তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
Fact-check report debunking a false claim that Hindu student Abhi Das was murdered in Bangladesh, showing an unrelated 2025 Narayanganj body recovery video falsely shared on X (Twitter).

ভারত থেকে পরিচালিত এক্স অ্যাকাউন্টে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে অভির মরদেহ উদ্ধারের দাবিতে

মো. তৌহিদুল ইসলাম

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

বাংলাদেশে হিন্দু শিক্ষার্থী অভি দাসকে ইসলামপন্থী উগ্র জনতা বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় নদীতে ফেলে দিয়েছে দাবিতে একটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে, অভি দাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৫ সালের নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার। তাছাড়া পোস্টের ছবিতে থাকা অভি নওগাঁ সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ভয়েজ অব হিন্দুজ নামের ভারত থেকে পরিচালিত এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে লেখা হয়, “ভয়াবহ সব দৃশ্য। ইসলামপন্থী উগ্র জনতা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু শিক্ষার্থী অভি দাসকে বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় নদীতে ফেলে দিয়েছে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।” ১ মিনিট ৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের উপস্থিতিতে একটি বস্তা থেকে মরদেহ বের করা হচ্ছে। ভিডিওর মধ্যে লেখা, “হিন্দু শুন্যের বাংলাদেশ।” পোস্টটি এ পর্যন্ত ৫২ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে, শেয়ার হয়েছে ২২০০ বারের বেশি। একই দাবিতে একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট (, , ) থেকেও ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে। 

ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে গেলে সময় টিভির একটি সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। ১৮ জানুয়ারিতে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “নদীতে মিললো নিখোঁজ কলেজছাত্র অভির মরদেহ, পোশাক দেখে শনাক্ত।” প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ জানুয়ারি বিকেলে নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় একটি যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে নিহতের পরিচয় পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ভুক্তভোগীর নাম অভি। তিনি আদমদীঘী উপজেলার সান্তাহারের বাসিন্দা রমেশ চন্দ্রের বড় ছেলে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পোস্টমর্টেম রিপোর্টের পর জানা যাবে বলে জানায় নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিয়ামুল ইসলাম।

এক্স অ্যাকাউন্টের পোস্টগুলোতে আরও দাবি করা হয়, মৃত অভি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তবে সময় টিভির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভি নওগাঁ সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। এছাড়াও একই ঘটনা নিয়ে উত্তরভূমি নামের আরেকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই তথ্য উল্লেখ থাকতে দেখা যায়।

আলোচ্য এক্স পোস্টে সংযুক্ত ভিডিওটির সূত্র যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং -এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ “সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস” থেকে প্রকাশিত ২০২৫ সালের ২১ আগস্টের একটি পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। সেই বছরের আগস্টে একই ভিডিও ফেসবুকে ভিন্ন দাবিতে প্রচারিত হলে সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস এটিকে মিথ্যা জানিয়ে একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন পোস্ট করে। এতে মূল ঘটনা উল্লেখের পাশাপাশি মূল ভিডিওর আর্কাইভ লিংকও যুক্ত করা হয়। পোস্টে জানানো হয়, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ২০২৫ সালের জুন মাসের একটি ঘটনার। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় ড্রেন থেকে এক যুবকের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করার দৃশ্য এটি।

অধিকতর যাচাইয়ের স্বার্থে আর্কাইভ লিংক থেকে মূল ভিডিও বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব। এতে দেখা যায়, সম্প্রতি অভির মরদেহের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের ঘটনার ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে। মূল ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৭ জুন।

ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে পোস্ট হওয়া এই পুরোনো ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা, “আজকে ফতুল্লা দক্ষিণ শিয়াচর লালখা এলাকা একটি বস্তার মধ্যে এক যুবকের লাশ পাওয়া গেল ভিডিও শেয়ার করুন। পূর্ব শিয়াচর লালখা এডভান্স গার্মেন্টসের সামনে নতুন রাস্তা নামে পরিচিত রাস্তার পাশে ডেরেন থেকে বস্তা ভর্তি লাশ উদ্ধার” (বানান অপরিবর্তিত)। ৪ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে দৃশ্যমান ব্যক্তিদের অবস্থান, পোশাক, কার্যক্রম সবই অভির মরদেহের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন (, , , ) থেকে পাওয়া ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে ভিডিওর দৃশ্যের মিল দেখা যায়।

প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, ফতুল্লার এই ঘটনায় মৃত ব্যক্তির নাম জনি সরকার। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জনি সরকারের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাবা করুণা সরকার ঘুমের মধ্যে রুটি বানানোর বেলন দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। পরে নিজেই থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন। তবে পরবর্তীকালে পুলিশের তদন্তে ঘটনার মূল রহস্য বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ, এক্সে অভির মৃত্যু নিয়ে হওয়া পোস্টের ভিডিওতে যে ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার হতে দেখা যাচ্ছে তিনি অভি নন, জনি সরকার।

উল্লেখ্য, গত ১৮ জানুয়ারি পুরান ঢাকার ভাট্টিখানা এলাকা থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদনে ওই শিক্ষার্থীর নাম আকাশ সরকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

অভি দাসের মৃতদেহ উদ্ধারের দাবিতে পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলোর বিস্তারিত তথ্য খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় সেগুলোর অবস্থান ভারতে।

অর্থাৎ, অভি দাসকে ইসলামপন্থী উগ্র জনতা বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় নদীতে ফেলে দিয়েছে দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার এবং তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরও শিক্ষার্থী নন।

আরো কিছু লেখা