
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোটকেন্দ্র দখল বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের দাবিতে ব্যবহার করা হয়েছে এসব ভিডিও। তবে ফ্যাক্টচেক করে দেখা গেছে, ছড়িয়ে পড়া পোস্টের এই দাবিগুলো ভুয়া এবং নির্বাচন উপলক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মহড়ার পুরোনো ভিডিও ব্যবহার করে তা ছড়ানো হচ্ছে।

রাজশাহীর একটি কেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়েরর দাবিতে ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন নামের এক পেজ থেকে একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। ১৭ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যালট বাক্স নিয়ে দৌড়ে পালানোর সময় সেনাবাহিনীর হাতে আটক হন একজন। ভিডিওটি শেয়ার করে একই পেজ থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, “রাজশাহীতে প্রশাসনের বাঁধা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক ভোটকেন্দ্র দখল করে ব্যালট বাক্য ছিনিয়ে নিয়েছে বিএনপি। কেউ ভোট কেন্দ্রে যাবেন না, ঘরে থাকুন নিরাপদ থাকুন। প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করুন।” পোস্টটি এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১১০০ বার শেয়ার হয়েছে, দেখা হয়েছে অন্তত ১ লক্ষ ৭০ হাজার বার।

প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে এ ঘটনার মূল ভিডিও খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। দেখা যায়, ভিডিওটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনুষ্ঠিত যৌথবাহিনীর মহড়ার।

৮ই ফেব্রুয়ারি নবীনগর সরকারী কলেজ মাঠের এই মহড়া লাইভ সম্প্রচার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ভিত্তিক গণমাধ্যম বিবিনিউজ। প্রায় ১১ মিনিটের ঐ লাইভ ভিডিও-এর ৪ মিনিট ৫২ সেকেন্ড থেকে দৃশ্য ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
ভোটকেন্দ্র দখল করার চেষ্টা করা হচ্ছে দাবিতে একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রচার করে বলা হয়েছে— “অবৈধ -সরকারের -এই অবহিত- নির্বাচনে নমুনা”। পোস্টটি ৪০০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে। একই ভিডিও পোস্ট করে আরেকজন লিখেছেন, “ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে এবং প্রিজাইডিং অফিসার আকুতি জানিয়ে সেনাবাহিনী চাইছেন।”

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ভোটকেন্দ্রে হট্টগোল চলছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ পোস্টও শেয়ার হয়েছে ৩০০ বারের বেশি।

তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, এটি ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা কোনো সত্যিকারের হামলার ঘটনা নয়। ভিডিওটি মূলত নির্বাচন উপলক্ষ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় আয়োজিত সেনাবাহিনীর মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার দৃশ্য। ভিডিওটির ২ সেকেন্ডের মাথায় একটি ব্যানারে স্পষ্ট করে ‘নিরাপত্তা মহড়া’ লেখাটিও দেখা যাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে। অর্থাৎ, নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি মহড়ার ভিডিওকে ভুলভাবে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দুইদিন আগেই ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে দাবিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয় “তৃণমূল আওয়ামী লীগ” নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে। ৫৫ সেকেন্ডের এই ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়, “ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের বর্তমান অবস্থা! নোয়াখালী বেগমগঞ্জ দুইদিন আগেই ভোট কেন্দ্র দখলের চেষ্টা।” পোস্টটি ৪০০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়। জয় বাংলা ১৯৭১ নামের পেজ থেকেও কাছাকাছি দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “নোয়াখালী ভোট কেন্দ্র দখল”।

সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ছড়ানো ভিডিওটির মতো হুবহু একই ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায় সংবাদমাধ্যম দেশ টেলিভিশন, একাত্তর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে। জানা যায়, ভিডিওটি নোয়াখালীতে যৌথবাহিনীর নির্বাচনী মহড়ার। গণমাধ্যমের এসব ভিডিও প্রতিবেদনে অস্ত্র হাতে থাকা বেশ কয়েকজনের পোশাক ও চেহারার সঙ্গে আলোচিত ভিডিওগুলোর কয়েকজনের পোশাক ও চেহারা হুবহু মিলে যায়। অর্থাৎ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ভোট কেন্দ্র দখলের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওগুলো মূলত নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রস্তুতির জন্য যৌথবাহিনীর একটি মহড়ার দৃশ্য।
এর আগেও যৌথ বাহিনীর মহড়ার ভিডিও দেবিদ্বারে বিএনপি-সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের দাবিতে ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে যৌথ বাহিনীর মহড়ার ভিডিও নির্বাচন বিরোধী আন্দোলন বলে প্রচার করা হয়েছে।