
মার্কিন সেনাদের চারটি ছবি সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিগুলো প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্সের অনেক সেনাসদস্য একটি গোপন অভিযানে ব্যর্থ হয়ে ইরানের হাতে বন্দী হয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, প্রচারিত ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে নির্মিত।
ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে আজ ৬ মার্চ একটি পোস্টে মার্কিন সেনাবাহিনীর ছবিগুলো প্রচার করা হয়। প্রথম ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হেলিকপ্টার থেকে প্যারাস্যুটের সাহায্যে একজন সেনা মাটিতে অবতরণ করছেন। দ্বিতীয় ছবিতে একাধিক মার্কিন সেনা হাত পেছনে রেখে সারিবদ্ধ ভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন। পাশেই মুখ ঢাকা অন্য সামরিক পোশাকের এক ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে।

তৃতীয় ছবিতে দুই বন্দুক ও মুখোশধারী সৈনিকের সামনে পেছনে হাঁটু গেড়ে তিন সেনাকে বসে থাকতে দেখা যায়। পেছনের দেওয়ালে ইরানের জাতীয় পতাকা ও সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি টাঙানো রয়েছে। শেষ ছবিতেও দেখা যায়, অনেক মার্কিন সেনাসদস্য নতজানু হয়ে বসে আছে। ছবিতে কয়েকজন বন্দুকধারী সেনা ও ইরানের পতাকাও রয়েছে।
ক্যাপশনে পোস্টদাতা লিখেছেন, “ডেল্টা ফোর্সের অভিযান ব্যর্থ: ইরানের হাতে বন্দি বহু মার্কিন সেনা, তেহরানের বার্তা এটা ভেনেজুয়েলা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি ব্যর্থ মার্কিন সামরিক অভিযান। বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স ইরানের ভেতরে একটি গোপন অভিযান চালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে সেই অভিযান সফল হয়নি এবং পরিস্থিতি দ্রুত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযানের সময় বহু মার্কিন সেনা তাদের হাতে বন্দি হয়েছে। এ বিষয়ে ইরানের কড়া বার্তা— তেহেরান বলছে এটা ইরান, ভেনেজুয়েলা নয়। এখানে এমন অভিযান চালাতে এলে তার মূল্য দিতে হবে।”(লেখা অপরিবর্তিত)
এ প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত, পোস্টে ১৯ হাজারের অধিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এবং পোস্টটি অন্তত ১২০০বার শেয়ার করা হয়েছে। পোস্টে মন্তব্য করা হয়েছে ৪০০-র বেশি।
ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল, পেজ ও গ্রুপ (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০) থেকে একই দাবিতে ছবিগুলো পোস্ট করা হয়।
ছবিগুলোর উৎস যাচাইয়ে প্রতিটি ছবি রিভার্স ইমেজ ধরে সার্চ করলে প্রচারিত প্রতিটি ছবি একই দাবিতে একাধিক দেশ থেকে (১, ২,৩, ৪, ৫) সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট হতে দেখা যায়।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ছবিগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে পোস্টে থাকা প্রত্যেকটি ছবিই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আলাদাভাবে পোস্ট হতে দেখা যায়। এর মধ্যে পোস্টে থাকা ছবিগুলোর মধ্যে ২য়, ৩য় ও ৪র্থ ছবির নিচে ডান কোণে গুগলের জেমিনি এআইয়ের (Gemini AI) সাদা লোগো দেখতে পাওয়া যায়। গুগলের এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে ছবি তৈরি বা সম্পাদনা করা হলে এই জলছাপের চিহ্ন থাকে। তবে বাংলাদেশে প্রচারিত দাবিগুলোতে গুগলের জেমিনির লোগো এডিট করে কেটে দেওয়া হয়েছে।
আরও বিস্তারিত যাচাইয়ে জেমিনির সিন্থ-আইডি ফিচার ব্যবহার করে জানা যায়, প্রত্যেকটি ছবি গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে। প্রতিটি ছবি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে টুলটি জানায়, সবগুলোতেই গুগল এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদনার চিহ্ন রয়েছে। এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করেও দেখা গেছে, প্রচারিত সব ছবিই এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
এছাড়া, দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যম বা অনলাইন গণমাধ্যমে ইরানের হাতে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের বন্দী হওয়ার ব্যাপারে কোনো সাম্প্রতিক প্রতিবেদনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, গোপন অভিযানে ব্যর্থ হয়ে ইরানের হাতে বহু মার্কিন সেনা বন্দীর দাবিতে প্রচারিত ছবিগুলো আসল নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেগুলো বানানো হয়েছে।
একই দাবিতে ছবিগুলো বিভিন্ন দেশেও প্রচারিত হলে, একাধিক তথ্যযাচাইকারী সংস্থার ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন থেকে (১, ২) মার্কিন সেনাদের বন্দী হওয়ার দাবিতে ছড়ানো গুলো যে এআই নির্মিত-তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে ইরানে অভিযান পরিচালনায় গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল মার্কিন ডেল্টা ফোর্স।