
ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন নামের এক পেজ থেকে পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “আজকের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করলেই পাবেন ঈদ বোনাস ৫০০০।” ফটোকার্ডের ভেতরে লেখা, “ঈদের আগে টাকা পেতে এখনি আবেদন করুন ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ আবেদন লিংক কমেন্টে।”

কমেন্টে সরাসরি লিংক শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “সবাইকে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে সরকার। আবেদনের লিঙ্ক:…”। তবে সে লিংকে ক্লিক করলেই ব্যবহারকারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার সাইটে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ফেসবুকে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি পেজ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করার ব্যাপারে পোস্ট করতে দেখা গেছে। পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ফ্যামিলি কার্ডে আবেদন করার লিংক কমেন্টে জানানো হচ্ছে। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, এই লিংকগুলো প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের লিংক নয়, বরং এসব পোস্টের মূল উদ্দেশ্য ব্যবহারকারীকে জুয়ার ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া।
সংশ্লিষ্ট কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ডিসমিসল্যাব ১২টি পেজ সংগ্রহ করে যেখানে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের নামে জুয়ার ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন সংক্রান্ত বেশিরভাগ ফেসবুক পোস্টগুলোতে (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১) ক্যাপশনে লেখা, “ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করুন মাত্র ২ মিনিটে” এবং “ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করলেই পাবেন ঈদ বোনাস।”
পোস্টগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিটি ক্যাপশনের ভাষা প্রায় একই। সব পোস্টের ফটোকার্ডেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি রয়েছে এবং “আবেদন লিংক কমেন্টে” বাক্যটি রয়েছে। কমেন্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কমেন্টে সরাসরি একটি লিংক দিয়ে লেখা, “সবাইকে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে সরকার। আমি আবেদন করেছি, আপনিও করুন। আবেদনের লিঙ্ক:।”
সংগ্রহ করা পেজগুলোতে ৩টি লিংক কমেন্টে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। আমার পোর্টাল এবং বিডি ডেইলি নিউজ নামের দুটি ওয়েবসাইটের লিংক কমেন্টে দেওয়া থাকছে। গণমাধ্যম প্রথম আলোর আদলে তৈরি একটি ওয়েবসাইটের লিংকও পাওয়া যায়। এই ওয়েবসাইটটিতে বিভিন্ন প্রতিবেদনও রয়েছে, সেই প্রতিবেদনগুলো সম্পূর্ণ পড়তে গেলে আবার জুয়ার ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়।

আমার পোর্টাল লিংকটিতে প্রবেশ করলে একটি ওয়েবসাইটের হোমপেজ সামনে আসে যেখানে লেখা রয়েছে, “ফ্যামিলি কার্ড অনলাইন পোর্টাল ২০২৬।” এর নিচে স্ক্রলে লেখা, “২০২৬ সালের নতুন ফ্যামিলি কার্ডের জন্য অনলাইন আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কার্ডধারী পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রকৃত দুস্থ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আবেদন সম্পন্ন করতে কোনো প্রকার ফি প্রয়োজন নেই।”
স্ক্রলের নিচে লেখা “বর্তমানে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ চলছে।” তার নিচে লেখা “নিচের বাটনে ক্লিক করে আপনার আবেদনটি সম্পন্ন করুন।” এর পরই “আবেদন করুন” বাটনটি আসে। হোমপেজের একদম নিচে লেখা, “© ২০২৬ ফ্যামিলি কার্ড সার্ভিস পোর্টাল | সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।”
আবেদন করুন বাটনটি ক্লিক করলে “আপনাকে আবেদন পেজে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কার্ডটি নিশ্চিত করতে পরবর্তী পেজে ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করুন” লেখাটি দেখায়। পরবর্তীতে ওয়েবসাইটটি “বড় জিত” নামের অনলাইনে জুয়া খেলার একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। এই ওয়েবসাইটে নাম, ফোন নাম্বার দিয়ে নিবন্ধন করতে বলা হয়।

বিডি ডেইলি নিউজ লিংকটির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। লিংকটিতে প্রবেশ করলে একই ওয়েবসাইটের হোমপেজ সামনে আসে যেখানে একই লেখা দেখা যায়। এখানেও “আবেদন করুন” বাটনটি আসে। আবেদন করুন বাটনটি ক্লিক করলে “আপনাকে আবেদন পেজে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কার্ডটি নিশ্চিত করতে পরবর্তী পেজে ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করুন” লেখাটি দেখায়। পরবর্তীতে ওয়েবসাইটটি “নাইন উইকেটস” নামের অনলাইনে বেটিং ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়।
মারিয়া মিম নামের একটি পেজ থেকে একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬) পোস্ট করা হয় ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের লিংক দিয়ে যেখানে একাধিক গণমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করা হয়। এ পোস্টগুলোর কমেন্টে বিডি ডেইলি নিউজ এর লিংক পাওয়া যায়।

এছাড়া একাধিক পেজ থেকে প্রথম আলোর ফটোকার্ডের আদলে ফটোকার্ড বানিয়ে পোস্ট করা হয়েছে যেখানে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে। এ পোস্টগুলোতে (১, ২, ৩, ৪) প্রথম আলোর লোগো এবং তারেক রহমানের ছবি দিয়ে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন করতে বলা হচ্ছে। কমেন্টে দেওয়া হচ্ছে প্রথম আলো অনলাইন ফ্যামিলি কার্ড নামের একটি ওয়েবসাইটের লিংক।
সে ওয়েবসাইটে ক্লিক করলে আগের দুটি ওয়েবসাইটের মতোই একটি হোমপেজ সামনে আসে যেখানে লেখা, “ফ্যামিলি কার্ড অনলাইন পোর্টাল ২০২৬।” এই হোমপেজেও বাকি সব ডিজাইন অন্য দুটি ওয়েবসাইটের মতোই। এখানে “আবেদন করুন” বাটনে ক্লিক করলে “ওয়ান এক্স বেট” নামের একটি বেটিং ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়।
তিনটি ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, “আমার পোর্টাল” ওয়েবসাইটটি ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত হয়েছে। বিডি ডেইলি নিউজ ওয়েবসাইটটি নিবন্ধিত হয়েছে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর এবং প্রথম আলো অনলাইন ফ্যামিলি কার্ড ওয়েবসাইটটি নিবন্ধিত হয়েছে একই বছরের ২২ ডিসেম্বরে।
বাংলাদেশে অনলাইন বেটিং বর্তমানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ২০ ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী, “যদি কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেসে জুয়া খেলার নিমিত্ত কোনো পোর্টাল বা অ্যাপস বা ডিভাইস তৈরি করেন বা পরিচালনা করেন বা জুয়া খেলায় অংশগ্রহণ করেন বা খেলায় সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান করেন বা উৎসাহ প্রদানের জন্য বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রচার বা বিজ্ঞাপিত করেন তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।“
অধ্যাদেশের ২০(২) উপধারা অনুযায়ী, এসব অপরাধে “অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড” দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ফ্যামিলি কার্ডের নামে এভাবে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের কোনো অনলাইন বেটিং সাইটে যেতে উৎসাহিত করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রসঙ্গত, প্রথম আলোর নামে ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদনের আহ্বান করা হচ্ছে শিরোনামে প্রথম আলো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এই প্রতিবেদনে প্রথম আলো এ ধরনের ওয়েবসাইটকে বিশ্বাস করে প্রতারিত না হতে সবার প্রতি অনুরোধ জানায়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে ৯টি ইশতেহার ঘোষণা করেছিল তার মধ্যে অন্যতম একটি ইশতেহার ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। ইশতেহারে বলা হয়েছিল প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, আগামী ঈদুল ফিতরের আগেই সরকার পাইলট ভিত্তিতে বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছে।