
সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–এর অপব্যবহার নিয়ে বাংলা বার্তা নামের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ডিসমিসল্যাবের গবেষক পরিচয়ে ‘কাল্পনিক’ উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে। “সংসদ নির্বাচন এআইয়ের অপব্যবহার” শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে ডিসমিসল্যাবের গবেষক ছাড়াও একাধিক ভুয়া বিশেষজ্ঞের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। একই প্রতিবেদন ও ভুয়া উদ্ধৃতিগুলো দৈনিক সাহসী কণ্ঠ ও সময় খবর নামের আরও দুটি পোর্টালেও হুবহু প্রকাশ করা হয়েছে।

২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ডিসমিসল্যাবের একজন গবেষক হিসেবে ‘তাসনিম খালেদ’ নামের এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়। তবে ডিসমিসল্যাবে এই নামে কোনো গবেষক নেই। একই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ‘অধ্যাপক ড. রাশেদ মাহমুদ’ নামের একজন শিক্ষকের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু বিভাগীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে ওই বিভাগে এই নামে কোনো শিক্ষক কর্মরত নেই। এছাড়া ‘বুয়েটের সাইবার নিরাপত্তা গবেষক ড. সায়েম আহমেদ’ নামে একজন ব্যক্তির উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হলেও অনুসন্ধানে এমন কোনো গবেষক বা বিশেষজ্ঞের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনটিতে ডিসমিসল্যাবের গবেষক হিসেবে তাসনিম খালেদ নামের এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি ব্যবহার করে বলা হয়, “নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, ভিডিওভিত্তিক অপতথ্যের ব্যবহার তত বাড়ে, কারণ ভিডিও মানুষ বেশি বিশ্বাস করে।” তবে এই নামে কেউ ডিসমিসল্যাবে কর্মরত নেই।
একই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ মাহমুদ–এর নামে ডিপফেক নিয়ে মন্তব্য যুক্ত করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে ওই বিভাগে এই নামে কোনো শিক্ষক নেই। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে যোগাযোগ করা হলে বিভাগের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন নিশ্চিত করেন, বিভাগে ড. রাশেদ মাহমুদ নামের কোনো শিক্ষক নেই।
এছাড়া প্রতিবেদনে বুয়েটের সাইবার সিকিউরিটি গবেষক ড. সায়েম আহমেদ–এর নামেও এআই–সংক্রান্ত বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তবে যাচাইয়ে এই নামে কোনো সাইবার নিরাপত্তা গবেষকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
যাচাইয়ে আরও দেখা যায়, প্রতিবেদনে ব্যবহৃত কিছু উদ্ধৃতি মূলত অন্য একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আংশিক পরিবর্তন ও পুনর্লিখনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ২৪ জানুয়ারি দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় “নির্বাচনে এআই আতঙ্ক” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত গ্রাফিক্সও পুনরায় বাংলা বার্তা নামের পোর্টালের প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়েছে।
কালবেলার প্রতিবেদনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, “এখন তো এআইর যুগ। এআই নিয়ে আমি শঙ্কা একদম প্রথম থেকেই প্রকাশ করে আসছিলাম যে—এটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা হবে আমাদের জন্য বড় ধরনের একটা চ্যালেঞ্জ।” একই প্রতিবেদনে এআই ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, “নির্বাচন কেন্দ্র করে বটবাহিনীর যে অপপ্রচার, সেটা নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশন অথবা সরকারের পাল্টা কোনো বটবাহিনী নেই। সত্যি বলতে আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই শূন্য। এর পরও প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে বিটিআরসি মেটার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ভুয়া ভিডিওসহ বিতর্কিত কন্টেন্ট সরিয়ে অথবা রিচ কমিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তারা আশ্বস্ত করেছেন। প্রস্তুতি বলতে এটাই।”
বাংলা বার্তার প্রতিবেদনে এসব বক্তব্য আংশিক পরিবর্তন করে নতুন ভাষায় উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে এসব বক্তব্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন বক্তব্যগুলো সরাসরি ওই প্রতিবেদনের জন্য দেওয়া মন্তব্য।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তানভীর হাসান জোহা ডিসমিসল্যাবকে জানান, তিনি উল্লিখিত পত্রিকাটি চেনেন না।
যাচাইয়ে আরও দেখা যায়, বাংলা বার্তা নামের পোর্টালটি ২৫ জানুয়ারি সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। অন্যদিকে, দৈনিক সাহসী কণ্ঠ ও সময় খবর নামের পোর্টাল দুটি যথাক্রমে ৯টা ৩০ মিনিট ও ৯টা ৩১ মিনিটে একই প্রতিবেদন হুবহু প্রকাশ করে। পোর্টাল দুটির ফেসবুক পেজেও প্রতিবেদনগুলো (১, ২) শেয়ার করা হয়।