
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এরই প্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করে বলা হয়, ইসরায়েলের দিকে হাইপারসনিক মিসাইল ছুড়েছে ইরান। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি ইরান-ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের আগে থেকেই অনলাইনে রয়েছে।
ফেসবুকে সংবাদমাধ্যম পরিচয় দেওয়া দুইটি ভেরিফায়েড পেজ “বিডি২৪রিপোর্ট” (BD24report) ও “ডেইলি প্রিয়টাইমস” (Daily Priyotimes) থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হয়, “ই’স’রা’য়ে’লে’র দিকে হা’ইপা”র”স”নিক মি”সা”ই”ল ছুড়েছে ই”রা”ন।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত “বিডি২৪রিপোর্ট” থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে ৯ হাজারের বেশি।

ফেসবুকের আরও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয় (১, ২, ৩)।
এছাড়াও, সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খানের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও ভিডিওটি “কথিত” উল্লেখ করে পোস্ট করতে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “এটি ইসরায়েলের দিকে ইরানের সাম্প্রতিক কথিত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিওচিত্র। এসব ব্যালিস্টিক অস্ত্রের মধ্যে কিছু হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলসহ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে—যেমন ফাত্তাহ—যা ম্যাক ৫ থেকে ১৫ গতিতে পৌঁছাতে সক্ষম। অত্যন্ত উচ্চ গতিতে এগুলোকে রাতের আকাশ চিরে ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে।”

ভিডিওর মন্তব্যে পোস্টদাতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রকের উদ্ধৃতি দিয়ে আরও লেখেন, “এই মুহূর্তে এটি যাচাই করার সবচেয়ে দ্রুত উপায় ছিল গ্রক (এক্সের চ্যাটবট); বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে।”
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ভিডিওটি ২০ লাখের বেশি ব্যবহারকারী দেখেছেন। শেয়ার হয়েছে পাঁচ হাজার বারের বেশি। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে ষাট হাজারের অধিক।
মন্তব্যে একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “যারা বলে AI। হাইপাসনিক শব্দের চেয়ে বেশি গতি নেয়।” আরেকজন সংশয় প্রকাশ করে লেখেন, “মনে হচ্ছে এআই।”
ভিডিওর শুরুতে রাতের অন্ধকারে একটি আবাসিক এলাকা দেখা যায়। দৃশ্যের নিচের অংশে সাদা রঙের কয়েকটি একতলা ভবন, পার্ক করা গাড়ি ও রাস্তার বাতি রয়েছে। হঠাৎ মেঘলা আকাশে তীব্র গতিতে উজ্জ্বল লাল আলো বা জ্বলন্ত কোনো বস্তু উড়ে যেতে থাকে। বস্তুগুলোর পেছনে লাল রঙের লম্বা লেজ বা ধোঁয়ার মতো অংশ, দেখতে অনেকটা লেজার রশ্মির মতো। আর অডিওতে আকাশে কোনো বস্তু উড়ে যাওয়ার বিকট শব্দ। বস্তুগুলো দৃশ্যমান হওয়ার ঠিক একই সময়ে শব্দও শুনতে পাওয়া যায়। পাশাপাশি ভিডিও ধারণকারী বা আশেপাশে থাকা মানুষের কথাবার্তাও ভেসে আসছিল।
ফেসবুক ছাড়াও ইউটিউব (১, ২, ৩) ও এক্সে একই দাবিতে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে।
ভিডিওর সত্যতা যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ ও কিওয়ার্ড সার্চ ব্যবহার করা হয়। এতে দেখা যায়, ইরান ও ইসরায়েলের বর্তমান সংঘাত শুরুর বেশ আগে থেকেই ফুটেজগুলো অনলাইনে রয়েছে।
টিকটকের দুটি আলাদা অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটির দুইটি ভিন্ন ফুটেজের সবচেয়ে পুরোনো সংস্করণ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রথম ফুটেজটি ‘দ্য এক্স ফাইলস’ (The X Files) নামের একটি টিকটক অ্যাকাউন্টে থেকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি পোস্ট করা হয়েছিল। ক্যাপশনে লেখা, “কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু আকাশজুড়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।”

পরের ফুটেজটি আপলোড হয়েছে, ‘আর্কাইভ অ্যাভেইলেবল’ (Archive Available) নামের আরেকটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি পোস্ট করা সেই ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, “গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একাধিক ব্যক্তি এমন ভিডিও পাঠিয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন স্থান। একই ধরন। এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।” ভিডিও দুটির মন্তব্য যাচাইয়ে দেখা যায়, অনেক টিকটক ব্যবহারকারী এর প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে পোস্টদাতারা কোনো উত্তর দেননি। অনেকেই দৃশ্যগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন মন্তব্যে। আবার অনেকে ঘটনার স্থান ও সময়ও জানতে চেয়েছেন।
এছাড়াও টিকটক অ্যাকাউন্ট দুটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলো থেকে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের মহাকাশ ও মহাকাশযানের ভিডিও (১, ২, ৩, ৪, ৫) পোস্ট হয়।
“আর্কাইভ অ্যাভেইলেবল” নামের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে একটি ওয়েবসাইটও যুক্ত আছে। এটি মূলত আকাশে দৃশ্যমান বিভিন্ন অদ্ভুত বা অস্বাভাবিক ঘটনার একটি আর্কাইভ। সাইটটিতে একটি ডিসক্লেইমার দেওয়া আছে। সেখানে লেখা, “এখানে কোনো কিছুর ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না এবং কোনো কিছুকেই সত্য বা তত্ত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না।” সেখানে আরও বলা হয়, সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মটিতে প্রতি মাসে ৫ পাউন্ডের বিনিময়ে ‘প্রাইভেট আর্কাইভ’-এর ফুটেজগুলো দেখার সুযোগ দেয় তারা। অর্থাৎ, এটি রহস্যময় দৃশ্য নিয়ে কৌতূহলীদের জন্য তৈরি করা একটি ব্যবসায়িক সাইট, যেখানে তথ্যের ব্যাখ্যা না দিয়ে বরং মহাকাশের অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর দৃশ্য দেখানো হয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা শুরু করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। এই হামলার জবাবে ইরান পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোয় পাল্টা হামলা করে। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, চলমান এই সংঘাতের আগে থেকেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে রয়েছে।
আরও নিশ্চিত হতে গত ১ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে কোনো প্রকার মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় হয়েছে কি না, তা গুগলে কিওয়ার্ড সার্চ করে দেখা হয়। এতে কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বা সংস্থার প্রতিবেদনে এই ভিডিও বা এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তার মানে দাঁড়ায়, দৃশ্যটির সঙ্গে ইরান ও ইসরায়েল সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং সংঘাত শুরুর অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই এগুলো অনলাইনে রয়েছে।
দৃশ্যগত অসামঞ্জস্যতা
প্রথমত, ভিডিওর দ্বিতীয় ফুটেজটি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আকাশের তারাগুলোর একাংশ অস্বাভাবিকভাবে এদিক- সেদিক নড়াচড়া করছে।
দ্বিতীয়ত, গতিবিদ্যা অনুযায়ী দুইটি ফুটেজেই কিছু উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।
নাসার ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী যখন কোনো বস্তুর গতি শব্দের পাঁচ গুণের বেশি (ম্যাক ৫-এর বেশি) হয়, তখন তাকে হাইপারসনিক বলা হয়। ম্যাক (Mach) হলো শব্দের গতির একক। ম্যাক ১ (Mach 1) বলতে বাতাসে শব্দের স্বাভাবিক গতিকে বোঝায়, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৪৩ মিটার বা ঘণ্টায় প্রায় ১,২৩৪.৮ কিলোমিটার। সেই হিসাবে হাইপারসনিক মিসাইলের গতি সর্বনিম্ন ম্যাক ৫ হওয়ার অর্থ হলো, এটি শব্দের গতির চেয়ে ৫ গুণ বেশি বেগে ছুটতে সক্ষম।
ধরা যাক, কোনো বস্তু যদি পর্যবেক্ষকের অবস্থান থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে ম্যাক ৫ গতিতেও অতিক্রম করে, তবে তা চোখে দেখা যাবে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে। কারণ, আলোর গতি তুলনামূলক বেশি (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার)। তবে শব্দের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৪৩ মিটার হওয়ায় একই দূরত্ব অতিক্রম করতে শব্দের সময় লাগবে প্রায় ১৪.৬ সেকেন্ড।
কিন্তু ভাইরাল হওয়া ভিডিওর দুইটি ফুটেজেই দেখা যাচ্ছে, লাল আলো সদৃশ বস্তু যাওয়ার একই সময়ে শব্দ শোনা যাচ্ছে। যা স্বাভাবিক ক্ষেত্রে তো বটেই, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রেও শব্দ ও আলোর গতির বিশাল পার্থক্যের কারণে বাস্তবসম্মত নয়।
অর্থাৎ, ভিডিওর দৃশ্যগুলো ইসরায়েলের দিকে ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের বলে প্রচারিত দাবিটি ভুল। এবং ইরান- ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ভিডিওর উপাদান সামাজিক মাধ্যমে রয়েছে।