
ফেসবুকে সম্প্রতি একটি ছবি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে শরীয়তপুরের এমপি গাঁজা ব্যবসায়ীকে শাস্তি দিচ্ছেন। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছবিটি ২০২৪ সালের আগস্টে মাদারীপুরের শিবচরে মাদক কিনতে আসা ৪ যুবককে শাস্তি দেওয়ার ছবি। ছবিটিতে সাদা পাঞ্জাবিতে দেখা যাওয়া দুই ব্যক্তি পীরজাদা আলহাজ হাফেজ মাওলানা মো. মোহসেন ও পীরজাদা হাফেজ মাওলানা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালাকে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে মাওলানা হানজালা ত্রয়োদশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন।
ফেসবুকে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি ছবি গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “খেলা দেখুন🤣🤣🤣গা*ঞ্জা ব্যবসায়ীকে শাস্তি দিচ্ছেন শরীয়তপুরের নতুন এমপি।” পোস্টে ব্যবহারকারীদের মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেকেই পোস্টটিকে সত্য বলে মনে করছেন।

এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “পুলিশের কাছে দিলে তো পুলিশ ঘুষ খেয়ে ছেড়ে দেয় এমপি সঠিক কাজ করেছে আমরা এমন এমপি চাই এই দেশে।” আরেকজন লিখেছেন, “মব শুরু হয়ে গেছে, তারা নিজেরাই বিচার করলে দেশে আইন প্রশাসন এর কি দরকার!।”
দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে চ্যানেল ২৪ এর ২০২৪ সালের ২৫ আগস্টের একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “মাদক কিনতে আসা ৪ যুবককে জুতাপেটার অভিযোগ, ফেসবুকে ভিডিও ভাইরাল।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “মাদারীপুরের শিবচরে মাদক কিনতে আসা ৪ যুবককে জুতাপেটা ও লাঠিপেটাসহ কান ধরে উঠবস করানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় দুই পীরজাদার বিরুদ্ধে। ঘটনা গত ২২ আগস্টের হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে রোববার (২৫ আগস্ট)। এরইমধ্যে এ ঘটনার দুটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে।”

প্রতিবেদনের এক অংশে লেখা হয়, “খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২২ আগস্ট বিকেলে মাদারীপুরের শিবচরে বাহাদুরপুর এলাকায় মাদক কিনতে আসেন একই উপজেলার চরশ্যামাইল গ্রামের শামসুল মোল্লার ছেলে শহিদুল ইসলাম। এ সময় শহিদুলকে আটক করেন স্থানীয়রা। পরে খবর দেয়া হয় শিবচরের বাহাদুরপুরের পীর সাহেব মাওলানা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান সাহেবের ছোট ভাই পীরজাদা আলহাজ হাফেজ মাওলানা মো. মোহসেন ও চাচাতো ভাই পীরজাদা হাফেজ মাওলানা হানজালাকে। এরপর মোহসেন ও হানজালা কানধরে উঠসব করান শহিদুলকে।”
সময় নিউজও এ বিষয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে লেখা হয়, “মাদারীপুরের শিবচরে মাদক কিনতে আসা ৪ যুবককে জুতাপেটা ও লাঠিপেটাসহ কান ধরে উঠবসের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় দুই পীরজাদার বিরুদ্ধে।”
যাচাইয়ে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশের ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, “মা’দক কিনতে আসা ৪ যুবককে জু’তাপেটা ও কান ধরে উঠবস।” ৪ মিনিট ৫৪ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ভিডিওটির ৩১ সেকেন্ডের দৃশ্যের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিটির মিল লক্ষ্য করা যায়।

অধিকতর যাচাইয়ে দেখা যায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় ত্রয়োদশ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। এ বিষয়ে প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখা হয়, “মাদারীপুর-১ আসনে (শিবচর) বিএনপির প্রার্থীকে হারিয়ে ভোটে জয়ী হয়েছেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী (রিকশা প্রতীক) সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। মাদারীপুর-১ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এইচএম ইবনে মিজান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।”
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুরের ৩টি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে লেখা হয়, “শরীয়তপুর–১ আসনে (সদর ও জাজিরা) বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আহমেদ ৭৭ হাজার ৩৯৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। শরীয়তপুর–২ (নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার একাংশ) আসনে বিএনপির সফিকুর রহমান ১ লাখ ২৯ হাজার ৮১৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। শরীয়তপুর–৩ (ডামুড্যা, গোসাইরহাট ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার একাংশ) আসনে বিএনপির মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ (অপু) ১ লাখ ৭ হাজার ৫১৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।”
অর্থাৎ, শরীয়তপুরের নতুন এমপি শাস্তি দিচ্ছেন দাবিতে যে ছবি প্রচার করা হচ্ছে তা ১ বছরের বেশি পুরোনো মাদারীপুরের একটি ঘটনা এবং সাদা পাঞ্জাবিতে যাদের দেখা যাচ্ছে তাদের একজন শরীয়তপুর নয়, মাদারীপুর-১ আসনের নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য মাওলানা সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা।