
সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট দেয়া হয়েছে ২১ শতাংশ– এমন একটি তথ্য ছড়াতে দেখা যাচ্ছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনের বরাতে। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি টিআইবির তথ্য বিকৃতি করে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা হয়েছে। মূলত টিএআইবির রিপোর্টে বলা হয়, গবেষণার আওতায় থাকা ৭০টি নমুনা আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মোট ভোটের ২১.৪ শতাংশ জাল– এই দাবিটি সঠিক নয়।

আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল, “আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক হল কি না’ এ নিয়ে আরো প্রশ্ন উঠবে: টিআইবি।” এর ঠিক নিচে লেখা, “জাল ভোট পড়েছে ‘২১ দশমিক ৪ শতাংশ’।” প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছে টিআইবি। টিআইবির পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে সেখানে লেখা হয়, “জাল ভোট পড়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ ও প্রতিপক্ষের এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে ১৪.৩ শতাংশ।” প্রতিবেদনটির কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে টিআইবির এই পরিসংখ্যান ছিল ৭০টি নমুনা আসনের ওপর ভিত্তি করে।

প্রতিবেদনটি শেয়ার করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড পেজ থেকে লেখা হয়, “টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জাল ভোট পড়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ ও প্রতিপক্ষের এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে ১৪.৩ শতাংশ।” ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পেজ থেকেও একই দাবি পোস্ট হতে দেখা যায়। কমেন্টে তিনি বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনটি শেয়ার করেন।
এছাড়া একাধিক ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল থেকে একই দাবি (১, ২, ৩, ৪, ৫) ছড়াতে দেখা যায়।
তথ্যটি যাচাই করতে গিয়ে টিআইবির প্রতিবেদনের একটি প্রেজেন্টেশন ফাইল খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। সেখানে গবেষণার পদ্ধতিতে বলা হয়, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং-এর উদ্দেশ্যে মোট ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।”
নির্বাচনের দিন সংঘটিত অনিয়মের ধরন ও হার উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়, জাল ভোট দেওয়া হয়েছে ২১.৪ শতাংশ আসনে। ৩৫.৭ শতাংশ আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এছাড়া, ভোট গ্রহণের আগেই ব্যালটে সিল মারার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে ১৪.৩ শতাংশ আসনে। এই অনিয়মগুলোর হার দেওয়া হয়েছে ৭০টি নমুনা আসনের শতকরা হারে, মোট ভোটের হারে নয়।

টিআইবির একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও হাতে আসে ডিসমিসল্যাবের। প্রতিষ্ঠানটির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের বরাতে দেওয়া সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট পড়া নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-কে উদ্ধৃত করে ভুল ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যকে ভুলভাবে প্রচার ও প্রকাশ করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।”

এই বিষয়ে বিভ্রান্তি রোধে সকলকে সতর্ক থাকার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, “গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টিআইবির মাঠপর্যায়ের গবেষণার জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এ তথ্যকে পুরো নির্বাচনে ২১.৪ শতাংশ জালভোট পড়েছে-এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্পূর্ণ ভুল, ভিত্তিহীন ও অমূলক।”
মূলত, ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক ভোট জালিয়াতির হওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে পুরো নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়ার চিত্র আকারে উপস্থাপিত হয়েছে।