
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সম্ভাবনা ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের। এবং ভারতকে অবশ্যই তা পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ করতে হবে—ভারতের সেনা সর্বাধিনায়ক জেনারেল অনিল চৌহানের এমন এক বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি বাস্তব নয়। মূল ভিডিওকে এআই দিয়ে বিকৃত করে এটি তৈরি করা হয়েছে।
ডেল এইচ খান নামের একটি পেজ থেকে গত ১২ জানুয়ারি একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “প্লিজ মার্ক হিজ লাস্ট লাইন, মাস্ট ভিজিলেন্টলি মনিটর এন্ড প্রিভেন্ট সাচ শিফট! মাস্ট?” ভিডিওতে ভারতের সেনা সর্বাধিনায়ক জেনারেল অনিল চৌহানকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

৩০ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে জেনারেল চৌহানকে বলতে শোনা যায়, “পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে গড়ে ওঠা ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি, যা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জেএফ-১৭ থান্ডার জেট বিক্রির সম্ভাবনা উদ্বেগজনক। এই যুদ্ধবিমানটি সাম্প্রতিক উচ্চমাত্রার অভিযানে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে; এটি বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে পারে এবং পূর্বাঞ্চলীয় থিয়েটারে কৌশলগত ভারসাম্য বিঘ্নিত করতে পারে। ভারতকে অবশ্যই এই ধরণের পরিবর্তনগুলো সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরোধ করতে হবে।” ভিডিওতে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার লোগো দেখা যায়।
পোস্টটি এ পর্যন্ত তিন লাখ ৬৭ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে, শেয়ার হয়েছে ১৩০০ বারের বেশি। পেজের পোস্টটি শেয়ার করে ডেল এইচ. খান নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে লেখা হয়, “দাদারা বসে নেই রে, ভাই। একদম বসে নেই। তারকাখচিত জেনারেল যখন ইংরেজিতে বলেন যে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের যুদ্ধ বিমান বেচার ব্যাপারটা তারা ‘মাস্ট’ নজরদারিতে রাখবে এবং যেকোনো মূল্যে থামাবার চেষ্টা করবে, তখন ইস্যু শুধু বাংলার জন্যই না বরং পাকিস্তানের জন্যও বেকায়দা।”
ভিডিওটির কি-ফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) সামাজিক মাধ্যম এক্স হ্যান্ডেলে একই ব্যক্তি ও ফ্রেমের ভিডিও প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। ৭ জানুয়ারির এই ভিডিও প্রতিবেদনে তাকে বাংলাদেশের প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি। প্রতিবেদনের ক্যাপশনে পিটিআই লিখেছে, “আমরা এখানে সমবেত হয়েছি প্রয়াত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস.কে. সিনহার জন্মবার্ষিকী স্মরণ করতে এবং ভারতের কৌশলগত চিন্তা, জাতি গঠন ও বর্তমান সময়ে তার অক্ষয় উত্তরাধিকারের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোকপাত করতে। একজন খেতাবপ্রাপ্ত ফিল্ড কমান্ডার, সামরিক চিন্তাবিদ, কূটনীতিবিদ ও রাজ্যপাল হওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্তরে ছিলেন একজন প্রকৃত সৈনিক। তিনি তার চিন্তার স্বচ্ছতা, সততা ও প্রজ্ঞার জন্য সুপরিচিত ছিলেন, যা তার নিজস্ব বক্তব্য ও লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।”

একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন (১, ২) থেকে জানা যায়, গত ৭ই জানুয়ারি নয়া দিল্লিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস.কে. সিনহার জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত এক স্মারক বক্তৃতায় বক্তৃতা দিয়েছেন ভারতের সেনা সর্বাধিনায়ক জেনারেল অনিল চৌহান। এই বক্তব্যের অংশ বিশেষ নিয়েই বিভিন্ন গণমাধ্যম ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর পাশাপাশি সম্পূর্ণ বক্তব্য লাইভ দেখিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে গ্লোবাল, দ্য প্রিন্ট, ইন্ডিয়া টুডে গ্লোবাল প্রকাশিত ২ ঘণ্টা ২৩ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডের পুরো বক্তব্যে তাকে বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য করতে দেখা যায়নি।

পর্যবেক্ষণে ভিডিওটিতে জেনারেল অনিল চৌহানের ঠোঁটের নড়াচড়ার সাথে কথার অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। অধিকতর যাচাইয়ে, কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল ডিপফেক-ও-মিটার দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
ভারতের সরকারি তথ্যযাচাইকারী সংস্থা পিআইবি ফ্যাক্টচেক এ বিষয়ে তাদের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে। তারা ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক ভিডিও বলে জানিয়েছে। অনিল চৌহান এ ধরনের কোনো বক্তব্য দেননি বলেও জানায় তারা।
অর্থাৎ, ভিডিওটি বাস্তব নয়। অনিল চৌহানের মূল ভিডিও-এর বক্তব্য বিকৃত করে বাংলাদেশ-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রেক্ষিতে ছড়ানো হচ্ছে।