
সম্প্রতি আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন শেখ হাসিনা ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের যে কথা বলেছিলেন, তা ছিল মূলত অগ্নিসংযোগকারী ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নয়। দাবি করা হচ্ছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই বক্তব্যকে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান যৌক্তিক বলেছেন। তবে ডেভিড বার্গম্যানের লেখা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তিনি জয়ের বক্তব্যকে সঠিক বলেছেন দাবিটি সত্য নয়। তার মূল বক্তব্যের সঙ্গে দাবিটির মিল নেই।
“আজকের কণ্ঠ” নামের একটি পেজের পোস্টে দাবি করা হয়, “‘বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দেননি শেখ হাসিনা’—জয়ের দাবির পক্ষে জোরালো যুক্তি বার্গম্যানের।” পোস্টে যুক্ত ফটোকার্ডে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং ডেভিড বার্গম্যানকে দেখা যায় এবং শিরোনামে লেখা, “বার্গম্যানের বিশ্লেষণ জয়ের যুক্তিই সঠিক: শেখ হাসিনার টার্গেট ছিল শুধুই সন্ত্রাসী”।

পোস্টের ক্যাপশনে বিস্তারিত প্রতিবেদনটি দেখা যায়। পোস্টে লেখা, “জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন ফাঁস হওয়া একটি অডিও কথোপকথন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছিল, তার বিপরীতে এবার জোরালো যুক্তি উঠে এসেছে। আল-জাজিরা ও বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যমগুলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ‘প্রেক্ষাপট’ ছাড়া উপস্থাপন করায় জনমনে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল, তা স্পষ্ট করেছেন বিশিষ্ট ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান। তিনি স্বীকার করেছেন, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্তি মোটেও অযৌক্তিক নয় এবং শেখ হাসিনা প্রকৃতপক্ষে শান্তিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, বরং সন্ত্রাসীদের দমনেই কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।”
পোস্টে আরও বলা হয়, “সম্প্রতি আল-জাজিরায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেছিলেন, তার মা কখনোই সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দেননি। জয়ের এই দাবির সত্যতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ডেভিড বার্গম্যান দৈনিক প্রথম আলোতে লেখা এক উপ-সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেন, ফাঁস হওয়া ফোনালাপটি যদি পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপটসহ বিচার করা হয়, তবে এটি স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের যে কথা বলেছিলেন, তা ছিল মূলত অগ্নিসংযোগকারী ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নয়।”
বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথম আলো ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত ডেভিড বার্গম্যানের মতামতটি খুঁজে বের করে ডিসমিসল্যাব। ২৯ জানুয়ারিতে প্রকাশিত এই মতামতটি পরবর্তীতে বাংলা সংস্করণেও প্রকাশ করে প্রথম আলো। ডেভিড বার্গম্যানের লেখা মতামতটির শিরোনাম ছিল “হাসিনা বিক্ষোভকারীদের গুলি করার নির্দেশ দেননি, জয়ের এই দাবি কতটা সত্য?”

বার্গম্যানের মতামতে লেখা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ও তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ফজলে নূর তাপসের ফোনালাপটিকে যদি পুরো প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে জয়ের যুক্তির মতো করে ব্যাখ্যা করা অযৌক্তিক নয় যে শেখ হাসিনা ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের যে অনুমতির কথা বলছেন তা মূলত সহিংস হামলায় জড়িতদের ব্যাপারে প্রযোজ্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ক্ষেত্রে নয়।
তিনি আরও লেখেন, “শুধু তাপসের সঙ্গে এই ফোনালাপটি বিবেচনায় নিলে শেখ হাসিনা ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি স্পষ্ট হয় না। কিন্তু ফোনালাপের বাইরে যেসব প্রমাণ আছে, সেগুলো শক্তভাবে বোঝায় যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ তাঁর সিদ্ধান্তের মধ্যেই ছিল।”
বার্গম্যান এটা লিখে শেষ করেছেন, যদি শেখ হাসিনাকে ‘বেনেফিট অব ডাউট’ও দেওয়া যায় যে তিনি শুধু ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধেই নির্দেশ দিতে চেয়েছিলেন, তবুও বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধেও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছে। এবং, এই বিষয়ে বাহিনীগুলোকে সংযত রাখতে শেখ হাসিনা পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ, ডেভিড বার্গম্যানের পুরো লেখা থেকে স্পষ্ট, তিনি সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্তিকে সঠিক বলেছেন যদি ফোনালাপটিকে পুরো প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায়। তার মূল লেখার বক্তব্য ভিন্ন।
আজকের কণ্ঠের ফেসবুক পোস্টের ব্যাপারে জানতে চাইলে ডেভিড বার্গম্যান ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “এই পোস্টটি আমার লেখার একটি বিকৃতি। আমি বলেছিলাম, শুধু ফাঁস হওয়া ফোনালাপটি শুনলে হাসিনার নির্দেশটি সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ক্ষেত্রে ছিল নাকি শুধু সহিংস বিক্ষোভকারীদের ক্ষেত্রে ছিল এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে, আমার নিবন্ধে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শকের দেওয়া সাক্ষ্য এবং নির্দেশ দেওয়ার পর সাধারণ বিক্ষোভকারীদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সব তথ্য-প্রমাণ একসাথে বিচার করলে দেখা যায়, হয় ফোনালাপে উল্লিখিত হাসিনার নির্দেশটি সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপরই প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে ছিল, অথবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বিষয়টিকে অন্তত সেভাবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং হাসিনা তার নির্দেশকে এভাবে ব্যাখ্যা করা থামাতে কোনো পদক্ষেপই নেননি।”
উল্লেখ্য, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। গত ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন শেখ হাসিনা সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দেননি।