
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উপ-মুখপাত্র ফারহান হকের বক্তব্য দাবিতে একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সে ভিডিওর ধারাবিবরণীতে দাবি করা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন দেখতে চায় জাতিসংঘ। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি উপ-মুখপাত্র।
গত ২১ জানুয়ারি জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠানের ওপর জোর দিয়ে বক্তব্য দেন ফারহান হক।

“বঙ্গবন্ধু”র বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি” নামের একটি পেজ থেকে গত ৩১ জানুয়ারি ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হয়, “অবশেষে নির্বাচনে বড় সুখবর পেলো আওয়ামীলীগ; এবার আ.লীগ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা জাতিসংঘের।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ৩৬ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে এবং ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে ৬৮৭ বার। ফেসবুকের বেশকিছু ব্যক্তিগত প্রোফাইলে (১, ২, ৩, ৪, ৫) পেজ (১, ২, ৩) একই দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়।
১ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উপ-মুখপাত্র ফারহান হককে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ফারহান হকের পেছনে জাতিসংঘের লোগো এবং পতাকার অংশবিশেষ দেখা যায়। ভিডিওতে ফারহান হককে বলতে শোনা যায়, “বাংলাদেশে আমরা আওয়ামী লীগকে ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে পাচ্ছি না।”
ভিডিওতে এরপর একজনকে বলতে শোনা যায়, ফারহান হক জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেছেন “আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে সামনে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।” এছাড়া ভিডিওতে শোনা যায়, “জাতিসংঘ প্রত্যাশা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন সকল দলের অংশগ্রহণসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আয়োজন করে।”
সত্যতা যাচাইয়ে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ফারহান হকের জানুয়ারি মাসে দেওয়া নিয়মিত ব্রিফিংয়ের ভিডিওগুলো যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। ১৫ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ফারহান হককে দৈনিক প্রেস ব্রিফিং দিতে দেখা যায়। কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবার ৩০ জানুয়ারি তাকে প্রেস ব্রিফিং দিতে দেখা গেছে।

গত ২০ জানুয়ারি ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিওতে ফারহান হককে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করতে দেখা যায়। ২৪ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড দীর্ঘ ভিডিওর ২৪ মিনিট ১২ সেকেন্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, “আমরা নির্বাচন আয়োজনকে উৎসাহিত করি এবং আমরা জাতিসংঘের প্রতিটি স্তরে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, নির্বাচনের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি নিরাপদে ও শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন।” বক্তব্যের কোথাও আওয়ামী লীগ শব্দটি উল্লেখ করতে শোনা যায়নি তাকে।
ফারহান হকের বক্তব্যটি নিয়ে একাধিক (১, ২) সংবাদমাধ্যমের ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সময় টিভির ২১ জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষিত জাতীয় নির্বাচন যথাসময়ে দেখতে চায় জাতিসংঘ। এছাড়া ভোটাররা যেন তাদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত এবং পছন্দ স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার দিকেও লক্ষ্য রাখতে বলেছে জাতিসংঘ।
অধিকতর যাচাইয়ে একাধিক (১, ২, ৩, ৪) গণমাধ্যমে প্রেস রিলিজটি নিয়ে প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ২১ জানুয়ারিতে প্রকাশিত যুগান্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “জাতিসংঘ মহাসচিবের উপ-মুখপাত্র ফারহান হক যথা সময়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, নিরাপদে ও যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উপ-মুখপাত্র ফারহান হক। জাতিসংঘের স্থায়ী সংবাদদাতা আবু সুফিয়ান ফারাবীর প্রশ্নের উত্তরে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, নিরাপদে ও যথাসময়ে অনুষ্ঠানের তাগিদ দেন মহাসচিবের উপ-মুখপাত্র ফারহান হক।”

অর্থাৎ, সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন দেখতে চায় জাতিসংঘ দাবিতে যে ভিডিওটি প্রচারিত হয়েছে তা বিভ্রান্তিকর। এ ধরনের কোনো বক্তব্য জাতিসংঘ থেকে দেওয়া হয়নি।
জাতিসংঘের প্রতিনিধির বক্তব্যকে জড়িয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন অতীতেও প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব।