
“দুটি আলাদা বাচ্চা। যে লোকটি কে গ্রেফতার করা হয়েছে শিশু নির্যাতনের অপরাধে, সেই শিশুটি কোথায়???”- এমন দাবিতে একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে ফেসবুকে। তবে ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, পোস্টের ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। গণমাধ্যম চ্যানেল আই ও দৈনিক কালের কণ্ঠ তাদের প্রতিবেদনে ‘সংগৃহীত’ দাবিতে এআই ছবিটি ব্যবহার করেছে।
চট্টগ্রামের ইকোপার্কে গত ১ মার্চ গলায় ছুরিকাঘাতে হত্যার শিকার শিশুর সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে সৃষ্ট একটি এআই ছবি ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। সে ছবি পোস্ট করে তা ভিন্ন এক শিশুর বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে, ছড়ানো ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রবল।

ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে “দুটি আলাদা বাচ্চা । যে লোকটি কে গ্রেফতার করা হয়েছে শিশু নির্যাতনের অপরাধে, সেই শিশুটি কোথায়??? আর যে শিশুটি পাওয়া গেছে এবং মারা গেছে, সে শিশুটি র অপরাধী কোথায়???? কেউ কি জানেন?” ক্যাপশনে একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টটিতে ৪টি ছবি দেখা যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় ছবিতে শিশুর ছবি, তৃতীয় ও চতুর্থ ছবিতে শিশুটির সঙ্গে হাত ধরে রাখা অবস্থায় এক ব্যক্তিকে দেখা যায়।
যাচাইয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পারিবারিক বিরোধের জেরে মেয়ে শিশু হত্যার সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে এআই ছবি তৈরি করা হয়েছে। পোস্টের প্রথম ও চতুর্থ ছবিটি এই ফুটেজ থেকে বানানো এআই নির্মিত ছবি। এ বিষয়ে হত্যাকাণ্ডের ফুটেজটি যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫) গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনে ফুটেজটি পাওয়া যায়। ফুটেজটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত ১ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ শিশুটি আসামি বাবু শেখ ওরফে মাহবুব আলমের হাত ধরে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ইকো-পার্কে যাচ্ছে। শিশুটির আরেক হাতে একটি বস্তু দেখা যায়।
ছড়িয়ে পড়া এআই ছবির সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজটির কিছু অসংগতিও লক্ষ্য করা যায়। এআই ছবিটিতে শিশুর পোশাকের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজের শিশুটির পোশাকের অমিল আছে। সিসিটিভিতে শিশুটির জামায় হাফ হাতা দেখা যায় এবং এআই ছবিতে ফুল হাতার জামা পরা দেখা যায়। এছাড়া দুই ছবিতে শিশুর মুখাবয়ব ও চুলের ধরনে অমিল দেখা যায়।
একাধিক (১, ২, ৩, ৪) গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সিসিটিভি ফুটেজের প্রকৃত ছবিটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। গত ৩ মার্চে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছবিটির ক্যাপশনে বলা হয়, “সিসিটিভিতে দেখা যাচ্ছে, বাবু শেখ ওরফে মাহবুব আলম মেয়েটিকে হাত ধরে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ইকো-পার্কে নিয়ে যাচ্ছেন।” একই ছবির আরেকটি এআই সংস্করণ পাওয়া যায় আরেকটি ফেসবুক পোস্টে।

এআই ছবিটির সূত্র খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, চ্যানেল আই গত ৩ মার্চ তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট করে। একই শিরোনামের একটি প্রতিবেদনও তারা প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে এআই নির্মিত ছবিটি পাওয়া যায়। ছবিটির ক্যাপশনে “সংগৃহীত” লেখা। ৪ মার্চে কালের কণ্ঠ থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও ছবিটি পাওয়া যায়। ছবিটির ক্যাপশনে “শিশুটির হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত বাবু শেখ। ছবি : সংগৃহীত” লেখা। এছাড়াও দৈনিক ১০০ শব্দ এবং দৈনিক পূর্বকোণের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছবিটি ব্যবহার হতে দেখা যায়। তবে এ প্রতিবেদনগুলোতে ছবিটিতে কোনো ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়নি।

এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন ও এআই অর নট দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রবল। হাইভ মডারেশন অনুযায়ী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা ৮৩ শতাংশ এবং এআই অর নট অনুযায়ী এ সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।

অর্থাৎ, দুটি আলাদা বাচ্চার দাবিতে ছড়ানো ছবিটি আসলে সীতাকুণ্ডে হত্যার শিকার মেয়ে শিশুটির ছবির এআই সংস্করণ।
প্রসঙ্গত, গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তার গলায় জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ৩ মার্চ ভোরে শিশুটি মারা যায়। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে বাবু শেখ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।