মো. তৌহিদুল ইসলাম
বুয়েট শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরার ছবিটি এআই দিয়ে বানানো নয়
মো. তৌহিদুল ইসলাম
তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে নামা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গত বুধবার (২৭ আগস্ট) পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলমের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, তিনি এক শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরেছেন। ডিএমপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে দাবি (১, ২) করা হয়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি ক্যামেরায় ধারণ করা বাস্তব চিত্র। ওই সময় একাধিক আলোকচিত্রী বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবিটি তোলেন। ঘটনাস্থলে থাকা অন্তত দুজন আলোকচিত্রীর সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থলের ছবির মেটাডেটা যাচাই করে তথ্যটি নিশ্চিত করেছে ডিসমিসল্যাব।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তাদের অনলাইন নিউজ পোর্টালে লিখেছে, “সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোঃ মাসুদ আলমকে নিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এক ছাত্রের মুখ চেপে ধরার একটি ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।”
তারা আরও জানায় “কে বা কারা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে উক্ত ছবিটি তৈরি করে জনমনে অহেতুক বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। ছবিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় তা সম্পূর্ণ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এবং বাস্তবতা বিবর্জিত।”

এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে সাধারণত যে ধরনের অসঙ্গতি থাকে, প্রাথমিকভাবে ছবিটি খালি চোখে পর্যবেক্ষন করে ছবিটিতে তেমন কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায় না। সেখানে থাকা প্রতিটি চরিত্রের হাতের আঙুল, চোখ, মুখ, শারীরিক কাঠামো, চামড়ার ভাঁজ, চুলের ধরন ও অন্যান্য দৃশ্যমান উপাদানগুলোর মধ্যে সন্দেহজনক কোনো অসঙ্গতি নেই। রাস্তায় থাকা পানিতে কিছু প্রতিবিম্বও লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া পোশাকের ডিজাইন, রঙ, লোগো ও জুতাও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
পরবর্তী যাচাইয়ে দেখা যায়, আলোকচিত্রী জয়ীতা রায় গত ২৭ আগস্ট রাত ১টা ৬ মিনিটে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে একই ঘটনার একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। এটির ক্রেডিট লাইনে তার নিজের নামও উল্লেখ ছিল । ছবিটির সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এআই দিয়ে তৈরি দাবি করা ছবিটির মাঝখানের অংশ হুবহু মিলে যায়।অন্যদিকে, ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের এক পোস্টে জানায়, ছবিটি তুলেছেন তাদের নিজস্ব আলোকচিত্রী রাজীব ধর।

বিষয়টি নিশ্চিত হতে উভয় আলোকচিত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তাদের ভাষ্যমতে, তারা দুজনেই ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং আলোকচিত্র ধারণ করেছেন। পরবর্তীতে জয়ীতা রায়ের পাঠানো মূল ছবিটির মেটা ডেটা যাচাই করে ডিসমিসল্যাব। এতে দেখা যায় ছবিটি গত ২৭ আগস্ট দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে ক্যানন ইওএস ফাইভডি মার্ক আইভি ডিভাইসের মাধ্যমে তোলা হয়েছে। ছবিটি তোলার সময় ক্যামেরার অন্যান্য সেটিংস সম্পের্কও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় মেটা ডেটা থেকে, যা মূল ছবিটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডও পরবর্তীতে একটি প্রতিবেদনে রাজিব ধরের তোলা ছবিটির মেডাডেটার তথ্য তুলে ধরে। সেখানেও বলা হয়েছে, ছবিটি তোলা হয়েছে ২৭ আগস্ট, দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে। দুই আলোকচিত্রীর ছবি তোলার সময় হুবহু মিলে যায়।
এছাড়াও, এটিএন বাংলার ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুকে ২৭ আগস্ট প্রচারিত দুটি (১, ২) ভিডিও বিশ্লেষণ করেও ছবির দৃশ্য ও ঘটনার প্রেক্ষাপটের মিল পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ যে ছবিটিকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছে, সেটি আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় ধারণ করা একটি বাস্তব দৃশ্যর ছবি।