
বাংলাদেশে এক জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের জন্য মাদ্রাসার হোস্টেলে অভিযান চালায় পুলিশ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে “তৌহিদী জনতা”র ব্যানারে একদল ইসলামপন্থী মব থানায় ঢুকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) কান ধরে উঠবস করিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে ছড়ানো এক ভিডিওতে এমন দাবি করা হয়েছে। তবে ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত বাসচালককে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে বেলপুকুর থানায় উপপরিদর্শক (এসআই) জহিরুল ইসলামকে গত ২৫ জানুয়ারি কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সেই ঘটনার দৃশ্য এটি।
ওয়েব পোর্টাল ব্লিটজ এর সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী সামাজিক মাধ্যম এক্সে গতকাল (২৬ জানুয়ারি) একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভিডিও-এর ক্যাপশনে তিনি লিখছেন, “তৌহিদী জনতা’ নামের মবের ব্যানারে ইসলামপন্থীরা বাংলাদেশে একটি পুলিশ স্টেশনে ঢুকে পড়ে এবং একটি মাদ্রাসার ডরমিটরিতে এক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালানোর ‘অপরাধে’ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করে।”
৪৬ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে একজনকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিডিও এর উপরে ডান কোণে লাল-সবুজ রং-এর ‘ইনসাইডারস’ লোগো দেখা যায়। তবে ভিডিওতে কোনো অডিও শুনতে পাওয়া যায় না। পোস্টটি এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০০ বার দেখা হয়েছে, শেয়ার হয়েছে প্রায় দেড় শবার। ব্লিটজ-এর এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও এটি রিপোস্ট করা হয়েছে।

‘বিডি ইনসাইডারস’ এর ফেসবুক পেজে ভিডিওটি পাওয়া যায়। একই দৈর্ঘ্যের একই ভিডিও গত ২৬ জানুয়ারি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “পুলিশের এমন হাল কি আগে কখনো ছিল? প্রিয় পুলিশ ভাইয়েরা, আজ আপনারা যাদের সঙ্গ দিচ্ছেন, তারাই আপনাদের ইজ্জত কেড়ে নিয়েছে।” স্থান ও কাল হিসেবে “২৫ জানুয়ারি, ২০২৬। বেলপুকুর থানা, রাজশাহী” উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিওতে লেখা, “ওসিকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে তৌহিদী জনতা।”
ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, “কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে এই যে কট। পুলিশ কট। কী একটা মজার বিষয় দেখেন। দায়িত্ব এমন একটা জিনিস, দায়িত্ব যদি ভালোভাবে পালন না করে তো এরকম পরিস্থিতি তাদেরকে আসবে, মোকাবিলা করতে হবে। দেখেন… এই যে… দেখেন। আজকে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ। তার লজ্জা থাকা দরকার। দেখেন… খুবই মজার বিষয়। দেখেন।” ভিডিওটি দেড় লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।
কিওয়ার্ড সার্চে মূল ঘটনার সম্পূর্ণ ভিডিও খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। ফেস দ্যা পিপল এ ঘটনায় তাদের ইউটিউব চ্যানেলে ১২ মিনিট ১১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করে শিরোনামে লিখেছে, “ট্রাফিক সার্জেন্টকে কান ধরাল জনতা, থানার ওসি অবরুদ্ধ!” ভিডিও-এর ১ মিনিট ৪ সেকেন্ড থেকে একই কণ্ঠস্বরের ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে এই যে কট। পুলিশ কট। কী একটা মজার বিষয় দেখেন। দায়িত্ব এমন একটা জিনিস, দায়িত্ব যদি ভালোভাবে পালন না করে তো এরকম পরিস্থিতি তাদেরকে আসবে, মোকাবিলা করতে হবে। দেখেন… খুবই লজ্জাজনক একটা অবস্থা। দেখেন… এরকম সে কান ধরে আছে দেখেন। ঘুষখোর, সবাই বলছে ঘুষ খেয়ে টাকা দিয়ে ড্রাইভারকে ছেড়ে দিছে দেখেন। বাংলাদেশে এর চাইতে লজ্জাজনক আমি মনে করি আর কিছু হয় না। এই যে… দেখেন। আজকে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ। তার লজ্জা থাকা দরকার। দেখেন… খুবই মজার বিষয়।”

“ঘুষ খেয়ে টাকা দিয়ে ড্রাইভারকে ছেড়ে দিছে” দাবি করা ভিডিও-এর ১ মিনিট ২৯ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত অংশটুকু ‘বিডি ইনসাইডারস’ এর ভিডিওতে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর পোস্টে কোনো অডিও নেই।
এ ঘটনায় দৈনিক ইত্তেফাকের একটি ভিডিও প্রতিবেদন ছাড়াও একাধিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন (১, ২) খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, গত রবিবার (২৫ জানুয়ারি) রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অটোরিকশার তিন যাত্রী নিহত হন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত বাসচালককে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ জনতা বেলপুকুর থানায় উপপরিদর্শক (এসআই) জহিরুল ইসলামকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে। এ সময় থানার ওসিকেও ঘটনাস্থলে আটকে রাখা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ পুলিশ বাসচালককে পালাতে সাহায্য করেছে। তবে পুলিশ দাবি করেছে তারা পৌঁছানোর আগেই চালক পালিয়ে যায়।
অর্থাৎ, এই ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি ধরতে মাদ্রাসায় অভিযান চালানোর কারণে পুলিশকে কানে ধরানোর দাবির কোনো সম্পর্ক নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে ঐ ঘটনা ঘটে।