তামারা ইয়াসমীন তমা

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
পুরোনো ছবি-ভিডিও যেভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছে রাজনীতির মাঠে
This article is more than 12 months old

পুরোনো ছবি-ভিডিও যেভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছে রাজনীতির মাঠে

তামারা ইয়াসমীন তমা

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বা বিক্ষোভ, কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি পুরোনো ছবি-ভিডিও বা খবরের স্ক্রিনশট শেয়ারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত ২৮ ও ২৯ জুলাই, সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ঘটনায়ও এমনটিই দেখা গেছে। সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো খবরের স্ক্রিনশট, অথবা পুরোনো ছবি ও ভিডিওকে সাম্প্রতিক বলে প্রচার করেছে দুই পক্ষই। ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে এমন অন্তত ৮টি নজির পাওয়া গেছে, যা একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও শেয়ার করেছেন।

ঢাকা- ১৭ সংসদীয় আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এ আরাফাত গত ২৯ জুলাই বিএনপির অবস্থান কর্মসূচির ছবি হিসেবে টুইটারে চারটি ছবি টুইট করেন। যার ক্যাপশনে বলেন, “আজকে #বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের এক ঝলক। তারা তাদের আসল চরিত্রে ফিরে আসছে!” কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, তাঁর টুইট করা চারটি ছবির অন্তত তিনটিই পুরোনো। একাধিক ফ্যাক্টচেকার বিষয়টি তখনই তুলে ধরেন

তাঁর পোস্ট করা প্রথম ছবিতে সাদা শার্ট পরিহিত এক যুবককে পুলিশের ওপর চড়াও হতে দেখা যায়। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ছবিটি অন্তত আট বছর পুরোনো। ২০১৫ সালে জাগো নিউজের “আবারো নাশকতাকারীদের টার্গেট পুলিশ” শীর্ষক প্রতিবেদনে ছবিটি পাওয়া যায়। 

পুরোনো ছবি শেয়ারের বিষয়টি নিয়ে করা টুইট

পুলিশের গাড়ির সামনে লাঠি হাতে কয়েকজন যুবকের হামলা করতে যাওয়ার দ্বিতীয় ছবিটিও বিএনপির আহবানে পালিত সমাবেশ বা অবরোধের নয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত “শাহবাগে পুলিশের উপর হামলা: প্রতিবেদন ১৩ মার্চ” শীর্ষক প্রতিবেদনে ছবিটি পাওয়া যায়। ছবিটি সে বছর রাজধানীর শাহবাগে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর তদন্ত ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে মশাল মিছিলের সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা রয়েছে। একইভাবে তৃতীয় ছবিটিও গত বছর “পুলিশের সঙ্গে জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ, আটক ১১” শীর্ষক প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল।

টুইটারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমও ২৯ জুলাইয়ের ছবি দাবি করে তাঁর ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করেছেন পুরোনো একটি ছবি। সেখানে আগুনে পুড়তে দেখা যাচ্ছে ভিক্টর ক্লাসিক গণপরিবহনের একটি বাসকে। ছবিটি ২০২০ সালে রাজধানীর প্রগতি সরণির কোকা-কোলা এলাকায় অগ্নিসংযোগের পুরোনো ঘটনার ছবি। তবে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর টুইটে যুক্ত করা আরেকটি ভিডিও সাম্প্রতিক সহিংসতা সংশ্লিষ্ট। 

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের আরেকটি পোস্টে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রক্তাক্ত ছবি শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে যে সেটি সাম্প্রতিক সময়ের। কিন্তু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এই রক্তাক্ত ছবিটি আসলে তোলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, কেরানীগঞ্জে বিএনপির গণসমাবেশ চলাকালে। 

এছাড়াও ‘বাংলাদেশ বিএনপি নিউজ‘-সহ আরও কিছু ফেসবুক পোষ্টে জেরার মুখে বাসে আগুন লাগানোর কথা স্বীকার করে এক কিশোর নিজেকে ছাত্রলীগের সদস্য দাবি করছে– এমন একটি ভিডিও ছড়াতে দেখা গেছে। তবে ভিডিওটি অন্তত চার বছর আগের। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি পাওয়া যায় ২০১৯ সালের ১৯-২০ মার্চ থেকে। মূলত সে বছরের ১৯ মার্চ আবরার আহমেদ চৌধুরী নামে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হওয়ার জেরে যে আন্দোলন হয়েছিল– ভিডিওটি ছিল সেই সময়ে ধারণ করা।

এর বাইরে, “বাসে আগুনের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ৩ নেতা-কর্মী আটক” শিরোনামে প্রথম আলো পত্রিকায় ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি সংবাদকে বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মসূচির খবর বলে প্রচার করা হচ্ছে। মূলত ২০১৪ সালে মাগুরায় একটি বাসে আগুন দিতে গিয়ে গ্রেফতার হন তারা। এছাড়া প্রথম আলো এক বিবৃতিতে এটিকে ‘মিথ্যা প্রচারণা’ বলে নিশ্চিত করেছে।

এর আগে ২৮ জুলাই বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে ঢাকার নয়াপল্টনে এক পুলিশ কর্মকর্তা একজন সাংবাদিককে ছবি তুলতে বাধা দিচ্ছেন– এমন একটি ছবিও বেশ কয়েকটি (, , ) পোস্টে ছড়াতে দেখা গেছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০১৮ সালে পল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির বিক্ষোভ চলাকালে। সেখানে বাংলা টিভির প্রতিবেদক আরমান কায়সার ও ক্যামেরাম্যান মানিককে ছবি তুলতে বাধা দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার আনওয়ার হোসেন। 

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভারতের মনিপুরে চলমান জাতিগত সংঘাতেও পুরোনো ভিডিও ও ছবি ছড়াতে দেখা গেছে, যেগুলো ইতিমধ্যে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম এবং তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে। যেমন, একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে কুকিদের শারীরিকভাবে আঘাত করছে একজন পুলিশ। কিন্তু তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান বুম দেখেছে, ভিডিওটি গত বছর ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, মনিপুরের বিধানসভা নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীকে প্রহার করছে। 

ভারতের সামাজিক মাধ্যমে চার্চে আগুন জ্বলছে- এমন ভিডিও প্রচার করে বলা হয়েছিল ক্ষমতাসীন বিজেপি এই কাজের সাথে জড়িত। কিন্তু সেখানকার ফ্যাক্টচেকাররা নিশ্চিত করেছে, ভিডিওটি আসলে ফ্রান্সের। একইভাবে মনিপুরের কুকিদের বিরুদ্ধে মেইতেই জনগোষ্ঠী মিছিল করছে– এমন একটি ছবি যাচাই করে দেখা যায়, সেটি ছিল মূলত একটি মাদক-বিরোধী মিছিল।

আরো কিছু লেখা