায়াত শিবির রাজাকারদের বংশধর। তারা উকিল আর কাকে দিবে।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে দেড় শর অধিক কমেন্ট করা হয়েছে। শেয়ারও করা হয়েছে দেড় শর অধিক বার। প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে দেড় হাজারের বেশি।
“এরিয়া একাত্তর” গ্রুপ ছাড়াও একাধিক ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একই দাবিতে ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়েছে (১, ২, ৩)।
তথ্যটির সত্যতা নিশ্চিতে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করলে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সামনে আসে। সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে গত ৭ জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে মো. মনজুর আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, গত ১৭ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই নিয়োগ দেন।

ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে এই নাম দিয়ে সার্চ করলে একজন আইনজীবীর প্রোফাইল খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে পুরো নাম হিসেবে লেখা রয়েছে মো. মনজুর আলম মঞ্জু (Manjur Alam Manju)। ডিসমিসল্যাব তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “আমাকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আজ (১১ জানুয়ারি) আমি শুনানিতেও উপস্থিত ছিলাম।
অন্যদিকে ফটোকার্ডে থাকা আইনজীবী মানজুর-আল-মতিনের (Manzur- Al- Matin) ছবিযুক্ত নামও পাওয়া যায় একই ওয়েবসাইটে। যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, ফটোকার্ডে যার ছবি আছে সে আইনজীবী “মানজুর-আল-মতিন”, “মনজুর আলম” নন। এছাড়াও, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটেও একই নামে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।

সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোতে সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবীকে নিয়ে পূর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই নামের বানান ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রতি সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী প্রসঙ্গে প্রথম আলোসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে (১, ২, ৩, ৪, ৫) যে নাম লেখা হয়েছে তা হল, “মো. মনজুর আলম” অথবা “মনজুর আলম”।
আইনজীবী মানজুর-আল-মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “আমাকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।” মানজুর-আল-মতিন আরও জানান, “একাত্তর টেলিভিশনে ভেরিফায়েড পেজ থেকে আমার ছবি যুক্ত ফটোকার্ড পোস্ট হয়েছে বলে একটি স্ক্রিনশট আমার কাছে এসেছে। একটি মূল ধারার গণমাধ্যমের কাছ থেকে এমনটা কাম্য নয়।”

স্ক্রিনশটটি তিনি ডিসমিসল্যাবকে পাঠিয়েছেন। তবে এই প্রতিবেদন লেখার সময় সামাজিক মাধ্যমে কয়েকটি নামহীন ফটোকার্ডের পাশাপাশি একাত্তর টেলিভিশনের ফটোকার্ড (১, ২, ৩) পাওয়া গেলেও, সংবাদমাধ্যমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ফটোকার্ডটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে পলাতক আসামী সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. মনজুর আলম (মঞ্জু) ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন একই ব্যক্তি নন।
“এরিয়া একাত্তর (Area 71)” নামের গ্রুপে পোস্ট হওয়া ফটোকার্ডের ক্যাপশনে আইনজীবী মানজুর-আল-মতিনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বিভিন্ন নেতা ও নেত্রীর পারিবারিক সম্পর্ক নিয়েও কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। দাবি করা হয়, জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য হাফেজা আসমা খাতুন হলেন মানজুরের নানী এবং এই আইনজীবীর মামা ও খালুর সঙ্গে জামায়াত নেতা ও যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও গোলাম আযমের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো এই তথ্যগুলো পুরোপুরি মিথ্যা জানিয়ে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডিসমিসল্যাব।