
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি ছড়ানো এক ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ ১৩ নেতার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ভিডিওতে এক নারী সংবাদ পাঠককে এ বার্তা দিতে দেখা যায়। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওর শুরুতে বলা কথাগুলো সম্পাদিত।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি যমুনা টিভিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের খণ্ডিত অংশ সম্পাদনা করে বানানো। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়, “দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় চট্টগ্রাম- ৯ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।”

ফেসবুকে গত ২ ফেব্রুয়ারি একটি পেজ থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। ১৪ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এক উপস্থাপক বলছেন, “দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়েছে। ৭টি আসনে যাচাই-বাচাই চলে এবং এরমধ্যে ১৬ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়।” তারপর তিনি বলেন, “এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানব, যাচ্ছি সহকর্মী জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত অপেক্ষা করছেন।”
প্রচারিত ভিডিওটির এ পর্যায়ে উল্লিখিত সহকর্মীকে দেখানো হয় এবং ভিডিওটিতে বলতে শোনা যায়, “বৃষ্টি, বিএনপির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান তার লন্ডনে এবং বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় এবং তার সম্পদের হিসাব সঠিকভাবে না দেওয়ায় মূলত তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।”
এরপর, অন্য এক নারী উপস্থাপককে বলতে শোনা যায়, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।” ভিডিওর ভেতরে “নিউজ প্রবাহ টিভি এক্সক্লুসিভ” লেখাটি উল্লেখ রয়েছে। এদিকে ভিডিওতে চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, একুশে টিভির ভিন্ন আরও দুইটি প্রতিবেদন ছাড়াও একাধিক ব্যক্তির নিজস্ব মতামতের দৃশ্যও তুলে ধরা হয়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, “বাতিল হলো তারেক রহমান সহ ১৩ জন বিএনপির শীর্ষ নেতা নমিনেশন😲…!!”
এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ভিডিওটি দশ লাখে বেশি দেখা হয়েছে এবং সেটি ২০ হাজারের অধিক শেয়ার করা হয়েছে। ভিডিওতে ৪০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পোস্টে এক হাজারের বেশি মন্তব্য ছিল। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বাইরের দেশের লোক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেনা”। আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “তারেক রহমানের নমিনেশন বাতিল হোক”।
ঘটনাটির সত্যতা যাচাইয়ে কিফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে সংবাদমাধ্যম যমুনা টিভির একটি প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। প্রতিবেদনের শিরোনামে লেখা, “দ্বৈত নাগরিকত্বের দায়ে চট্টগ্রামে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল”। যমুনা টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, “দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় চট্টগ্রাম- ৯ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। শেষ দিনে চট্টগ্রামের ৭টি আসনে যাচাই বাছাই চলে। এর মধ্যে ১৬ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। বিএনপির সব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।”

ভিডিওটির প্রথম ১০ সেকেন্ড, ২ মিনিট ২৯ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট ৩২ সেকেন্ড অংশ এবং ২ মিনিট ৫৭ সেকেন্ড থেকে ৩ মিনিট ১৭ সেকেন্ড অংশের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির দাবির মিল পাওয়া যায়। তবে প্রচারিত ভিডিওতে সংবাদ পাঠক এবং তার চট্টগ্রামে থাকা সহকর্মীর ভিডিওর অংশ মিরর করে প্রচারিত দাবির অডিওটি এতে যুক্ত করা হয়েছে।
৪ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় (বাংলাদেশ -যুক্তরাষ্ট্র) চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ৪ জানুয়ারি সকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন।
তবে, ১৯ জানুয়ারি প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা: এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন।
তারেক রহমানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে- এ সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন কোনো গণমাধ্যমে পাওয়া যায় না। তাই দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে দাবিটি ভুয়া। প্রচারিত ভিডিওতে যার ব্যাপারে কথা বলা হয়েছে তিনি চট্টগ্রাম -৯ এর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হক।