
বাংলাদেশে একজন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নারী তার ঘর ও ছেলেকে রক্ষা করার জন্য তলোয়ার হাতে কয়েক শ কট্টরপন্থী মুসলিম জনতাকে রুখে দাঁড়িয়েছেন দাবিতে সামাজিক মাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ঐ নারী খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নন, বরং মুসলিম পরিবারের সদস্য। ভিডিওটি সুনামগঞ্জে চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তির বাড়িতে গ্রামবাসীর হামলার।

এর আগেও একই ভিডিও ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে প্রচার করা হয়েছে। কখনো দাবি করা হয়েছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশে হিন্দু পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা বলে, কখনো দাবি করা হয়েছে এটি ভারতের মুসলিম বাড়িতে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) চরমপন্থীদের হামলা বলে।
গত ১ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত ডক্টর মালাউফ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, নিজের শিশুসন্তান ও ঘর রক্ষায় এক নারী রামদা সদৃশ একটি অস্ত্র হাতে হামলাকারীদের বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও উত্তেজিত জনতা তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে তারা ঘরটি ভেঙে দেয়। ভিডিওর ইংরেজি ক্যাপশনের বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “বাংলাদেশে একজন খ্রিস্টান নারী তার ঘর ও ছেলেকে রক্ষা করার জন্য তলোয়ার হাতে তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া কয়েক শ কট্টরপন্থী মুসলিম জনতার সামনে রুখে দাঁড়িয়েছেন।”
এ পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় সাড়ে আট লাখবার দেখা হয়েছে, রিপোস্ট করা হয়েছে ৫ হাজারের বেশি। ইংরেজিতে এক ব্যবহারকারী মন্তব্যে লিখেছেন, “মুসলমানরা কতটা ভয়াবহ সে বিষয়ে বলে শেষ করা যাবে না। তারা পুরোপুরি বর্বর।” আরেকজন লিখেছেন, “কী এক ভয়ংকর ধর্ম, এটি একটি ধর্মীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ছাড়া আর কিছুই নয়; পুরো বিশ্ব এই ক্যান্সারের সাক্ষী হয়ে থাকুক যা প্রতিটি দেশে আক্রমণ করছে এবং এই অশুভের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের পরিকল্পনার ওপর ভরসা রাখুক।”
পোস্টটি বাবা বানারাস নামের এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে রিপোস্ট করা হয়েছে যাতে একই দাবি করা হয়। ৩১ মার্চের এই পোস্টটিও ৫ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে, রিপোস্ট করা হয়েছে দুই হাজারের বেশি। মন্তব্যে অস্ত্র চালনা করছেন এক ব্যক্তি এমন ভিডিও যুক্ত করে একজন লেখেন, “আমরা কীভাবে এই অসহায় মানুষদের রাইফেল দিয়ে সাহায্য করতে পারি?? দয়া করে কেউ আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিন। আমেরিকার সাহায্য প্রয়োজন তাদের!!!” আরেকজন লিখেছেন, “ইনি খ্রিস্টান নন, বরং একজন হিন্দু নারী। তবে যাই হোক, আসল কথা হলো তিনি হিন্দু বা খ্রিস্টান যেই হোন না কেন, ইসলামের নামে তাদের সঙ্গে এমনটা করা মোটেও উচিত নয়।”
কিফ্রেম ও প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ ঘটনার ভিডিও প্রতিবেদন (১, ২) পাওয়া যায়, যা ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। চ্যানেল টোয়েন্টিফোর ও ডিবিসি নিউজ ডেইলি তাদের ইউটিউব ও ফেসবুক পেজে জানায়, ভিডিওটি সুনামগঞ্জে চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তির বাড়িঘরে গ্রামবাসীর ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর ঘটনার। সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৫ মার্চ সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ কুরশি গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক চুরির ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে “চোর নির্মূল কমিটির” বৈঠক থেকে উত্তেজিত জনতা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালান চুরির অভিযোগ ওঠা দুজনের বাড়িতে।

ঘটনার বিবরণে বলা হয়, ২৪ মার্চ রাতে উত্তর কুরশি গ্রামের দোলন মিয়ার বাড়িতে গরু চুরির সময়ে আটক করা হয় মইনপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামকে (২৫)। এ সময় তার সঙ্গে থাকা তিনজন পালিয়ে যান। আটক সাইফুল স্বীকারোক্তি দেন তাঁর সঙ্গে মইনপুর গ্রামের আবু হানিফা, দক্ষিণ কুরশির আলী হোসেন ও তারেক মিয়া ছিলেন। প্রথম আলোর তথ্যমতে, শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে হামলা থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করা যে নারীকে ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি তারেক মিয়ার স্ত্রী।
অর্থাৎ, ভিডিওতে থাকা নারী হিন্দু নন, বরং মুসলিম পরিবারের সদস্য। আবার তার উপর হামলার ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক কারণে নয়, বরং চুরির অভিযোগে গ্রামবাসীর হামলার।
তবে আগেও এই ঘটনার একই ভিডিও ছড়িয়েছে একাধিক সাম্প্রদায়িক দাবিতে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে ভারত থেকে পরিচালিত বেশ কয়টি অ্যাকাউন্ট (১, ২, ৩) থেকে গত ২৭ মার্চ ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “বাংলাদেশে পাথর নিক্ষেপকারী একদল কট্টরপন্থী মুসলিম পুরুষের হাত থেকে নিজের ঘর ও সন্তানকে বাঁচাতে একজন সংখ্যালঘু হিন্দু নারী বীরত্বের সঙ্গে তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছেন। ”ইন্ডিকোর নামে সংবাদমাধ্যম পরিচয় দেওয়া এক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি পোস্ট করে জানানো হয়েছে, “ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে একটি হিন্দু পরিবার একদল উত্তেজিত জনতার হামলার শিকার হয়েছে।” একই দাবি করা হয়েছে দেশভক্ত টুয়েন্টিফোর নামে আরেকটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে।
অন্যদিকে গত ২৭ মার্চ পাকিস্তানের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে হুবহু একই ভিডিও পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “ভারতে কেউই নিরাপদ নয়!! বিজেপির চরমপন্থীরা একটি মুসলিম বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। ওই নারী তলোয়ার তুলে নিয়ে নিজের এবং তার সন্তানের সুরক্ষার চেষ্টা করেন। উন্মত্ত জনতা বাড়িটিতে ভাঙচুর চালায়। মোদির দেশে এখন সন্ত্রাসীদের রাজত্ব চলছে।” তাছাড়া ফেসবুকে সংবাদমাধ্যম পরিচয় দেওয়া পাকিস্তান রিলোডেড নামের একটি পেজ থেকে একই ক্যাপশনে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এর পরদিন সিন্ধ নিউজ নামের একটি পাবলিক গ্রুপ থেকেও একই দাবিতে ভিডিওটি প্রচার করা হয়েছে।



তবে ছড়িয়ে পড়া দাবিটি ভুয়া জানিয়ে ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট গত ২৮ মার্চ তাদের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশে হিন্দু নারীর ঘরে মুসলিমদের হামলা কিংবা ভারতে মুসলিমদের বাড়িঘরে বিজেপি সমর্থকদের হামলা বলে ছড়ানো উভয় দাবি অসত্য এবং ঐ নারী মুসলিম পরিবারের সদস্য। তবে সম্প্রতি ভিডিওটি পুনরায় ছড়াচ্ছে সেই নারী খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হওয়ার ভিন্ন দাবিতে।
অর্থাৎ, সামাজিক মাধ্যমে ভারত থেকে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশে এক হিন্দু পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা বলে এবং পাকিস্তান থেকে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট থেকে একে ভারতের একটি মুসলিম বাড়িতে বিজেপি চরমপন্থীদের হামলা বলে দাবি করার পর বর্তমানে তা কট্টরপন্থী মুসলিম জনতাকে খ্রিস্টান নারীর রুখে দেওয়ার ভিডিও বলে প্রচার করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে, যা সঠিক নয়।