নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক স্পিকারের দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে করা মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে ছিল না

স্পিকারের দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে করা মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে ছিল না

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ফেসবুকে সম্প্রতি একাধিক ছবি এবং ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা  ডা. শফিকুর রহমানকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেখে দেখে বক্তব্য দিতে নিষেধ করছেন। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ “সংসদে দেখে দেখে পড়া ‘অ্যালাউড’ (অনুমোদিত) না” বলেছেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ বিন সাঈদী এবং বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অলি উল্লাহকে উদ্দেশ্য করে। 

ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ১৫ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের ছবি সংযুক্ত করে একটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে বলা হয়, “স্পিকার যখন ডক্টর শফিকুর রহমানকে সরাসরি বললেন, “সংসদে দেখে দেখে পড়া এলাউড নয়, আশা করি ভবিষ্যতে না দেখে কথা বলার অভ্যাস করবেন।” একজন বিরোধীদলীয় নেতা যদি সংসদে দাঁড়িয়ে নিজস্ব কোনো বক্তব্য না দেখে পড়তে না পারেন, তবে ৫ বছর দেশ ও জনগণের কথা কীভাবে বলবেন? বড় বড় ডিগ্রি আর নামের আগে ‘ডক্টর’ লাগিয়ে কী লাভ, যদি সামান্য কথাটুকু মুখস্থ বলার সাহসই না থাকে! সংসদের মতো জায়গায় এমন সার্কাস দেখে সত্যিই অবাক লাগে। ভক্তদের কাছে প্রশ্ন—আপনারা কি এমনই একজন অযোগ্য ও প্রস্তুতিহীন নেতার স্বপ্ন দেখেছিলেন? লজ্জা যদি থাকে, অন্তত ভবিষ্যতে নিজেকে প্রস্তুত করে সংসদে আসবেন।” ছবিটির ভেতরে লেখা, “দেখে না পড়লে কথা ফুটছে না? তবে আর সংসদ সদস্য হয়ে লাভ কী!।” ফেসবুকের একাধিক গ্রুপ (, , ) প্রোফাইল (, , ) থেকেও একই দাবিতে পোস্ট করা হয়।

ফ্যাক্টচেক স্পিকারের দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে করা মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে ছিল না
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের ছবি সংযুক্ত ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্য রাখেন অধিবেশনের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পরে। জামায়াতের আমিরের সংসদ অধিবেশনের প্রথম বক্তব্যটি পাওয়া যায় ১২ মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারে। ৩ ঘন্টা ৫৪ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ভিডিওটির ৯ মিনিট ২২ সেকেন্ডে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। তার বক্তব্য শেষ হয় ১৫ মিনিট ৩ সেকেন্ডে। এরপরে স্পিকারকে কার্যপ্রণালী বিধি বর্ণনা করতে দেখা যায়। ডা. শফিকুর রহমানকে দ্বিতীয় বার কথা বলতে দেখা যায় ১৫ মার্চ অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের শুরুতে। ১৫ মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারে তাকে কথা বলতে দেখা যায়। ২ ঘন্টা ৪ মিনিট দৈর্ঘ্যের ভিডিওটির ৩ মিনিট ৬ সেকেন্ড থেকে ৪ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে ডা. শফিকুর রহমানকে কথা বলতে দেখা যায়। এরপর ১ ঘন্টা ৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে তাকে তৃতীয়বারের মতো বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তার এই বক্তব্য শেষ হয় ১ ঘন্টা ১২ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে। তার দেওয়া কোনো বক্তব্যের পরেই স্পিকারকে দেখে দেখে পড়া নিয়ে কিছুই বলতে দেখা যায়নি।

স্পিকারের এই বক্তব্য তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে দাবিতেও ছড়াতে দেখা গেছে। ফেসবুকে সাব্বির হোসেন ভোলা নামের একটি পেজ থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “দেখে বক্তব্য দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যা বললেন স্পীকার।” ৩৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলতে শোনা যায়, “মাননীয় স্পিকার মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আমরা কামনা করি এই মহান সংসদ সাফল্য কামনা করে আমার শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।” পরবর্তীতে ভিডিওতে স্পিকারকে বলতে শোনা যায়, “ধন্যবাদ মাননীয় সদস্য। আমি অন্তত বিনয়ের সাথে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সংসদে দেখে দেখে পড়া অ্যালাউড না। আপনি নোট রাখবেন। একবার তাকিয়ে তারপরে হাউজের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য রাখবেন। আগামীতে এটাই আশা করি, এটাই সংসদের রেওয়াজ। ধন্যবাদ।” ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল (, , , ) থেকেও ভিডিওটি পোস্ট করা হয় একই দাবিতে। 

ফ্যাক্টচেক স্পিকারের দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে করা মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে ছিল না
স্পিকারের একই বক্তব্য তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে দাবিতেও ছড়িয়েছে।

ঘটনাটির সত্যতা যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন পর্যন্ত মোট দুইবার বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথমবার জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিন সভাপতি ও স্পিকার নির্বাচনের আগে। প্রধানমন্ত্রীর এই শুভেচ্ছা বক্তব্য পাওয়া যায় ১২ মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারে। তবে এ সময়ে তার দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির বক্তব্যে মিল পাওয়া যায়না। ৪৫ মিনিট ৯ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ভিডিওটির ১৫ মিনিটে তারেক রহমানকে বক্তব্য শেষ করতে দেখা যায়। এর পরেই বক্তব্য দিতে দেখা যায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী  মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় স্পিকার নির্বাচিত হওয়া পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যটির। এ বক্তব্যটি পাওয়া যায় ১২ মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারে। ৩ ঘন্টা ৫৪ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ভিডিওটির ৮ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শেষ করার সময় বলেন, “মাননীয় স্পিকার মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আমরা কামনা করি এই মহান সংসদ সাফল্য কামনা করে আমার শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।” এ বক্তব্যের পরেই ৯ মিনিট ১০ সেকেন্ডে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বলতে শোনা যায়, “ধন্যবাদ মাননীয় সংসদ নেতা। এবার আমি মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য রাখার জন্য আহ্ববান জানাচ্ছি।” এর পরে ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। অর্থাৎ, স্পিকারকে কোনোবারই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের পরে দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে শোনা যায়নি।

সংসদে দেখে দেখে পড়া অনুমোদিত নয়, এই বক্তব্যটি স্পিকার মূলত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ বিন সাঈদীকে উদ্দেশ্য করে দেন। মাসুদ বিন সাঈদী বক্তব্য দেন ১৫ মার্চ যা দেখা যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারে। তার বক্তব্য শেষ হয় ১০ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে। এরপরে স্পিকার বলেন, “ধন্যবাদ মাননীয় সদস্য। আমি অন্তত বিনয়ের সাথে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সংসদে দেখে দেখে পড়া অ্যালাউড না। আপনি নোট রাখবেন। একবার তাকিয়ে তারপরে হাউজের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য রাখবেন। আগামীতে এটাই আশা করি, এটাই সংসদের রেওয়াজ। ধন্যবাদ।” মাসুদ বিন সাঈদীর পর বক্তব্য রাখেন বিএনপির সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান মোল্লা। পরবর্তীতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। এর পরে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য অলি উল্লাহ। সাংসদ অলি উল্লাহর বক্তব্য শেষ হয় ২৭ মিনিটে। তার বক্তব্যের পরে স্পিকার বলেন, “ধন্যবাদ মাননীয় সদস্য। আপনিও আপনার পূর্ববর্তী বক্তার মতো দেখে দেখে পড়েছেন। সংসদে এটা অ্যালাউড না। ভবিষ্যতে সংসদে না দেখে বলার অভ্যাস করেন। এটা সংসদের রেওয়াজ। এটা সকলের মান্য করা উচিত। অত্যন্ত বিনীতভাবে আপনাকে জানাচ্ছি। ধন্যবাদ।” 

ফ্যাক্টচেক স্পিকারের দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে করা মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে ছিল না
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওর স্ক্রিনশট।

স্পিকারের এই বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একাধিক (, , ) গণমাধ্যম। গত ১৫ মার্চে প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ বিন সাঈদী লিখিত বক্তব্য সংসদে পড়ে শোনান। বক্তব্য শেষে স্পিকার তাঁর উদ্দেশে বলেন, ‘বিনয়ের সঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সংসদে দেখে দেখে পড়া অ্যালাউড না। আপনি নোট রাখবেন। একবার তাকিয়ে তারপরে হাউজের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য রাখবেন। আগামীতে এটাই আশা করি, এটাই সংসদের রেওয়াজ।’” প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “মাসুদ বিন সাঈদীর পর একপর্যায়ে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য অলি উল্লাহ। তিনিও সংসদে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তাঁর উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘আপনিও আপনার পূর্ববর্তী বক্তার মতো দেখে দেখে পড়েছেন। সংসদে এটা অ্যালাউড না। ভবিষ্যতে সংসদে না দেখে বলার অভ্যাস করেন। এটা সংসদের রেওয়াজ। এটা সকলের মান্য করা উচিত।’” 

ফ্যাক্টচেক স্পিকারের দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে করা মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে ছিল না
স্পিকারের বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন।

অর্থাৎ, বক্তব্য দেখে দেখে পড়া সংসদে অনুমোদিত না, স্পিকার এটি সাংসদ মাসুদ বিন সাঈদী এবং সাংসদ অলি উল্লাহর উদ্দেশ্যে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশ্যে নয়।

প্রসঙ্গত, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। প্রথম অধিবেশন চলবে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। গত ১৪ মার্চ জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

আরো কিছু লেখা