
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি একাধিক খাল এবং এক্সকেভেটরের ছবি পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে সারা দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছবিগুলো পুরোনো। অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে খাল খননের জন্য ব্যবহৃত এক্সকেভেটরের ছবি সাম্প্রতিক বলে ছড়ানো হচ্ছে।
ফেসবুকে “বিএনপি-বিএনপি” নামের একটি গ্রুপ থেকে ৫টি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ্ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোঘিত খাল খনন কর্মসূচি সারা দেশে শুরু করেছে” (বানান অপরিবর্তিত)।
ফেসবুকের একাধিক (১, ২, ৩) গ্রুপ থেকেও একই দাবিতে ছবিগুলো পোস্ট করতে দেখা যায়।

প্রথম ছবিতে দেখা যায় একটি হলুদ রঙের এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি তোলা হচ্ছে। এক্সকেভেটরের পাশে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়ানো। ছবিটিতে বিডি নিউজ ২৪ ডট কম এর জলছাপ দেখা যায়। ডিসমিসল্যাব ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে বিডি নিউজ ২৪ এর একটি প্রতিবেদন খুঁজে পায়। ২০২২ সালের ২০ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনের ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া পোস্টটির এই ছবিটি সাদৃশ্যপূর্ণ।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, “চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে তৃতীয়বারের মতো সংশোধিত খাল খনন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। চট্টগ্রাম নগরীর এক দশকের পুরোনো জলাবদ্ধতা সংকট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাল খননের জন্য এক হাজার ৩৬২ কোটি টাকার একটি সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।”
দ্বিতীয় ছবিটিতে দেখা যায়, একটি হলুদ রঙের এক্সকেভেটর দিয়ে খাল থেকে মাটি তোলা হচ্ছে। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে জাগো নিউজের একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ব্যবহৃত ছবিটির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া পোস্টের ছবিটির হুবহু মিল রয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, “দখল-দূষণের কবলে হারিয়ে যাওয়া বরিশাল নগরীর ২৪টি খালের মধ্যে প্রধান ৭টি খালের প্রাণ ফেরাতে খনন কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর ফলে নগরীর কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া আমানতগঞ্জ, জেলখাল, রূপাতলী খাল, পলাশপুর খাল, সাগরদী খাল, চাঁদমারী খাল এবং ভাটারখাল দীর্ঘদিন পরে হলেও অস্তিত্ব ফিরে পেতে যাচ্ছে।” ভোরের ডাকের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও ছবিটি দেখা যায়।

তৃতীয় ছবিটিতে একটি লম্বা খালের এক প্রান্তে একটি হলুদ রঙের এক্সকেভেটর দেখা যায়। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে দৈনিক জবাবদিহির একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ব্যবহৃত ছবিটির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া পোস্টের তৃতীয় ছবির হুবহু মিল রয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, “চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর হরিণা খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কৃষকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। হাসি ফুটেছে হাজারো কৃষকের মুখে। বিশেষ করে ইরি-বোরো মৌসুমে সেচকাজ পরিচালনা সহজলভ্য হবে বলে মনে করছেন কৃষকরা। খাল খননের ফলে ভূজপুর ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের হাজার হাজার কৃষক উপকৃত হবেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।”
চতুর্থ ছবিটিতে দেখা যায়, একটি খালে তিনটি হলুদ রঙের গোলাকৃতির এক্সকেভেটর রয়েছে। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে সময় নিউজের একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ব্যবহৃত ছবিটির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া পোস্টটির একটি ছবি হুবহু সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “নদীকে খাল বানিয়ে চলছে খনন!।” প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “নদীকে খাল বানিয়ে চলছে খনন। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর তড়িঘড়ি কাজ শেষ করে বিল উত্তোলনের চেষ্টা এবং খননের মাটি পাড়ে রেখে দেয়ার মতো নানা অনিয়ম চলছে। কৃষকরা এর প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদের হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে থানায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার হুমকি দেয়া হচ্ছে।”

সর্বশেষ ছবিটিতে একটি খালের ছবি দেখা যায়, যার পাড়ে নীল রঙের নেট দেখতে পাওয়া যায়। ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ঢাকা টাইমসের একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া পোস্টটির শেষ ছবিটি হুবহু সাদৃশ্যপূর্ণ।

প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “তাড়াশে ২৭ কিলোমিটার খাল খনন: বৃদ্ধি পেয়েছে ফসল ও মাছের উৎপাদন।” প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “সিরাজগঞ্জের তাড়াশে এলজিইডির টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ২৭ কিলোমিটার খাল পুনর্খননের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭৮ শতাংশ খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে। খাল খননে ফসল ও দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।”
অর্থাৎ, পূর্বে বিভিন্ন প্রকল্পে খাল খননের জন্য ব্যবহৃত এক্সকেভেটরের ছবি ব্যবহার করে সাম্প্রতিক সময়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু বলে ছড়ানো হচ্ছে। প্রসঙ্গত, সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার শরিকল ইউনিয়নে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, খাল খননের পাশাপাশি খালের দুই পাশে বনায়ন করারও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।