মিনহাজ আমান

রিসার্চ-লিড, ডিসমিসল্যাব
আল জাজিরায় তারেক-জোবাইদাকে গ্রেপ্তারের কোনো খবর নেই
This article is more than 12 months old

আল জাজিরায় তারেক-জোবাইদাকে গ্রেপ্তারের কোনো খবর নেই

মিনহাজ আমান

রিসার্চ-লিড, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী জোবাইদা রহমানের গ্রেপ্তার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার একটি স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু ডিসমিসল্যাব যাচাই করে দেখেছে, তারেক ও জোবাইদা সম্পর্কিত আল জাজিরার স্ক্রিনশটটি সঠিক নয়। গণমাধ্যমটি এধরনের কোনো খবর প্রকাশ বা প্রচার করেনি। 

গত ১৪ জুন একাধিক ফেসবুক পেজ (, ), গ্রুপ এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়। যেখানে লেখা রয়েছে, “মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তারেক-জোবায়দা দম্পতি লন্ডনে গ্রেফতার”। ছবিতে আল জাজিরার একটি খবরের স্ক্রিনশট ব্যবহার করা হয়েছে যার শিরোনাম, “Bangladeshi political leader Tarique Rahman and wife Zubaida arrested in London”।

এছাড়া আল জাজিরার কথিত স্ক্রিনশটের নিচে লেখা হয়েছে, “লন্ডন পুলিশের দাবি, এই দম্পতি লন্ডনে নিয়ন্ত্রণ করেন ৩৮ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি! নেই বৈধ কোনো আয়ের উৎস।” স্ক্রিনশটে দেখা যায়, খবরটি প্রকাশের তারিখ ১৪ জুন।

ওয়েবসাইটে এমন কোনো খবর নেই

আল জাজিরার ওয়েবসাইটে বিভিন্নভাবে খুঁজে এমন কোনো খবরের সন্ধান পায়নি ডিসমিসল্যাব। ওয়েবসাইটটির সার্চ অপশনে স্ক্রিনশটের শিরোনামটি হুবহু সার্চ করে কিছু পাওয়া যায়নি। 

সংবাদমাধ্যমটির সার্চ অপশনে “tarique rahman” লিখে সার্চ করে ২০০৭ থেকে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৩১টি খবর পাওয়া যায় । কিন্তু এ সকল খবরের মধ্যে গত ১৪ জুন প্রকাশিত তারেক ও জোবাইদা রহমানের লন্ডনে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত কোনো খবর নেই। 

উল্লেখ্য, আল জাজিরা, লন্ডনে বসবাসরত তারেক রহমানকে নিয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ২০১৬ সালের ২১ জুলাই। এছাড়া ভাইরাল পোস্টের ছবিতে ব্যবহৃত তারেক ও জোবাইদার ছবিটি ব্যবহার করেও আল জাজিরায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। 

স্ক্রিনশটের শিরোনাম এবং একাধিক অনুচ্ছেদের টেক্সট আলাদাভাবে গুগল, বিং এবং ইয়ানডেক্স সার্চ ইঞ্জিনে বসিয়ে সার্চ করা হয়। কোনোটিতেই এই রিপোর্টের অস্তিত্ব মেলেনি। অর্থাৎ, এমন কোনো রিপোর্ট এই বড় তিনটি সার্চ ইঞ্জিন ইনডেক্স করেনি। 

এ ব্যাপারে আরো জানতে ডিসমিসল্যাবের পক্ষ থেকে আল জাজিরার এশিয়া প্যাসিফিক সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তিকে ইমেইল করা হয়েছে। উত্তর পাওয়া মাত্র তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। 

১০ মিনিটে ভুয়া খবর

আল জাজিরার এই ভুয়া স্ক্রিনশটের বৈশিষ্ট্য হলো এটির ফন্ট, নকশা এবং কাঠামো হুবহু আল জাজিরার সাইটের অন্য খবরের মতো। এটির টেক্সট বা বিবরণও অন্য কোনো উৎস থেকে কপি করা নয়। শুধু ছবিটি অন্য উৎস থেকে নেওয়া যা বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে স্ক্রিনশটটিকে দেখে নিখুঁত মনে হয়। 

কিন্তু একজন ওয়েব ডেভেলপার আল-জাজিরার সাইটে গিয়ে সেটির সোর্স কোড সম্পাদনা করে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে এই প্রতিবেদকের নাম ও ছবি দিয়ে এমন একটি ভুয়া খবর তৈরি করে দেখান, যা নিচে দেয়া হলো। 

ডানে-বামে স্লাইড করে দেখুন আসল ও সম্পাদিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

এমন ক্ষেত্রে সোর্স কোড সম্পাদনার পর পরিবর্তিত খবরের একটি অস্থায়ী প্রিভিউ পাওয়া যায়, তবে মূল সাইটের কন্টেন্টে কোনো পরিবর্তন হয় না। তিনি বলেন, এই ভুয়া ক্রিনশটটিও সম্ভবত এমন একটি অস্থায়ী প্রিভিউ থেকে নেওয়া হয়েছে, যেখানে মূল খবরের শিরোনাম, ছবি, টেক্সট ও ক্যাপশন সব কিছুই সম্পাদনা করা হয়েছে এবং অস্থায়ী প্রিভিউ পেইজ আসার পর তার স্ক্রিনশট নেওয়া হয়েছে।

এই প্রতিবেদক, স্ক্রিনশটে ছড়ানো প্রতিবেদনের কয়েকটি তথ্য নিয়ে একটি এআই টুলে বসিয়ে সংবাদের আদলে একটি প্রতিবেদন লিখে দিতে বলেন। এবং এআই টুলটি সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি শিরোনাম ও টেক্সটের একটি মিথ্যা প্রতিবেদন লিখে দেয়।  

এ ধরনের খবরের স্ক্রিনশট চোখে পড়লে তা সবার আগে যাচাই করে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন দৈনিক প্রথম আলোর মান উন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শক কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা। তিনি ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “প্রথম কাজ হলো, কোনো কিছু দেখামাত্র সন্দেহ করা। তারপর কোনো খবরের স্ক্রিনশট পেলে সেটি সেই সংবাদমাধ্যমে আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। না পাওয়া গেলে এ ব্যাপারে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে কিছু পাওয়া গেল কিনা সেটাও দেখতে হবে। এমনকি সত্যতা পাওয়া গেলেও অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো কী বলছে তাও দেখা উচিত।“

এমন ভুয়া খবর নতুন নয় 

এর আগে, গত ৩১ মে, দৈনিক প্রথম আলোর একটি খবরের ছবিকে সম্পাদনা করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ভুয়া উক্তি ছড়ানো হয়েছিল ফেসবুকে। এছাড়া, রংপুরের এক কিশোরের হোয়াইট হাউজ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সেরা হওয়ার ভুয়া খবর তৈরি করা হয়েছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং বিবিসির খবরের স্ক্রিনশটকে সম্পাদনা করে, যা পরবর্তীতে রিউমর স্ক্যানারের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে আসে।    

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রথম আলো, বিবিসি বাংলার মতো সংবাদমাধ্যমের নকল সাইট বানিয়ে করে ভুয়া নিউজ পোর্টাল তৈরির ঘটনাও ঘটেছিল। সে সময়, এসব ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের ঘটনার হদিস পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ডেনভার গার্ডিয়ান নামে একটি ভুয়া সংবাদমাধ্যমের বরাতে হিলারি-বিরোধী ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছিল।

আরো কিছু লেখা