
৫৩টি আসনে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। এমন দাবিতে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। প্রতিবেদনগুলোতে তথ্যসূত্র হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. জুবায়ের আহমদের একটি মন্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, দাবিটি সঠিক নয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জামায়াত জোট হেরেছে ২২টি আসনে। অন্যদিকে, ১০ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে, এমন মোট আসন রয়েছে ৫১টি। এর মধ্যে ২৬টি আসনে হেরেছে বিএনপি জোট এবং বাকি ৩ আসনে পরাজিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। অর্থাৎ, ৫৩টি আসনে নয়, জামায়াত জোট ১০ হাজারের কম ব্যবধানে হেরেছে ২২ আসনে।
‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম, “৫৩ আসনে ১০ হাজারের কম ব্যবধানে হেরেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা”। প্রতিবেদনটি অনলাইনের পাশাপাশি আমার দেশের প্রিন্ট সংস্করণের ৩য় পাতায় প্রকাশিত হয়। জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. যোবায়ের আহমদের বরাতে একই দাবি প্রকাশিত হয় গণমাধ্যম বার্তা বাজারেও।
প্রতিবেদনে লেখা হয়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের মাধ্যমে ২২৪ আসনে প্রার্থী দেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যার মধ্যে ৬৮ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বিভিন্ন আসনে ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে দলটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. যোবায়ের আহমদের আমার দেশকে জানান, ৫৩ আসনে ১০ হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। এসব আসনে জয় পেলে দলটির আসন সংখ্যা ১২০টির মতো থাকত বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দেবেন বলেও জানান তিনি।”
সত্যতা যাচাইয়ে প্রথম আলোর প্রকাশিত ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া আসনভিত্তিক ফলাফল থেকে বিজয়ী ও মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রাপ্ত ভোট সংগ্রহ করে তাদের মধ্যকার ব্যবধান গণনা করে ডিসমিসল্যাব।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে মোট ৫১টি আসনে। এই আসনগুলোতে ব্যবধানের মাত্রা ছিল ৩৮৫ ভোট থেকে ৯ হাজার ৯৩৮ ভোট পর্যন্ত। এর মধ্যে ২৬টি আসনে হেরেছেন বিএনপি ও মিত্র দলের প্রার্থীরা, ২২টি আসনে জামায়াত ও মিত্র দলের প্রার্থী এবং ৩টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। অর্থাৎ, ১০ হাজারের কম ভোটে পরাজিত প্রার্থী সবচেয়ে বেশি বিএনপি ও মিত্রদলের।
২২টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে কম ৯২৯ ভোটের ব্যবধানে জামায়াত জোট পরাজিত হয় কক্সবাজার-৪ আসনে। এই আসনে বিজয়ী বিএনপি ও মিত্র দলের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী পান ১ লাখ ২২ হাজার ৯০৯ ভোট। অন্যদিকে পরাজিত জামায়াত ও মিত্র দলের প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী পান ১ লাখ ২১ হাজার ৯৮০ ভোট।
এই ২২টি আসনের মধ্যে জামায়াত জোট সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৯৩৮ ভোটের ব্যবধানে কুমিল্লা-৫ আসনে পরাজিত হয়। এই আসনে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও মিত্র দলের প্রার্থী মোঃ জসীম উদ্দিন এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ও মিত্র দলের প্রতিনিধি মোবারক হোসাইন পান ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫ ভোট।
অন্যদিকে, বিএনপি ও মিত্রদলগুলো সবচেয়ে কম ব্যবধানে হারে মাদারীপুর-৫ আসনে, ৩৮৫ ভোটের ব্যবধানে।
১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হওয়া ৫১টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৪টি আসনে জয়ী হতে দেখা যায় জামায়াত ও মিত্র দলকে। ২৩টি আসনে বিএনপি ও মিত্র দল, ৩টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ১টিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হন।
ইতঃপূর্বে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়, জামায়াত ৫ হাজার এর কম ভোটে পরাজিত হয়েছে এমন আসনের সংখ্যা ৫৩টি। ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে দেখা যায় ৫ হাজারের কম ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে এমন আসনের সংখ্যা ২২টি, যার মধ্যে জামায়াত পরাজিত হয়েছে ৯টি আসনে। এই দাবিটিও মিথ্যা ছিল।