
ইসরায়েলের কারাগারে কাসাম ব্রিগেডের কমান্ডারকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হত্যার দাবিতে একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিওটি যুক্তরাজ্যের একটি জাদুঘর, “রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট”- এর একটি পুরোনো প্রদর্শনীর।
গত ১ এপ্রিল “কওমি ভয়েস ২৪” নামের ফেসবুক পেজ থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “ইসরাইলি কারাগারে কাসাম ব্রিগেড কমান্ডারকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হত্যা, ভিডিও ভাইরাল—ক্ষোভে ফুঁসছে বিশ্ব মুসলিম | কওমি ভয়েস ২৪। ”কাসাম ব্রিগেড ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন হামাসের একটি সামরিক শাখা, যা ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, অন্ধকার একটি ঘরে লোহার গ্রিলের ওপাশে একটি “বৈদ্যুতিক চেয়ারে” মুখঢাকা মানুষের আকৃতির কোনো বস্তুকে বেঁধে রাখা হয়েছে। গ্রিলের এপাশে থাকা এক দর্শনার্থী একটি সুইচ চাপার সঙ্গে সঙ্গে লাল আলো জ্বলতে শুরু করে এবং চেয়ারের বস্তুটি প্রচণ্ড জোরে কাঁপতে থাকে। কিছুক্ষণ পর বস্তুটি নিস্তেজ হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১০ লাখে বেশি বার। শেয়ার হয়েছে ২০ হাজারের বেশি।
সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওর কিফ্রেম সার্চ করলে, “ওসামা হাসান” নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পোস্ট হওয়া হুবহু একই ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

ভিডিওতে থাকা আরবি বিবরণী অনুবাদ করলে দাঁড়ায়– “লন্ডনের ‘বিলিভ ইট অর নট’ মিউজিয়ামের দারুণ জিনিসগুলোর মধ্যে এটি একটি। এই মিউজিয়ামে সারা বিশ্বের নানা অদ্ভুত ও বিস্ময়কর জিনিস রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে মানুষের তৈরি এমন সব চমৎকার জিনিস, যা পুনরায় হুবহু তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। এখানে একটি হরর ওয়ার্ল্ড আছে এবং প্রাচীন ব্রিটেনে ব্যবহৃত ভয়ংকর সব নির্যাতনের পদ্ধতির আলাদা একটি বিভাগও রয়েছে। যেমনটা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, কীভাবে বিদ্যুতের সাহায্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো। এমন আরও অনেক কিছুই এখানে আছে।”
এছাড়া, কিওয়ার্ড সার্চে ইউটিউবে প্রায় একইরকম দৃশ্যের একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর আপলোড করা ভিডিওর ইংরেজি বিবরণী বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মৃত্যুদণ্ড: বৈদ্যুতিক চেয়ার। ইংল্যান্ডে এখন আর এর অনুমতি নেই, কিন্তু এটি কেমন তা দেখার সুযোগ রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট জাদুঘর আপনাকে করে দিচ্ছে।” ইউটিউবে ১৪ বছর আগে আপলোড হওয়া কাছাকাছি দৃশ্যের এমন আরও কয়েকটি (১, ২, ৩) ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে এটিকে যুক্তরাজ্যের “রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট” জাদুঘর- এ দেখানো প্রদর্শনী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া, রিভার্স ইমেজ সার্চে কয়েকটি ছবি বেচা-কেনার ওয়েবসাইটে কাছাকাছি ধরনের কিছু ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। ছবিগুলোতে প্রদর্শনীর সামনে থাকা বিবরণীর লেখা ও ডিজাইনের সঙ্গে, সম্প্রতি ছড়ানো ভিডিওতে দেখানো বিবরণীর ডিজাইন ও লেখা হুবহু মিলে যায়। ছবি কেনাবেচার মাধ্যম গেটি ইমেজের ওয়েবসাইটে থাকা ছবিটির ক্যাপশনে লেখা আছে, “একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনে ব্যবহৃত ‘বৈদ্যুতিক চেয়ার’ (ইলেকট্রিক চেয়ার)-এর একটি ইন্টারেক্টিভ প্রদর্শনী রাখা হয়েছে। যেখানে দর্শনার্থীদের একটি হাতল টানার সুযোগ দেওয়া হয়। হাতল টানলেই একটি মডেল চালু হয়ে যায়, যা অত্যন্ত ভয়ংকর ও শিহরন জাগানো মৃত্যুর একটি দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে। এই প্রদর্শনীটি লন্ডনের নতুন পর্যটন আকর্ষণ ‘রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট’ জাদুঘরের একটি অংশ, যা ২০ আগস্ট, বুধবার পিকাডিলি সার্কাসে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।”। ছবিটি গেটি ইমেজে আপলোড করা হয়েছে ২০১৭ সালের ১৭ আগস্টে।
ছবি কেনাবেচার আরেকটি প্লার্টফর্ম অ্যালামির ওয়েবসাইটেও একই ছবি খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে হুবহু একই বিবরণ ছিল।
এছাড়া, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের ২০০৮ সালের ২০ আগস্ট প্রকাশিত একটি ফটো স্টোরিতে একই ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনের শিরোনামে লেখা, “রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট!” এরপরেই লেখা আছে, “লন্ডন এবার অদ্ভুত সব জিনিসের স্বাদ পেতে চলেছে, কারণ পিকাডিলি সার্কাসের ট্রোকাডেরোতে খুলছে রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট!”
ছবির ক্যাপশনে লেখ, “যেসব দর্শনার্থীর একটু নিষ্ঠুর বা বীভৎস বিষয়ের প্রতি ঝোঁক রয়েছে, তারা বৈদ্যুতিক চেয়ারের এই ইন্টারেক্টিভ প্রদর্শনীটি নিজ হাতে পরখ করে দেখতে চাইতে পারেন। এর হাতলটি একবার টানলেই একটি মডেল চালু হয়ে যায়, যা অত্যন্ত ভয়ংকর ও শিউরে ওঠার মতো একটি মৃত্যুর দৃশ্য নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।”
অর্থাৎ, ইসরায়েলের কারাগারে কাসাম ব্রিগেডের কমান্ডারকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে হত্যার দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি পুরোনো এবং এটি যুক্তরাজ্যের “রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট” নামের জাদুঘরের একটি প্রদর্শনীর। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম “ইন্ডিয়া টুডে” ও তথ্য যাচাইকারী সংস্থা “নিউজ চেকার” থেকেও একই ভিডিও নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রেখে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট সম্প্রতি একটি আইন পাস হয়েছে। নতুন এই আইনের আওতায়, অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক আদালতে সন্ত্রাসবাদের দায়ে দোষী ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক বা ডিফল্ট শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। রায় ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসির মাধ্যমে এই দণ্ড কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।