আহমেদ ইয়াসীর আবরার

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
জকসু নির্বাচনী ফলাফল সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য, ভুল সংশোধন করেনি গণমাধ্যমগুলোও

জকসু নির্বাচনী ফলাফল

সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য, ভুল সংশোধন করেনি গণমাধ্যমগুলোও

আহমেদ ইয়াসীর আবরার

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

গত ৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন। ফলাফল ঘোষণা করা হয় একদিন পর, ৭ জানুয়ারিতে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে চলেছে নানা ধরনের আলোচনা। এরমধ্যে ছড়িয়েছে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য। জকসুতে ছাত্রশিবিরের পুরো প্যানেল জয়ী হয়েছে- এমন দাবিতে একাধিক পোস্ট হতে দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। কোনো কোনো ব্যবহারকারী একই দাবিতে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও শেয়ার করেছে। ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, জকসু নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্যানেলের সবাই নির্বাচিত হয়েছে দাবিটি সত্য নয়। মোট ২১টি পদের মধ্যে শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে ভিপি-জিএস-এজিএসসহ মোট ১৬ জন নির্বাচিত হয়েছে। ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ৪ জন, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর ফল পরিবর্তনের পরেও একাধিক গণমাধ্যমে সংশোধন হয়নি সে তথ্য। 

ছাত্রশিবিরের পুরো প্যানেল জিতেছে দাবি ফেসবুকে

“জগসু ছাত্র শিবিরের পুরো প্যানেল জয় হয়েছে।। আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বিজয়ী রিয়াজুল ইসলাম নবনির্বাচিত ভিপি। অভিনন্দন” এই ক্যাপশনে ফেসবুকে এক ব্যবহারকারী একটি লাইভ করেন ৭ জানুয়ারি রাত ১১টা ৪০ মিনিটে। একই দাবিতে একটি ভেরিফাইড প্রোফাইল থেকে ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামানের একটি অভিনন্দন জানানো ফটোকার্ড পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ❤️ জকসু নির্বাচন-২০২৫ শিবিরের পুরো প্যানেল বিপুল ভোটে এক ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে আবারও ইতিহাস তৈরি করলো😊”। 

ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল পুরোটাই জয় লাভ করার দাবিটি সত্য নয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে নির্বাচনের ফলাফল পোস্ট করা হয়। পোস্টের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদসহ মোট ১৬টি পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮টি সম্পাদকীয় পদ এবং ৫টি নির্বাহী সদস্য পদ। ৪টি পদে নির্বাচিত হয়েছে ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত “ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান” প্যানেল থেকে। এর মধ্যে ৩টি সম্পাদকীয় পদ এবং অন্যটি নির্বাহী সদস্য পদ। এর বাইরে, নির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত মো: জাহিদ হাসান ছিলেন স্বতন্ত্র।

জকসু নির্বাচনী ফলাফল সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য, ভুল সংশোধন করেনি গণমাধ্যমগুলোও
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের পোস্ট (বামে); সদস্যদের প্রাপ্ত ভোটের তালিকায় দেখা যাওয়া সাদমান সাম্য হলো ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত “ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান” প্যানেলের এবং মো: জাহিদ হাসান হলো স্বতন্ত্র প্রার্থী (ডানে)

অর্থাৎ, জকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল বিজয় হওয়ার দাবিটি সত্য নয়।

যে ভুল সংশোধন করেনি গণমাধ্যমও

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও দেখা গেছে ভুল তথ্য। প্রথম আলো, সমকাল, আমার দেশ, বণিক বার্তা এবং দ্য ডেইলি সান বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছাত্রশিবিরের পাশাপাশি ছাত্রদলের প্যানেল থেকেও নির্বাচিত হয়েছে ৫ জন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, “অপর দিকে ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ–সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল পাঁচটি পদে জয় পেয়েছে।” আমার দেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবহন সম্পাদক, পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদের পাশাপাশি ছাত্রদল সমর্থিত নির্ভীক জবিয়ান ঐক্য পরিষদের সাদমান সাম্য ও ইমরান হাসান ইমন জকসুর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বণিক বার্তা ও সমকালের প্রতিবেদনেও ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ থেকে পাঁচটি পদে জয়ী হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। দ্য ডেইলি সান বাংলার প্রতিবেদনে ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত প্রার্থীর সংখ্যা সঠিক উল্লেখ করলেও প্রতিবেদনের শেষে উল্লেখ করা হয়, “এ ছাড়া ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেলে দুজন বিজয়ী হয়েছেন। তারা হলেন মোহাম্মদ সাদমান আমিন (৩ হাজার ৩০৭ ভোট), ইমরান হাসান ইমন (২ হাজার ৬৩৬ ভোট)।”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল পেজ থেকে হওয়া পোস্টে বিজয়ীদের তালিকা থেকে দেখা যায় ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ–সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল থেকে মোট ৪ জন প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তারা হলেন, তাকরিম মিয়া (সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক), মোঃ মাহিদ হোসেন (পরিবহন সম্পাদক), মোঃ রিয়াসাল রাকিব (পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক) এবং সাদমান সাম্য (নির্বাহি সদস্য)। এছাড়া, ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের বাইরে জয়ী আরেকজন প্রার্থী হলেন মোঃ জাহিদ হাসান, যিনি নির্বাহী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

এই ভুলের উৎপত্তি হয় জকসুর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার সময়। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ ভিডিও পাওয়া যায় সংবাদমাধ্যম দৈনিক ইত্তেফাকের ইউটিউব চ্যানেলে। ১৫ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের এই ভিডিওর ২ মিনিট ১৯ সেকেন্ডে সদস্য পদে বিজয়ী ৭ম প্রার্থীর নাম হিসেবে ইমরান হাসান ইমনের নাম ঘোষণা করা হয়। ইমরান হাসান ইমনের অফিশিয়াল ভেরিফাইড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ৮ তারিখ রাত ১টা ৯ মিনিটে পোস্ট করা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ, সদস্য পদে বিজয়ী।” তবে এক ঘন্টার পর, ২টা ১৪ মিনিটে একই অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়, “জকসু নির্বাচন কমিশন প্রহসন শুরু করেছে, আমাকে সদস্য পদ থেকে আবার বাদ দিয়েছে, ৭ থেকে ৮ নম্বরে নিয়েছে?”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল পেজ থেকে ৮ তারিখ ভোর ৫টা ৩৪ মিনিটে প্রকাশিত বিজয়ীদের তালিকা যাচাই করলে ৭ম সদস্য হিসেবে দেখা যায় ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের আব্দুল্লাহ আল ফারুকের নাম। তিনি ভোট পেয়েছেন ২৯১৭টি। ফলাফল ঘোষণার সময় আব্দুল্লাহ আল ফারুককে ৬ষ্ঠ সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। মূলত, ৪র্থ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত মেহেদী হাসানের নাম সেই ঘোষণায় আসেনি। মূল ফলাফলে মেহেদী হাসানকে নির্বাচিত উল্লেখের পর ৪র্থ থেকে ৭ম সদস্য হিসেবে ঘোষিত অন্যান্য প্রার্থীরা এক পদ নিচে নেমে যায়। এই বিষয়ে সমকালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও তাদের একই প্রতিবেদনে লেখা ভুল তথ্য সংশোধন করা হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিডিও ছড়িয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দাবিতে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ‘নারায়ে তাকবীর’ স্লোগানে প্রকম্পিত- এমন দাবিতে একাধিক ভিডিও পোস্ট হতে দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। “চকরিয়া-পেকুয়া ছাত্রসংবাদ” নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “যে স্লোগান দেওয়ার কারণে মাইক কেড়ে নিয়েছিলো আজকে সেই স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল জবি ক্যাম্পাস.!” ভিডিওটিতে একটি গেইটে দলবদ্ধ ব্যক্তিদের “নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর” স্লোগান দিতে দেখা যায়। ভিডিওটি একই দাবিতে একাধিক পেজ ও প্রোফাইল (, , ) থেকে পোস্ট হতে দেখা গেছে।

ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, মূল ভিডিওটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ফটকের। ফটকে থাকা “প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত” সাইনবোর্ড, পাশের নোটিশ বোর্ড, গেইট এবং উপরের কমলা রঙের “এক্সপ্রেস মানি” বোর্ড থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির একটি দৃশ্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করে আরেকটি ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়- “নারায়ে তাকবীর” “আল্লাহু আকবার” “লিল্লাহি তাকবীর” ধ্বনিতে কম্পিত হবে। বটরা কি সহ্য করবে এসব স্লোগান  🔥✊ অভিনন্দন শিবিরের পুরো প্যানেল কে।।” (বানান অপরিবর্তিত)।

এই ভিডিওটি যাচাই করতে গেলে ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ১০ তারিখের একটি ভিডিও। এনপিবি নিউজ নামের একটি পেজ থেকে পোস্ট হওয়া এই ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, “’নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’ স্লোগ্লানে প্রকম্পিত সিনেট ভবন।” ভিডিওতে যে স্থানটি দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের হুবহু মিল লক্ষ্য করা যায়।

প্রসঙ্গত, ৭ জানুয়ারি জকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ১৬ জন প্রার্থী বিজয়ী ঘোষণার পর “নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর” স্লোগান দিতে দেখা যায়। গত ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। 

আরো কিছু লেখা