আবরার ইফাজ

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
সিরিয়া, লেবাননের পর একই ছবি গাজার বলে প্রচার

সিরিয়া, লেবাননের পর একই ছবি গাজার বলে প্রচার

আবরার ইফাজ
রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ধ্বংসস্তুপ ছুঁয়ে বের হয়ে আছে একটি হাত। আঙুলের ফাঁক গলিয়ে ডানা মেলেছে দুই পাতার কচি চারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিটি প্রচার করে বলা হচ্ছে, এ দৃশ্য ফিলিস্তিনের গাজার। যাচাইয়ে দেখা যায় ছবিটি অন্তত আট বছরের পুরোনো। এর আগে ভিন্ন সময়ে ছবিটিকে “সিরিয়ার শহীদ”, “লেবানন বিস্ফোরণে নিহত ব্যক্তির হাত থেকে অঙ্কুরিত গমের চারা” হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, আফগানিস্তানেরও কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন এটা তাদের দেশেরই কোনো ছবি। কেউ কেউ খোঁজার চেষ্টা করেছেন অলৌকিকত্ব। যাচাইয়ে দেখা গেছে, কোনো দাবিরই কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই, অনুপস্থিত বিশ্বস্ততার উপাদান। এ নিয়ে সম্প্রতি একটিসহ আগে আরো দুইবার ফ্যাক্টচেক হয়েছে।

বাংলাদেশে নেটিজেনদের দাবি

“ফিলিস্তিন এর গাজা শহরের এই ছবিটা দেখলে হঠাৎ মাথায় আসবে, ধ্বংসস্তুপের মাঝে একটা হাত দেখা যাচ্ছে। হাতের মাঝ থেকে গাছ বের হয়ে আসছে। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে এই ছবির পিছনের গল্পটা মাথায় আসবে। এই হাতটায় একটা খেজুর ধরা ছিলো। হয়তো খাওয়ার জন্য তুলে ছিলেন। কিন্তু খাওয়া হয়নি। খেজুরের বীজ থেকে জার্মিনেট হয়ে এমন চারার পর্যায়ে আসতে ৩ মাসের মত লাগে। তিন মাসে এই বীজ থেকে চারা রূপান্তরিত হয়ে গেলো। এতে অবাক করার কি আছে?  অবাক করার বিষয় হচ্ছে হাতটা। আংগুলগুলো স্পষ্ট, চামড়ার রং ঠিক জীবন্ত মানুষের মত। এতদিনে হাত, হাতের আংগুল পচে গলে যাওয়ার কথা। কাদের শরীর মৃত্যুর পরেও সুন্দর সতেজ রয়ে যায়, বলুন তো?”- এই ক্যাপশনটিসহ ছবিটিকে গত কিছুদিন ধরেই শেয়ার হতে দেখা যায় ফেসবুকে (, , , , )। 

২০১৫ সাল থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি বড় ঘটনার পর ছবিটিকে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আসতে দেখা যায়। সম্প্রতি ফিলিস্তিনের খান ইউনিস এলাকার নাসের হাসপাতালের প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাক্টিভ সার্জারির প্রধান ডাক্তার আহমেদ মুগরাবি এই ছবিটি তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করেন। তিনি বলেন, “ছবিটিতে ধ্বংসস্তুপের নীচ থেকে সামান্য দৃশ্যমান একটি হাতের তালুতে খেজুর ধরে থাকতে দেখা যাচ্ছে এবং খেজুরের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে চমৎকার লম্বা পাতাও তৈরি হয়েছে। ‘অলৌকিক’ যে বিষয়টি এ ছবিকে আকর্ষণীয় করেছে তা এর  অঙ্কুরোদগম প্রক্রিয়া নয়, বরং লাশটি কত দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসস্তুপে এইভাবে রয়ে গেছে (কমপক্ষে তিন মাস অথবা তার বেশি)।”  একই পোস্ট আরেকজন ফিলিস্তিনি ডাক্তার মোহানাদ ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেন। তাঁদের পোস্টে ছবিটিকে সরাসরি গাজার না বলা হলেও অনেকেই ভেবে বসেন যে ছবিটি গাজার। এর কারণ এই হতে পারে যে, এক জায়গায় আহমেদ মুগরাবি লিখেছেন, “এ যেন আল্লাহর তরফের কোনো নিদর্শন যে এই মৃতদেহটি কোনো শহীদের”।

ছবিটিকে গাজার বলে যারা ধরে নিয়েছেন তাদের মধ্য একজন হলেন ফ্রান্সেসকা রেচিয়া নামের একজন লেখক, গবেষক। নিজ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক লেখায় ছবিটি যুক্ত করে রেচিয়া লিখেন, তিনি গত ২৮ সপ্তাহে যতো ছবি দেখেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক এই ছবিটি, যা তাঁর মনে থেকে যাবে আজীবন। রেচিয়া লিখেন, “ছবিটি হলো পাথরের স্তুপে চাপা পড়া একটি মানুষের হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে একটি খেজুঁরের অঙ্কুর বের হয়ে আসার। এটি একই সাথে ভয়ানক এবং অলৌকিক, একটি বিধ্বংসী রূপক যার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।” ছবিটি তিনি ডাক্তার আহমেদ মুগরাবির পোস্ট থেকে নিয়েছেন বলেও জানান। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইউটিউবেও এই ছবিটি নিয়ে অপতথ্য ছড়াতে দেখা গিয়েছে। 

সিরিয়া, আফগানিস্তান, লেবানন হয়ে গাজা

ছবিটির সবচেয়ে পুরোনো যে সূত্রটি ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে তা হলো ২০১৫ সালে এক্স অ্যাকাউন্টের একটি পোস্ট। ঐ বছরের ২৪ ডিসেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (পূর্ববর্তী টুইটার)-এ করা সেই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “একদিন এই হাত সেসব মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে যারা আসাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলেনি।” ছবির উপর টাইপকৃত হরফে লেখা ছিল “সিরিয়ার শহীদেরা”। বলা যায়, পোস্টদাতা ছবিটিকে সিরিয়ার হিসেবেই দাবি করেছেন। এর পরের দুই বছর ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে (, , ) যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে স্থানীয় ভাষায় শেয়ার করা কয়েকটি পোস্টেও ছবিটিকে কোনো শহীদের বলে দাবি করতে দেখা যায়। 

তিন বছর পর ২০২০ সালে বৈরুত বন্দরের ব্যাপক বিধ্বংসী বিস্ফোরণের ঘটনার পর ছবিটি সামনে এলে দাবি করা হতে থাকে এ লেবাননেরই ছবি। এরপর লেবানন ভিত্তিক গণমাধ্যম আন নাহার এবং ফ্রান্সভিত্তিক গণমাধ্যম এএফপি আরবি পৃথক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায় যে ছবিটি বৈরুতের নয়। 

এএফপি আরবির প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক মাধ্যমে ছবিটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে: “বন্দর থেকে আসা গমের চারা গজিয়ে ধ্বংসস্তূপে, চাপা পড়া শহীদের হাতে… এ এক বেদনা ও আশার ছবি…বিশ্বে শান্তি আসুক…কল্যাণ হোক লেবাননের’’। ছবিটির মূল সূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে এএফপির ফ্যাক্টচেক প্রতিবদনে বলা হয়, আদৌ ছবিটি সত্য নাকি কারোর বানানো বা তৈরি করা এই বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

অতি সম্প্রতি গাজার বলে ছবিটি ভাইরাল হতে শুরু করলে গত ১৪ মার্চে ছবিটি নিয়ে আবারও ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এএফপি আরবি। প্রতিবেদনে নতুন করে এএফপি বলে যে গাজার ছবি হিসেবে প্রচার হতে থাকা এই ছবিটি পুরোনো এবং ছবিটির সত্যতা ও সূত্রের ব্যাপারে তারা এবারও নিশ্চিত হতে পারেনি।

ছবিটির মূল সূত্র কি তা যাচাই করা না গেলেও, এটি নিশ্চিত করে বলা যায় যে এটি গাজার সাম্প্রতিক কোনো ছবি না।

গাজায় চলমান ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে যার মধ্যে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ১৩ হাজারেরও বেশি। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে বিচার দাবি করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। 

আরো কিছু লেখা