ফামীম আহমেদ

রিসার্চার, ডিসমিসল্যাব
চকলেটে তেলাপোকা: বিজ্ঞানভিত্তিক পেজে মিথ্যা দাবি
This article is more than 1 year old
Feature

চকলেটে তেলাপোকা: বিজ্ঞানভিত্তিক পেজে মিথ্যা দাবি

ফামীম আহমেদ
রিসার্চার, ডিসমিসল্যাব

চকলেট অনেকেরই খুব পছন্দের খাবার। কিন্তু যদি শোনেন তাতে পোকার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকে? তাহলে অনেকেই হয়তো তাদের প্রিয় খাবার নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাবেন, আতঙ্কিত হবেন। সম্প্রতি ঠিক তেমনটাই দেখা গেছে। 

একাধিক বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের পেজ ও ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে যে চকলেট তৈরিতে তেলাপোকা ব্যবহার হয়, এবং এটিকে মার্কিন ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বৈধতা দিয়েছে। এমন তথ্য অনেক চকলেটপ্রেমীকে আতঙ্কিতও করে তুলেছে। কিন্তু ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা গেছে, দাবিগুলো বিভ্রান্তিকর এবং কোনোটি বেঠিকও বটে।

দাবিটি যেভাবে ছড়াল

বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও এবং কয়েকটি বাংলা ওয়েবসাইটে চকলেট ও তেলাপোকা সংক্রান্ত দুটি দাবি ছড়াতে দেখা যায়। 

প্রথম দাবিটি হলো, “চকলেট তৈরিতে তেলাপোকা ব্যবহার করা হয়। সব ব্র্যান্ডের প্রতি ১০০ গ্রাম চকলেট বারে ৬০টির মতো তেলাপোকার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থাকে।” এবছর ফেব্রুয়ারিতে এটি শেয়ার করা হয় ৫০ হাজারের বেশি ফলোয়ারসমৃদ্ধ একটি শিক্ষামূলক ফেসবুক পেজে, যারা বিজ্ঞান-তথ্যের একটি গ্রুপও পরিচালনা করে থাকে। পোস্টটি ২৫ বার শেয়ার হয়েছে এবং তাতে ২০০-র বেশি মন্তব্য রয়েছে।

দ্বিতীয় দাবি হলো, “অনেকের মতে চকলেটে ক্ষুদ্র পরিমাণ তেলাপোকার অংশ চকলেটের পুষ্টিমাণ বৃদ্ধি করে থাকে। তাই FDA (Food and Drug Administration) চকলেটে পোকা পাওয়াকে বৈধতা প্রদান করেছে।” এটিও পাওয়া গেছে একটি জনপ্রিয় বিজ্ঞান-ভিত্তিক ফেসবুক পেজ ও তাদের ওয়েবসাইটে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে প্রকাশিত এই পোস্ট ৪৩ বার শেয়ার হয়েছে এবং তাতে বিভিন্ন অভিব্যক্তি দিয়ে এক হাজারের বেশি ব্যবহারকারী সম্পৃক্ত হয়েছেন। একই দাবি ইউটিউবে আরেকটি বিজ্ঞান-তথ্য বিষয়ক চ্যানেলের ভিডিওতে পাওয়া গেছে।  

চকলেটে তেলাপোকার উপস্থিতি সংক্রান্ত দাবিগুলোর উৎস খুঁজতে গিয়ে ডিসমিসল্যাব বাংলা ভাষায় ইন্টারনেটে এই দাবিটির সবচেয়ে পুরোনো উৎস পেয়েছে ‘বিজ্ঞানযাত্রা’ নামের একটি বিজ্ঞান বিষয়ক ব্লগসাইটে। ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবরে প্রকাশিত লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘চলুন, তেলাপোকার প্রেমে পড়ি’।

লেখাটিতে একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: “যদি শুনেন, এইসব এবং সব ব্র্যান্ডের সব ধরনের (প্রতি ১০০ গ্রাম) চকলেট বারের ভেতরেই কম বেশি ৬০টার মত তেলাপোকার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থাকে! তাইলে? হা হা হা! মাথা খারাপ হওয়ার কিছু নাই! এটাই স্বাভাবিক। স্বয়ং U.S. Food and Drug Administration (FDA) এর গাইডলাইন অনুযায়ী ১০০ গ্রাম চকলেট বারে সর্বোচ্চ ৬০টি পর্যন্ত পোকার অংশ পাওয়াকে তারা নিরাপদ মনে করে।”

সত্যাসত্য যাচাই

প্রথমত, চকলেট তৈরিতে তেলাপোকা ব্যবহার করা হয় এবং সব ব্র্যান্ডের প্রতি ১০০ গ্রাম চকলেট বারে ৬০টির মতো তেলাপোকার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থাকে বলে ২৯ হ্যাটম্যান হাউজ নামের পেজে করা দাবিটির পক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পেজটিও এর সমর্থনে কোনো সূত্র উল্লেখ করেনি।  

“১০০ গ্রাম চকলেট” ও  “৬০টির বেশি পোকা” এই কথাগুলো এসেছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের একটি নির্দেশনার সূত্র ধরে। “CPG Sec. 515.700 Chocolate & Chocolate Liquor -Adulteration with Insect and Rodent Filth” শিরোনামে এফডিএ কর্তৃক প্রকাশিত সেই নির্দেশনা যুক্ত করা হয় বিজ্ঞানযাত্রায় প্রকাশিত লেখায়। সায়েন্স বি নামের ওয়েবসাইটে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এফডিএর এই নির্দেশনাকে উদ্ধৃত করা হয়।

এফডিএর সেই নির্দেশনায়, প্রতি ১০০ গ্রাম চকলেটে ৬০টির বেশি পোকার অংশ থাকলে সেটিকে ‘ভেজাল’ হিসেবে চিহ্নিত করে জব্দ করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ এফডিএ চকলেটে তেলাপোকা বা অন্য কীটপতঙ্গের অংশ থাকতে পারার বৈধতা দেয়নি, বরং জব্দ করার জন্যে চকলেটে থাকা পোকার পরিমাণের একটি রেফারেন্স দিয়েছে মাত্র।

চকলেটে তেলাপোকা থাকার কারণে অনেকের এলার্জি হয় বলে, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ায়। তখন ইউএসএ টুডে এবং লিড স্টোরিজসহ একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দাবিটিকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

এফডিএর মুখপাত্র ভেরোনিকা ফেইফেল ইউএসএ টুডেকে জানান, এফডিএ চকলেট তৈরির প্রধান উপাদান কোকোয়া বীজে সাধারণভাবে তেলাপোকার উপস্থিতি পায়নি। সংস্থাটি খাদ্য-দূষণকারী ৩ ধরনের পোকামাকড়ের মধ্যে কেবলমাত্র “ইনসিডেন্টাল পেস্টকে” মানুষের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত অ-বিপজ্জনক বলে বিবেচনা করে থাকে। কিন্তু তেলাপোকা ইনসিডেন্টাল পেস্ট নয় বলে পত্রিকাটিকে জানান ফেইফেল। 

তিনি আরও জানান, বিধি অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো স্থাপনা তেলাপোকার মতো পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হলে এফডিএ পণ্য বাজেয়াপ্ত করতে পারে বা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারে। 

২০২১ সালে ভারতেও চকলেটে তেলাপোকা থাকা নিয়ে একই দাবি ভাইরাল হয়। প্রতি ১০০ গ্রাম চকলেটে ৪ গ্রাম তেলাপোকা থাকা এফডিএ কর্তৃক বৈধ– এমন দাবির প্রেক্ষিতে ভারতীয় ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা নিউজচেকার ও  বুমলাইভ দাবিটি যাচাই ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। ভারতের খাদ্য সুরক্ষা ও মান-নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই) তাদের ওয়েবসাইটইউটিউব চ্যানেলে এই দাবিটিকে মিথ্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে সবাইকে সাবধান করেছে।

আরো কিছু লেখা