
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে আমার দেশ, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর এবং এখন টিভির নামে কিছু ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ফটোকার্ডে দেখা যায়, জামায়াতের আমীর বলেছেন, তারা ক্ষমতায় এলে পুরুষরা বাইরে কাজ করবে আর নারীরা শুধু ঘরে থাকবে। আরেকটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ডিবি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জামায়াত আমীরের এক্স আইডি হ্যাকের বিষয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে। সেনাপ্রধানকে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের নির্বাচিত করার প্রসঙ্গে মন্তব্য করতেও দেখা যাচ্ছে একটি ফটোকার্ডে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, তিনটি সংবাদমাধ্যমের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডই ভুয়া।

ফেসবুকে একটি পেজ থেকে গত ১ ফেব্রুয়ারি একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। ‘আমার দেশ’ পত্রিকার আদলে তৈরি সেই ফটোকার্ডে জামায়াত আমীর শফিকুর রহমানের ছবি সংযুক্ত রয়েছে। কার্ডের ভেতরে লেখা, “আমরা ক্ষমতায় আসলে নারীরা শুধু ঘরে থাকবে,আর পুরুষেরা বাহিরে কাজ করবে জামায়াতের আমির”। ছবির ওপর আমার দেশ-এর লোগো এবং নিচে ডানপাশে তারিখ হিসেবে, “১ ফেব্রুয়ারি,২০২৬” ও বামদিকে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত ফটোকার্ডটি শেয়ার করা হয়েছে অন্তত ৩৬৭ বার।
ফটোকার্ডের সত্যতা নিশ্চিত করতে আমার দেশ-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সবগুলো ফটোকার্ড ও পোস্ট যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। এমন মন্তব্যের কোনো ফটোকার্ড বা পোস্টের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে, জামায়াত আমীরের একই ছবি ব্যবহৃত হয়েছে এমন একটি ফটোকার্ড সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হয়েছে যার শিরোনাম ছিল, “১২ তারিখ জাতির বাঁক পরিবর্তনের দিন”। অন্যদিকে প্রচারিত ফটোকার্ডের ডিজাইন ও ফন্টের সঙ্গেও আমার দেশের মূল ফটোকার্ডের পার্থক্য রয়েছে।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আমার দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। গণমাধ্যমটির সহযোগী সম্পাদক, আলফাজ আনাম ডিসমিসল্যাবকে নিশ্চিত করেন এমন কোনো ফটোকার্ড আমার দেশ প্রকাশ করেনি।
অর্থাৎ, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসলে,পুরুষরা বাইরে কাজ করবে আর নারীরা শুধু ঘরে থাকবে এমন কোনো মন্তব্য জামায়াতের আমীর প্রকাশ্যে করেনি এবং আমার দেশ-ও এ ধরনের কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি।
ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ১ ফেব্রুয়ারি ডিবির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের জয়েন্ট কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদের ছবিযুক্ত ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়। ফটোকার্ডের ভেতরে লেখা, “জামায়াত আমিরের এক্স আইডি হ্যাকের বিষয়ে সত্যতা খুজে পেয়েছি: ডিবি”। ফটোকার্ডের মাঝামাঝি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের লোগো দেওয়া। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “দুটি আসনের খাম্বা অপসারণ করতে আমীরে জামায়াতের আইডি হ্যাক করে অপপ্রচার চালায় তারা— ছাত্রদল হ্যাক আইডি থেকে বিতর্কিত পোস্টের বিরুদ্ধে মিছিলে নেমে পড়ে। প্রায় প্রতিটি অপকৌশলে তারাই ফেঁসে যাচ্ছে, তারপরও কিঞ্চিৎ পরিমাণ লজ্জা হয় না তোদের?” (লেখা অপরিবর্তিত)
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফটোকার্ডটি ৯ হাজারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে এবং কার্ডে ২৪ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা পোস্টে ১ হাজার ২০০টির বেশি মন্তব্য করেছেন। একজন মন্তব্য করে লেখেন, “সত্য এভাবেই সামনে আসবে ,আর এই দেশের মাটিতে, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ।” আরেকজন লিখেছেন, “অপরাধী কে আইনের আওতায় আনা উচিত।”
ফেসবুকে একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল, পেজ ও গ্রুপ (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬) থেকে একই দাবিতে ফটোকার্ডটি ছড়িয়ে পড়ে।
ফটোকার্ডের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের ফটোকার্ড ও পোস্টগুলো যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। এ ধরনের কোনো ফটোকার্ড বা প্রতিবেদনের লিংক সংবাদমাধ্যমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকের, ছড়ানো ফটোকার্ডের লেখার ফন্টের সঙ্গে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ফেসবুকের ফটোকার্ডের ফন্টের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। তবে, সৈয়দ হারুন অর রশীদের একই ছবি ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমটি গত ১ ফেব্রুয়ারি একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল, “জামায়াতের আমিরের এক্স আইডি হ্যাকের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি: ডিবি”
এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সাথে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। চ্যানেল টোয়েন্টিফোর-এর জয়েন্ট নিউজ এডিটর ও অনলাইন ইনচার্জ, মাজহার খন্দকার জানিয়েছেন, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর থেকে এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়নি।
অর্থাৎ, জামায়াতের আমীরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার প্রসঙ্গে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নামে ছড়ানো ফটোকার্ডটি ভুয়া।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ জামায়াত আমীরের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে গত শনিবার একটি পোস্টে বলা হয়, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘর থেকে বের করে আনার ফলে তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন। এর পর ওই বাক্যেই কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিজনক মন্তব্য করা হয়। তবে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট এক্স অ্যাকাউন্টটি সাইবার হামলার শিকার হয়েছিল। এ ঘটনায় দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয় এবং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়েছে।
ফেসবুকে আজ (২ ফেব্রুয়ারি) একটি গ্রুপ থেকে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ছবি সম্বলিত একটি ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়। ফটোকার্ডের ভেতরে লেখা, “আপনারা ভোট দিয়ে দুনীতিবাজ,সন্ত্রাসী,চাঁদাবাজদের সংসদে পাঠাবেন-আর তারপর আমাদের কাছে নিরাপত্তা চাইবেন? এটা কেমন কথা?” নিচে মন্তব্যটি তিনি করেছেন তাই “-সেনাপ্রধান” শব্দটি লেখা হয়েছে। কার্ডের মাঝামাঝি তারিখ হিসেবে “১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬” এবং বামদিকে এখন টিভির লোগো দেওয়া আছে।
পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “আপনারা ভোট দিয়ে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের সংসদে পাঠাবেন—আর তারপর আমাদের কাছে নিরাপত্তা চাইবেন? এটা কেমন কথা? — সেনাপ্রধান🔥”(লেখা অপরিবর্তিত)
এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত ফটোকার্ডটি আড়াই শর বেশিবার শেয়ার করা হয়েছে। ফেসবুকে একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল (১, ২, ৩, ৪) ও গ্রুপ (১, ২, ৩, ৪, ৫) থেকে একই দাবিতে ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়।
ফটোকার্ডের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যম এখন টিভি’র অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের ১ ফেব্রুয়ারির সব ফটোকার্ড ও পোস্টগুলো যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। এ ধরনের কোনো ফটোকার্ড বা প্রতিবেদনের লিংক সেদিন সংবাদমাধ্যমের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া এখন টিভির অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও সেনাপ্রধানের এমন কোনো মন্তব্য মেলেনি। তবে, গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে ১ ফেব্রুয়ারি সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের মন্তব্যযুক্ত একটি ফটোকার্ড প্রকাশিত হতে দেখা যায়। সাদা ও হলুদ হরফে প্রকাশিত সেই ফটোকার্ডের শিরোনামে লেখা, “খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত কোনো খেলোয়াড়কে কখনো খারাপ কাজে দেখিনি- সেনাপ্রধান”।

এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে এখন টিভির সাথে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। সংবাদমাধ্যমটির ওয়েব ও কন্টেন্ট বিভাগের ইনচার্জ ও জয়েন্ট নিউজ এডিটর, আনিসুর সুমন জানিয়েছেন, এখন টিভি থেকে এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়নি।
অর্থাৎ সেনাপ্রধানের মন্তব্যযুক্ত এখন টিভির নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া।